সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদকীয়: রাজধর্ম কোথায়

Amit Shah
অমিত শাহ। —ফাইল চিত্র

অটলবিহারী বাজপেয়ী স্মরণ করাইয়া দিয়াছিলেন, শাসকের ধর্ম কী। আঠারো বৎসর অতিবাহিত, রাজধর্মে দীক্ষা তবু সম্পূর্ণ হইল না। সোমবার হইতে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যাহা ঘটিতেছে, তাহার দায় কেন্দ্রীয় বিজেপি শাসককে লইতেই হইবে। ঘটনাস্থল দিল্লি বলিয়া অভিযোগের আঙুলটি সরাসরি উঠিবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দিকেই। দিল্লি পুলিশ তাহাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। শাহদরায় কে দাঙ্গা বাধাইল, কে ভাঙচুর চালাইল, কাহার হাতে এতগুলি প্রাণহানি হইল, সব প্রশ্নের উত্তরই হাওয়ায় ভাসিতেছে। কেন এমন ঘটিল, তাহার ব্যাখ্যাও হয়তো অনেকের নিকটই আছে। কিন্তু, সেই সকল প্রশ্নের উত্তর আরও খানিক অপেক্ষা করিতে পারে। যাহা প্রশ্নাতীত, তাহা পুলিশের অপদার্থতা। এতখানি সময় ধরিয়া পুলিশ কী করিতেছিল? দেশের রাজধানী শহরের পুলিশ কী ভাবে এমন বীভৎস হিংসা-নিধনযজ্ঞ থামাইতে ব্যর্থ হয়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কাশ্মীরের মতো একটি সন্ত্রাসবিপন্ন অঞ্চলকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করিতে পারেন, আর নিজের রাজধানীকে পারিলেন না কেন? কারণ, তাঁহারা বাজপেয়ীকে ভারতরত্ন দিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার উপদেশটি গ্রহণ করেন নাই। প্রশাসন যে নাগরিকের জাতি-বর্ণ-ধর্ম-ভাষা বিচার করিতে পারে না, নাগরিকমাত্রেই প্রশাসনের নিকট সমান নিরাপত্তা পাইবার দাবিদার— দিল্লির ঘটনাক্রম দ্ব্যর্থহীন ভাবে জানাইতেছে, সুশাসনের এই প্রাথমিক পাঠটিকে তাঁহারা সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করিতেছেন। এই ভয়ঙ্কর হিংসাকাণ্ডের প্রধানতম দায়টি, অতএব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই লইতে হইবে।

শুধু পুলিশের ব্যর্থতার দায় নহে, নাগরিক সমাজের একাংশকে অপরাংশের শত্রু হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিবার দায়টিও তাঁহাকেই লইতে হইবে। দিল্লি নির্বাচনের প্রচারপর্বে তিনি শাহিন বাগের প্রতিবাদীদের ধাক্কা দেওয়ার কথা যে ভাবে জোর গলায় বলিয়াছিলেন, হিন্দুত্ববাদী জনতা যে তাহাকে মুসলমান-নিগ্রহের আহ্বান হিসাবেই শোনে নাই— এমন কথা অমিত শাহ হলফ করিয়া বলিতে পারিবেন না। অনুরাগ ঠাকুরের গুলি মারিবার প্রকাশ্য আহ্বান, অথবা অতি সম্প্রতি কপিল মিশ্রর ‘বুঝিয়া লইবার’ ডাক— তাঁহারই দলের মেজো-সেজো নেতারা যখন প্রকাশ্যে ঘৃণা ছড়াইয়াছেন, হিংস্রতার ব্যবসা ফাঁদিয়াছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি শুনেন নাই, দেখেন নাই? না কি, সংখ্যালঘু-নিগ্রহের এই অনতিপ্রচ্ছন্ন আহ্বান তাঁহার নিকট জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী ঠেকে নাই? তাঁহার মনে হয় নাই যে ইহাতে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইতে পারে? প্রশ্নগুলির উত্তর অজানা নহে। মনে করিবার যথেষ্ট হেতু আছে যে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও তাহার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করিয়া যে ভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে, তাহা হইতে রাজনৈতিক লাভ কুড়াইতেই এ-হেন নিষ্ক্রিয়তা। এই বিদ্বেষের রাজনীতি এবং এই নিষ্ক্রিয়তার রাজনীতির দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তৎসূত্রে প্রধানমন্ত্রীকে স্বীকার করিতে হইবে বইকি।

সেই দিক দিয়া দেখিলে, দিল্লিতে যাহা ঘটিতেছে, তাহা অতিপ্রত্যাশিত। গত কয়েক মাস যাবৎ দিল্লি পুলিশ নিরপেক্ষতার ভড়ংটুকুও বিসর্জন দিয়াছে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার লাইব্রেরিতে পুলিশি তাণ্ডব হইতে জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে গৈরিক গুন্ডাদের নৃশংসতা চলাকালীন পুলিশের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা, জামিয়া বা শাহিন বাগে পুলিশের নাকের ডগায় বন্দুকবাজের গুলিচালনা— প্রতিটি ঘটনাই দিল্লি পুলিশের পক্ষপাতকে স্পষ্ট করিয়া দিয়াছে। বিজেপির শীর্ষনেতাদের ‘দেশ’ ধারণাটির মধ্যে যে মুসলিমদের ঠাঁই নাই, এই কথাটি বোধ করি তাঁহারা এত স্পষ্ট ভাবে বুঝাইয়া দিয়াছেন যে এখন রাজধানীর মাটিতে দাঁড়াইয়া মুসলিমদের হত্যা করিতেও বাধে না। নাগরিকদের প্রতি সমদর্শী হইবার রাজধর্ম হইতে বিচ্যুতির বিষফল এমনই ভয়ানক হইবার কথা। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন