Advertisement
E-Paper

করোনার দিন করোনার রাত

তর্জনীতে লাগানো অক্সিমিটারের ডিজিট নাচছে। বিপদসীমার নীচে পৌঁছে আমায় যেন এক বার মেপে আবার উঠছে, পড়ছে, উঠছে।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:২৪
প্রতীকী চিত্র।

প্রতীকী চিত্র।

রাতভর বৃষ্টির পরেও জল-হাওয়ার সকাল আজ। ভিজে বাতাস আসে আসুক, হাট করে খুলে দিয়েছি বারান্দার দরজা। ঘরে একটুও হাওয়া নেই যেন। ভুল বলছি, আসলে বুকে এতটুকু হাওয়া নেই। ঘরে তো খুশিয়াল পর্দা উল্টেপাল্টে যাচ্ছে, ফরফর করছে টেবিলে রাখা বই-কাগজের পাতা। ফ্যান ফুলস্পিডে।

তর্জনীতে লাগানো অক্সিমিটারের ডিজিট নাচছে। বিপদসীমার নীচে পৌঁছে আমায় যেন এক বার মেপে আবার উঠছে, পড়ছে, উঠছে। ক্রমশ নামছে পালস। ইনহেল-হোল্ড-রিলিজ়। আবার ইনহেল...। এমন বিপদে পড়লে, এটাই যে মন্ত্র, তা পাখি পড়িয়ে রেখেছেন চিকিৎসকেরা। আচ্ছন্ন এবং হালকা লাগছে। বাইরে বৃষ্টির মতোই ঝেঁপে আসছে ছেলেবেলার ঘুম। বাতাস, তুমি কখন বুকে আসবে...

প্রথম দিন

শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রাজধানীর বঙ্গসমাজ আজকাল নিজ ডেরার পাঁচ কিলোমিটারের চৌহদ্দিতে পেয়ে যান সজনে ডাঁটা থেকে মুসুর ডালের বড়ির প্যাকেট, ঝলমলে পাবদা। কিন্তু দিল্লির সাবেক অভ্যাস, মাসে অন্তত এক বার চিত্তরঞ্জন পার্কে যাওয়া চাই!

লকডাউন আর অতিমারির কারণে মাস ছয়েক যাওয়া হয়নি। অগস্টের ১০ তারিখ, রবিবারের সকালে স্থির হল, যাওয়া হবে কিছু ক্ষণের জন্য। চিত্ত পার্ক তো আর আলাদা করে কোভিড-অধ্যুষিত নয়! মাস্ক পরে বেরনো হল। রবিবারের ধু-ধু রাস্তা, কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই মনে হল, গাড়ি চালাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হচ্ছে না। সমস্যা যে কী, তা স্পষ্ট নয়, অথচ ভিতরে আনচান ভাব।

অস্বস্তিটা থেকেই গেল গোটা রাস্তা। সামান্য সময়ই সি আর পার্ক-এ। দুপুরে চেষ্টা করেও এ পাশ ও পাশ শুধু। সঙ্গে সামান্য শুকনো কাশি, আর গলায় অস্বস্তি। দুপুরে ফেরার সময় সামান্য হলেও বৃষ্টিতে ভিজেছি, তাতেই বোধ হয় ঠান্ডা লেগেছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে— এটাই এই সময়ের দস্তুর। কাল থেকে তুলসী আর আমলকী, এই ভেবে নেটফ্লিক্স-এ ‘ডার্ক’ নামে সিরিজ় দেখতে দেখতে ঘুম! তবে অন্ধকার দেখার আরও কিছু বাকি ছিল!

দ্বিতীয় দিন

এমন সময়ে তো ঘুম ভাঙার কথা নয়। শীত করছে বেশ। ভোর সাড়ে চারটে। একটু ধাতস্থ হতে বুঝলাম, গা পুড়ে যাচ্ছে। গলার অস্বস্তিটা ব্যথাতে পরিণত। যাকে নিয়ে পাঁচ মাস হাজার হাজার শব্দ লেখা, সেই কোভিড কি তবে জাগ্রত দ্বারে! সে সব দেখা যাবে, আপাতত বালিশ চাদর যা যা ব্যবহার করেছিলাম সব নিয়ে নিশাচরের মতো অন্য ঘরে। একটা প্যারাসিটামল ৬৫০ এমজি। কিন্তু এই জ্বর যেন ক্রিজ় আঁকড়ে থাকা ব্যাটসম্যান! একশো দেড় ডিগ্রি থেকে (তার বেশি ওঠেনি কখনও) নামছে, কিন্তু সাড়ে নিরানব্বইয়ের নীচে নয়। কাশিটাও বাড়ছে।

যে বন্ধু-ডাক্তার (পশ্চিমবঙ্গের) গত বিশ বছর আমাদের ছোটখাটো সমস্ত বিপদই টেলিফোনে পার করে দিয়েছে, তাকে সকাল সাতটায় প্রথম ফোন। বলল, আজই অ্যাজ়িথ্রোমাইসিন শুরু করে দিতে। সঙ্গে জ়িঙ্ক-সহ ভিটামিন ডি এবং সি। দিনে সাড়ে চার লিটার পানীয়, যার বেশিটাই উষ্ণ। প্রোটিনসমৃদ্ধ উষ্ণ খাবার, বেশি করে। কয়েকটা দিন পর কোভিড টেস্ট, কারণ এখনই করলে ঠিক রেজ়াল্ট আসবে না। শেষে বলল, ‘তবে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখো, পজ়িটিভই আসবে তোমার।’

ষষ্ঠ দিন

এর মধ্যে একটি বেসরকারি ল্যাব থেকে স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছে। রিপোর্ট চলে এসেছে। পজ়িটিভ। উপসর্গ টের পাওয়ার পর থেকেই অবশ্য দরজা বন্ধ। ওই বাল্যবন্ধু তো আছেই, পাশাপাশি নিয়মিত কথা হচ্ছে দেবতুল্য এক চিকিৎসকের সঙ্গে। বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জীবাণুটি প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছে— ‘এসেছি, থাকব, তুই লড়ে দ্যাখা ভাই!’ করোনার পরীক্ষা হওয়া সমস্ত ল্যাবের সঙ্গে দিল্লি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রক সংশ্লিষ্ট সার্ভার শেয়ার করছে। ফলে আমার পজ়িটিভ আসার পরেই, দিল্লি সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে দফায় দফায় ফোন। তাঁরা খোঁজ নিচ্ছেন, জ্বর ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন-এর। বলছেন, বিন্দুমাত্র শ্বাসকষ্ট হলে ইমার্জেন্সিতে ফোন করতে, অ্যাম্বুল্যান্স এসে নিয়ে যাবে সরকারি হাসপাতালে। এক জন সরকারি ডাক্তার রোজ ফোন করে কিছুটা কাউন্সেলিং-ও করছেন। দু’জন সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী এসে দিয়ে গিয়েছেন অক্সিমিটার।

ডাক্তাররা আসলে সব পরামর্শই দিচ্ছেন উপসর্গের ওঠা-নামা দেখে। তাঁদের প্রখর ইনস্টিংক্ট থেকে। বুঝতে পারছি তাঁদের সামনে গত কয়েক মাসের করোনা রোগীদের মডেল ছাড়া কিছু নেই। সেই মডেলও কিনা বহুরূপী। এক এক জনের শরীরে করোনার লীলা এক এক রকম। ভাইরাসের অনেক কার্যকারণই রহস্যে ঘেরা। একটা অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে যাত্রার মতো।

জ্বর সেই সাড়ে নিরানব্বইয়ে ব্যাট করছে। তবে আর বাড়ছে না। মাথার ওজনই গোটা শরীরের ৭০ ভাগ যেন। কাশিটা গলা থেকে বুকে নামছে (ভাইরাসও কি?)। চতুর্থ দিনে চলে গিয়েছে ঘ্রাণশক্তি। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন রাতে শোয়ার আগে একটি অ্যাসপিরিন গ্রুপের ওষুধ খেতে। রক্ত যাতে জমাট বেঁধে ফুসফুসকে অকেজো করে না দিতে পারে। অষ্টম থেকে দ্বাদশ দিন— রোগীর ফুসফুসে করোনার দাপট সর্বোত্তম। তাই এই আগাম সতর্কতা। সঙ্গে গার্গল, রাতে এক কোয়া করে রসুন।

দুশ্চিন্তা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে, কারণ আমার ছেলেরও গলা ব্যথা ও কাশির পর করোনা টেস্ট করে পজ়িটিভ এসেছে। তবে ওর জ্বর নেই আদৌ। ডাক্তার বলছেন, বয়স কম, সামলে নেবে দ্রুত। আমরা দু’জন দু’টি ঘরে বন্দি। অস্বাভাবিক চাপ নিতে হচ্ছে স্ত্রীকে। আমাদের টাটকা পুষ্টিকর গরম খাবার (হাই প্রোটিন ডায়েট, ফলের রস) চার বেলা জোগান দেওয়া এবং আনুষঙ্গিক হাজার কাজ। নিজের অফিস সামলানো। তবে এই রহস্যময় ভাইরাস আমাকে আর ছেলেকে আক্রমণ করলেও ওকে এখনও ছুঁতে পারেনি। টেস্ট রেজ়াল্টও নেগেটিভ, উপসর্গও নেই।

দরজার বাইরে স্টিকার মেরে গিয়েছে দিল্লি সরকার। অমুক তারিখের আগে আমাদের রাস্তায় দেখা গেলে যেন প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়! চার পাশ থেকে প্রতিবেশী এবং সোসাইটির গেটের কর্মীদের নিরন্তর সাহায্যে কাঁচা বাজার, ওষুধ, অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আসছে। দিল্লি সরকার থেকেও একটি নম্বর দিয়ে বলেছে, লিস্ট হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলে ওরা জিনিস গেটে রেখে দেবে। অনলাইন পেমেন্ট করে দিতে হবে।

দশম দিন

এই প্রথম অক্সিজেন স্যাচুরেশন এবং পালস নামা-ওঠা করছে। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হল। প্রাণবায়ু বেরনোর আগে এ রকমই কিছু হয় নির্ঘাত। কখনও বুক ফেটে যাচ্ছে হাওয়ার অভাবে। আলো কমে আসছে। কখনও একটু ভাল। আচ্ছন্ন ভাবে কাটল গোটা দিন। আজই কোভিড তার চরম লীলা (পিক) দেখিয়ে গেল, রাতে বলছেন চিকিৎসকরা। কাল থেকে পরিস্থিতি ভাল হওয়ার সম্ভাবনা।

অষ্টাদশ দিন

এ বারের মতো ফাঁড়া কেটেছে মনে হয়। তবে এমন ক্লান্তি যে, উঠে পাঁচ মিনিট ঘরে পায়চারি করলেও (ডাক্তারের পরামর্শমাফিক) মনে হচ্ছে ফুটবল ম্যাচ খেলে এলাম। সঙ্গে বুকে দুটো কাঁথা চাপা থাকার মতো চাপ। তা হাঁটার পর কমছে, আবার ফিরে আসছে। তবে জ্বর নেই, অক্সিজেন স্যাচুরেশনও স্বাভাবিক। কোভিড নাকি যাওয়ার আগে, ফুসফুসে নিজের চিহ্ন রেখে যায়। সব মিটলে বুকের স্ক্যান এবং অন্যান্য পরীক্ষা করা তাই জরুরি। মাস দুয়েক বাড়তি সাবধানতা। তবে ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ।

দরজার বাইরে শরৎকাল তার প্রি-বুকিং নিয়ে নিয়েছে, এই এত দিনে ঠাহর হচ্ছে। ওই তো বেতলায় দেখা ভল্লুকের মতো সাদা মেঘটা ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো শিউলি হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে অনন্ত নীলে।

নীল বা সাদা নয়, আকাশে আরোগ্যের রং ধরছে কি? আরোগ্যের থেকে সুন্দর কিছু নেই আর...

Coronavirus COVID 19
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy