এই বছরে আঠারো পূর্ণ করল প্রতীচীর বাৎসরিক আলোচনা সভা। কী হয় সেখানে, যেখানে শিক্ষক-অধ্যাপক-গবেষকরা শুনতে যাই; আর এসে বসে থাকেন অমর্ত্য সেন। কখনও শিক্ষা, কখনও স্বাস্থ্য, কখনও লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়ে যে সব প্রকল্প আছে তাতে কাজের অভিজ্ঞতা, তাদের সমস্যা, আর কী করলে প্রকল্পটা আর একটু ভাল করা যায় তার কথা বলেন আইসিডিএস কর্মী, আশা দিদি, এএনএম, শিক্ষক, চিকিৎসক, নানা ধরনের ক্ষেত্রসমীক্ষক। এ বছর প্রায় দেড়শো মানুষ এসেছিলেন রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে। তাঁরা প্রতি বছর এই সভায় এসে হাজির হন প্রাণের টানে। আর কোথাও যা বলতে পারেননি বা বললেও কেউ শোনেনি, তা নির্ভয়ে বলতে। 

কী ধরনের কথা হল সভায়? কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। যেমন, আইসিডিএস-এর প্রাথমিক সমস্যা হল, এখনও কেন্দ্রগুলোর নিজস্ব জায়গা বা ঘর নেই। খাবারের জন্য যে টাকা দেওয়া হয় তাতে নির্দিষ্ট খাবার কোনও ভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়। সংরক্ষণের উপকরণের অভাবে টিকা নষ্ট হয়। যত কেন্দ্র আছে তত কর্মী নেই। একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি জেলায় ৩২৯টা কেন্দ্রে ২০০ জন কর্মী ও ৩ জন সুপারভাইজ়ার। এক জন কর্মী একাধিক কেন্দ্র কী ভাবে চালাতে পারে, তা ওঁরা আমাদের ভেবে দেখতে বলেন।

একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রথম এএনএম বলেন, ‘‘আমার উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অধীনে আছে ১০ হাজার মানুষ আর এক জন এএনএম। দ্বিতীয় পদটি খালি। গ্রুপ ডি স্টাফ নেই। অফিসে সব সময় এক জনকে থাকতে হবে, অর্ডার আছে। আমাদের আসল কাজ গ্রামে ঘুরে লোকজনকে বোঝানো, অথচ সেই কাজটাই করতে পারছি না।’’ আর এক জন জানালেন, তাঁর কেন্দ্রে দ্বিতীয় এএনএম আছেন অথচ তাঁর বেতন প্রথমের তুলনায় এতই কম যে তিনি নিজে বেতন নেওয়ার সময় লজ্জিত হন। 

কর্মীর সংখ্যা কম না হলেও সমস্যা থাকতে পারে। যেমন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করার কথা যে সব স্বাস্থ্যকর্মীর, তাঁরা বলেন, ‘‘অনেক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ হয়েছে কিন্তু তাঁরা সবাই মহিলা, কিছু পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ হলে আমাদের কাজের অনেক সুবিধে হত। কারণ গ্রামেগঞ্জে ঘুরে মানুষকে বোঝানোর জন্য শুধু মেয়েদের টার্গেট করলে কাজ হয় না, কাজটা ঠিক করে করতে চাইলে বাড়ির পুরুষদেরও বোঝাতে হয়।’’ 

বীরভূম জেলার চারটি ব্লকের স্বাস্থ্যের ওপর ঘর-ঘর নজরদারি চালাচ্ছে এক সংস্থা। তাদের সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ মানুষের অল্পবিস্তর মানসিক সমস্যা। এই সমস্যার মোকাবিলায় আমরা তেমন করে প্রস্তুত নই। গ্রামে আর শুধু মদ নয়, ড্রাগের নেশাও ভয়ঙ্কর ভাবে বাড়ছে। অন্য জেলায় সমীক্ষা হলেও ছবিটা আলাদা হওয়ার কথা নয়। 

শুধু সমস্যার কথাই হয় না, অনেক সমাধানের কথাও ওঁরা জানান। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য স্বাস্থ্যকর্মী, আইসিডিএস কর্মী, আশা দিদি, এএনএম, স্কুলশিক্ষক, চিকিৎসক হাতে হাত মিলিয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে আর একটু তুলে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গর্ব করে পুরুলিয়ার মানবাজারের আইসিডিএস দিদি বলেন, ‘‘উনত্রিশ বছর কাজ করছি, একটাও মা বা শিশুর মৃত্যু হয়নি। এক সময় টিকাকরণের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতে হত, এখন মাঠের কাজ সেরে ফেরার সময় মা খোঁজ নিয়ে যান ‘দিদি আমার মেয়েটার টিকার দিন কবে?’’’ মুর্শিদাবাদের এক সুপারভাইজ়ার দিদি বলেন, ‘‘আমার এলাকায় একটাও স্কুলছুট নেই, আর একশো শতাংশ ইনস্টিটিউশনাল ডেলিভারি।’’ শুনে অন্যরা উৎসাহিত হন। নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে পরস্পরের পরামর্শ নেন বিরতির সময়ে। আদিবাসী শিক্ষক জানান, ‘‘আমাদের বুঝতে হবে আদিবাসীদের ভাষার বাধা, বদলাতে হবে তাঁদের শেখানোর দৈহিক ভাষাও। না হলে ওঁরা অপমানিত হওয়ার ভয়ে শুধুই পালাবেন, আমাদের শিক্ষা স্বাস্থ্য কোনও প্রকল্পই ওঁদের কাজে লাগবে না।’’

আলোচনা চলতেই থাকে, কেউ কাউকে থামায় না, ওঁরা তো বলার জন্যই এসেছেন দূরদূরান্তর থেকে। পিছনের সারিতে বসে অমর্ত্য সেন মন দিয়ে শোনেন, শ্রোতাদের বার্তা দেন— আমার দিকে মনোযোগ করবেন না, যিনি বলছেন তাঁর দিকে মন দিন। এই ক্ষেত্রভিত্তিক নির্ভীক আলোচনার গুরুত্বের কথা তিনি অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন। দুর্ভাগ্যের কথা হল, আমরা যতই সবার যোগদানে তৈরি পরিকল্পনার কথা বলি না কেন, এখনও চিরাচরিত প্রথাই মেনে চলছি, তা মানুষের কাজে লাগবে কি লাগবে না সে বিবেচনা না করেই। পরিকল্পনার পদ্ধতিটা যতটা না সমস্যার কারণ, তার থেকেও বেশি সমস্যা হল না-শোনার। 

নীতির রূপায়ণ যাঁরা করবেন তাঁদের কথা ধৈর্য ধরে না শুনলে তা মানুষের কাজে আসবে না, তা সে যত ভালই নীতিই হোক না কেন। এই শোনার পরিসরটা যত ছোট হচ্ছে ততই কমে আসছে প্রজ্ঞার আলো। প্রজ্ঞা তো জন্মজাত নয়, অনুশীলনেই তার নির্মাণ, যে অনুশীলনে শোনা একটা প্রধান কাজ।  অমর্ত্য সেন এখনও সেটা শেখান— মানুষের কথা কী ভাবে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ না করে শুনতে হয়, একমনে শুনে তা থেকে গড়ে তুলতে হয় তত্ত্ব, 

যে তত্ত্বের কেন্দ্র জুড়ে, প্রান্ত জুড়ে কেবলই মানুষ, চির-অবিনাশী।