ব্রিটিশ সরকারের অপমান ও কার্পণ্য পদে-পদে আঘাত করিয়াছিল জগদীশচন্দ্র বসুকে। আক্ষেপ, বিজ্ঞানীর এই অসম্মান আজও ‘অতীত’ হয় নাই। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের শতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে এক প্রবীণ বিজ্ঞানী বলিলেন, বিজ্ঞান-গবেষণায় সরকারি অনুদানের অবস্থা অতিশয় মন্দ। তৎসহ, এমন এক ভয়ের বাতাবরণ নির্মিত হইয়াছে যে বিজ্ঞানের গবেষণা দুরূহ হইয়া উঠিয়াছে। বক্তা সি এন আর রাও ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত রসায়ন বিজ্ঞানী, প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম বিজ্ঞান উপদেষ্টা। তাঁহার বক্তব্যকে লঘু করিবার অবকাশ নাই। তাই প্রশ্ন জাগে, জগদীশচন্দ্রের প্রয়াণের আট দশক পার হইয়াছে, ভারত বিজ্ঞানে অগ্রসর হইয়াছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু বিজ্ঞানীর সম্মান কি বাড়িয়াছে? মোট জাতীয় উৎপাদনের অন্তত তিন শতাংশ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির গবেষণার জন্য বরাদ্দ করিবার দাবি দীর্ঘ দিন হইতেই করিতেছেন বিজ্ঞানীরা। এই বৎসর সাধারণ বাজেটের পূর্বেও দুই হাজার বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান-শিক্ষক গবেষণা ও শিক্ষার খাতে অর্থবৃদ্ধির অনুরোধ করিয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু পাঁচ বৎসরে বিজ্ঞানের জন্য অর্থের বরাদ্দ জাতীয় আয়ের এক শতাংশ স্পর্শ করে নাই। বাজেট ঘোষণায় যে বৃদ্ধি দেখানো হইয়াছে, মূল্যস্ফীতি ও বেতনবৃদ্ধি সামাল দিয়া তাহার প্রায় কিছুই গবেষণার জন্য বাঁচিবে না। ভারত আয়বৃদ্ধির হারে সকল দেশকে ছাড়াইবার দাবি করিতেছে, বিজ্ঞানে তাহার খরচের হার প্রায় সকল উন্নত দেশের পশ্চাতে। ভারত চিনের প্রতিস্পর্ধী হইতে চাহে, বিজ্ঞানের গবেষণায় চিনের মোট বরাদ্দ ভারতের সাতগুণ।
ভারতীয় বিজ্ঞানের বরাদ্দ যে বিদুরের খুদ, তাহারও অধিকাংশ যায় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলিতে। সি এন আর রাও আক্ষেপ করিয়াছেন, ছোট-ছোট গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানীদের অর্থ জোটে না। অথচ তাঁহারাই ‘প্রকৃত’ বিজ্ঞানচর্চা করেন। তাঁহাদের আবিষ্কার সমাজকে প্রগতির পথ দেখায়। এ-কথা সত্য। মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণা নূতন জ্ঞান আহরণের পথ, তাহা গোটা বিশ্বেই স্বীকৃত। কিন্তু তাহার জন্য খরচ করিবে কে? চটজলদি সমাধান পাইবার তাগিদ, অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাক লাগাইবার তাড়না চালিত করিতেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে। মহাকাশযান নির্মাণ, জৈব প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগে সরকারি কর্তাদের আপত্তি নাই, কারণ তাহার সম্ভাব্য লাভ দৃশ্যমান। মৌলিক গবেষণা করিয়া কী মিলিবে, তাহা বুঝিতে দূরদৃষ্টি প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আগ্রহ না থাকিলে মৌলিক বিজ্ঞানে লগ্নি আসিবে না। মাশুল গনিবে আগামী প্রজন্ম।
সঙ্কট আরও তীব্র হইবে বিজ্ঞানীর অভাবে। ভারতে বিজ্ঞান শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার হয় নাই। উচ্চ শিক্ষার পরিধিতেই এখনও আসে নাই দেশের পাঁচ জনের চার জন। জনসংখ্যার অনুপাতে বিজ্ঞানীর সংখ্যায় ভারত কেবল উন্নত দেশ নহে, বহু উন্নয়নশীল দেশেরও পশ্চাতে। তাহার প্রতিফলন পড়িতেছে উদ্ভাবনী ক্ষমতায়। ভারতে প্রতি বৎসর নূতন উদ্ভাবনের ‘পেটেন্ট’ প্রদান হয় পঞ্চাশ হাজারেরও কম। চিনে বাৎসরিক পেটেন্ট আট লক্ষ ছাড়াইয়াছে। এই দূরত্ব কমাইতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তাহা করিবে কে? পরাধীন ভারতের বিজ্ঞানীরা দেশের অপমান ঘুচাইতে গবেষণাকে অস্ত্র করিয়াছিলেন। স্বাধীন ভারত স্বেচ্ছায় সেই পরাজয়ের কালিমা গায়ে মাখিবে।