Advertisement
E-Paper

শিল্পের স্বাধীনতা যেখানে অপরাধ

ছবি আঁকছিলেন স্রিমিন্‌স্কি, কয়েক তলা উঁচুতে তাঁর ফ্ল্যাটে, নীচে রাস্তা জুড়ে শাসক দলের সমাবেশ, টাঙানো হচ্ছিল আকাশছোঁয়া বিরাট লাল ফেস্টুন, তাতে স্তালিনের মুখ আঁকা।

শিলাদিত্য সেন

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৭ ০০:০০

আমি আপনাদের বিরুদ্ধে নই। আমি শুধু শিল্প সম্পর্কে আপনাদের থেকে আলাদা ধারণা পোষণ করি।’ জেরার মুখে বলে ফেলেছিলেন স্রিমিন্‌স্কি, কসুর তাঁর এইটুকুই। ১৯৪৮-এর ডিসেম্বরে পোল্যান্ডের শাসক কমিউনিস্ট পার্টির প্রশাসনিক দফতরে প্রায় ধমকে প্রশ্ন করা হচ্ছিল তাঁকে। কী অপরাধে সমাজতান্ত্রিক সরকারের পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে এসেছিল?

ছবি আঁকছিলেন স্রিমিন্‌স্কি, কয়েক তলা উঁচুতে তাঁর ফ্ল্যাটে, নীচে রাস্তা জুড়ে শাসক দলের সমাবেশ, টাঙানো হচ্ছিল আকাশছোঁয়া বিরাট লাল ফেস্টুন, তাতে স্তালিনের মুখ আঁকা। হঠাৎ খেয়াল করলেন, ঘরের স্বাভাবিক আলো মুছে সারা ঘর ছেয়ে গিয়েছে লাল রঙে, জানলা-বারান্দা ঢাকা পড়ে গিয়েছে বাইরের স্তালিন-ফেস্টুনে। ক্রাচে ভর করে উঠে দাঁড়ান শিল্পী, একটা হাত আর একটা পা খুইয়েছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, বারান্দায় এসে ক্রাচটাকে লাঠির মতো বাগিয়ে ফাঁসিয়ে দেন ফেস্টুনটাকে, অমনি অনাবিল রোদ ঢুকে পড়ে তাঁর ঘরের ভিতর। সমাবেশের প্রহরীরা স্তম্ভিত, কার এত সাহস? তারা ছুটে আসে অপরাধী ধরতে, পঙ্গু মানুষটাকে হিড়হিড় করে টেনে বের করে আনে তাঁর ফ্ল্যাট থেকে।

আন্দ্রে ওয়াইদা’র শেষ ছবি ‘আফটারইমেজ’-এর দৃশ্য মনে পড়ে গেল নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তির প্রাক্কালে। ৭ নভেম্বর আসতে আর ক’দিনই বা বাকি! এর পর সেই ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’: ১৯১৭-র বিপ্লব রাশিয়ায় সমাজ-অর্থনীতির সঙ্গে বদলে দেবে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চেহারাও।

শিল্পের নতুন পন্থা নিয়ে বিতর্ক বা মতানৈক্য সমাজতন্ত্রের জন্মলগ্ন থেকেই ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির আধিপত্যের সঙ্গে বিকল্প চিন্তা বা মুক্ত ভাবনার পরিসরটিও ছিল অন্তত প্রথম কয়েক বছর, লেনিনের আমলে। আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্রে, মায়াকোভস্কির কবিতায়— বিষয়বস্তুর সঙ্গে শিল্পের আঙ্গিকে কতটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যায়, পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল তার।

ঠিক সেটাই করছিলেন স্রিমিন্‌স্কি-ও (১৮৯৩-১৯৫২)। পোল্যান্ডের আভাঁ-গার্দ চিত্রকর, শিল্প-সংক্রান্ত বৈপ্লবিক চিন্তা ও প্রকাশভঙ্গির জন্য আজও তিনি বিশ শতাব্দীর শিল্পের ইতিহাসে বিশিষ্ট। পোল্যান্ডে তিনিই প্রথম মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম পত্তন করেন। শিল্পচর্চার বিপ্লবী গোষ্ঠী তৈরি করেন। তাত্ত্বিক হিসেবে সুবিদিত, ‘দ্য থিয়োরি অব ভিশন’ বইয়ের লেখক। শিক্ষক হিসেবেও অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন পোল্যান্ডের লোদ্‌জ আর্ট স্কুলে।

তবু তাঁকে নিজের দেশেই সোভিয়েত সরকারের রোষানলে পড়তে হল। তত দিনে স্তালিনের নেতৃত্বে হিংসা ও জবরদস্তির ভিত্তিতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। অতিকেন্দ্রীকরণের শৃঙ্খলায় ক্রমশই তখন ক্ষয়প্রাপ্ত গণতন্ত্র, পার্টিসর্বস্ব রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের ব্যবস্থায় ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন সাধারণ মানুষ। নভেম্বর বিপ্লবের এই পরিণতি নিয়ে সম্প্রতি ‘পরিচয়’ শারদ সংখ্যায় শোভনলাল দত্তগুপ্ত লিখেছেন ‘রুশ জনগণের কাছেও সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি ছিল প্রায় অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট।’ আর সৌরীন ভট্টাচার্যের মনে হয়েছে, ব্যবস্থাটি হয়ে উঠেছিল এক ‘সামরিক সমাজতন্ত্র’। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্রিমিন্‌স্কিরা নিজেদের দেশ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন তা একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ওই গণতন্ত্রহীন সমাজতন্ত্রের ধাক্কায়। নাত্‌সি-বিধ্বস্ত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির শাসনভার যখন হাতে তুলে নিল সোভিয়েত রাশিয়া, তখন সেই আরোপিত সমাজতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেননি এই সমস্ত দেশের মানুষরা। সমাজতন্ত্র তাঁদের কাছে হয়ে উঠল আর-এক দুঃখের কাল, আরও এক শৃঙ্খল।

শিল্পীরা আক্রান্ত হলেন সবচেয়ে বেশি, রুদ্ধ হল তাঁদের স্বাধীন স্বর। স্রিমিন্‌স্কিকে তাঁর শিল্পপন্থা ছেড়ে ‘সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম’ বা ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ চর্চা করতে বলা হল। কারণ এই শিল্প-মতবাদের প্রচারক ছিল কমিউনিস্ট পার্টি, তাদের মতে, দেশ গঠনের কাজে এ ধরনের শিল্পই কাম্য, বাকি সব শিল্পরীতিই অকাজের, ক্যাপিটালিজম-এর সহায়ক। সংস্কৃতি মন্ত্রীকে মুখের ওপর বলেছিলেন স্রিমিন্‌স্কি: ‘শিল্প হল নানান আঙ্গিক কিংবা প্রকাশভঙ্গির রসায়নাগার। শিল্পের সম্মান তার কার্যকারিতা কিংবা ব্যবহারযোগ্যতায় নয়, তার উচ্চতা বা গুণের জন্যে।’ এ কথা শুনে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি মন্ত্রী, জানিয়ে দিয়েছিলেন, যত বড় শিল্পীই হোন-না কেন স্রিমিন্‌স্কি, তাঁকে তাঁদের দরকার নেই, ফর্মালিস্টিক আর্ট কিংবা আভাঁ-গার্দ কোনও কাজেই লাগবে না সমাজতন্ত্র তৈরিতে।

সত্যজিৎ রায় এ নিয়ে খেদ প্রকাশ করেছিলেন, সোভিয়েত চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর লেখায়: ‘সরকার যেখানে শিল্পের সংজ্ঞা নির্দেশ করে দেবেন, সেখানে শিল্পীর স্বাধীনতা এই নির্দিষ্ট পরিধির মধ্যেই আবদ্ধ। আইজেনস্টাইন, পুদোভকিন, দোভজেঙ্কো, দনস্কই প্রমুখ প্রত্যেককেই কোনও না কোনও সময় তাঁদের রচিত চিত্রনাট্য বা চলচ্চিত্রের জন্য সরকারি কটাক্ষ ভোগ করতে হয়েছে। অথচ এঁরা যে প্রতিভাবান সমাজসচেতন শিল্পী নন একথা বলার স্পর্ধা আমাদের আছে কি?’ সত্যজিতের অস্বস্তিই স্রিমিন্‌স্কিকে নিয়ে ওয়াইদার ছবি তৈরির কারণ। ‘আমার এ-ছবিতে সতর্ক করেছি, কোনও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ চলবে না শিল্পী আর তাঁর শিল্পের উপর,’ ওয়াইদা বলেছেন। ‘শিল্পের বিভিন্ন ধরন হতে পারে, সে ভাবেই তার বিকাশ কাম্য। স্রিমিন্‌স্কির সঙ্গে আমি পুরোপুরি সহমত, শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর উদ্ভাবনী সৃজনীশক্তিতে, ব্যবহারযোগ্যতায় নন। তবেই এক জন শিল্পী পারেন নতুন পথের সন্ধান দিতে।’ গত বছর গোয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তর্জাতিক ফিল্মোৎসব ‘ইফি’-র উদ্বোধন হয়েছিল এ-ছবি দেখিয়ে, মাসটা ছিল নভেম্বর, রুশ বিপ্লব শতবর্ষে পা দিল। ঠিক তার এক মাস আগে অক্টোবরে, নব্বই বছর বয়সে মারা গেলেন চলচ্চিত্রকার আন্দ্রে ওয়াইদা।

’৫২-র ডিসেম্বরে মারা গিয়েছিলেন স্রিমিন্‌স্কি। কমিউনিস্ট শাসনে তাঁর আইডি-কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়, শিল্পী-সংগঠন থেকে সদস্যপদ খারিজ করা হয়। কার্ড নেই বলে রং বা খাবার কিছুই কিনতে পারতেন না, সিগারেটও নয়। মন্ত্রী তাঁকে ডেকে বলেন, আপনাকে ট্রামের ধাক্কায় মেরে ফেলা উচিত। তার আর দরকার পড়েনি, না খেতে পেয়ে যক্ষ্মায় মারা যান স্রিমিন্‌স্কি, খাবারের খালি পাত্র জিভ দিয়ে চাটছেন, এ দৃশ্য আছে ওয়াইদার ছবিতে।

পোল্যান্ডের শীতার্ত স্যাঁতসেঁতে বরফ-ঢাকা শহরে এক শিল্পীর পরিচয়হীনতা, অসহায়তার আখ্যান এ-ছবি। আর ক’দিন বাদেই আমাদের দেশেও নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্‌যাপন। তখন কি মনে পড়বে স্রিমিন্‌স্কিদের কথা, যাঁদের মরে যেতে হয়েছিল এত কষ্টে, একেবারে একা-একা?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy