• অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘লাজের’ সেই তাজমহলই কিনা ট্রাম্পের হাতে তুলে দিতে হল যোগীকে

trump
ট্রাম্পের হাতে তাজমহলের ছবি তুলে দিচ্ছেন যোগী আদিত্যনাথ। ছবি: এপি।

তাজমহল যেন দুধে ভরা বাটি, আমরা তাতে চুমুক দিলাম— প্রায় এই রকমই এক বর্ণনা রেখেছিলেন এই সময়ের এক কবি চাঁদনি রাতে তাজমহল দেখে। কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল এই সৌধটি বহু দিনই আর কোনও ‘সৌধ’ নয়, তা আইকন মাত্র। এ দেশে টুরিস্ট আকর্ষণের কারণে ব্যবহৃত আইকন, হনিমুন যুগলের ছবি তোলার ব্যাকগ্রাউন্ড, পরিবেশ দূষণের আতঙ্ক বর্ণনা করার আইকন, রাজনৈতিক উথাল-পাথালের সময়ে কট্টরপন্থীদের আক্রমণের আইকনাইজড টার্গেট। কাজেই ১৯৯০ দশকের এক বাঙালি কবি যদি তাকে ‘দুধের বাটি’ হিসেবে দেখে থাকেন, তাতে ভুল কিছু নেই। এ এমনই এক ‘খাদ্যবস্তু’, যাকে গ্রহণ এবং বর্জন— দুই-ই রাজনৈতিক ঘোলাজলে ঘূর্ণায়মান।

এই সব কথা উঠছে এই কারণেই যে, বেশ কিছুদিন বাদে তাজমহল আবার সংবাদ শিরোনামে। সৌজন্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরিবার। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভারত সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তাজ-দর্শন। একদা বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত সপ্তদশ শতকে নির্মিত এই সৌধটি আজও যে ভারত নামক আইডিয়াটির কেকের উপরকার চেরিফল, তা ট্রাম্প আবার মনে করিয়ে দিলেন। মনে করিয়ে দিলেন এমন এক সময়ে, যখন দেশ অগ্নিগর্ভ, সাম্প্রদায়িক টানা-পড়েনে ধ্বস্ত। প্রতীকী অর্থে দেখতে গেলে, গত কয়েকটি দশকে তাজও পেরিয়েছে এই আগুনের আঁচ।

“তাজমহল ভারতীয় সংস্কৃতির কলঙ্ক”— ২০১৭-য় উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম বলেছিলেন। কারণ, এই সৌধ নাকি ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ তৈরি। এই উক্তি নিয়ে হাওয়া গরম হতে থাকলে বিজেপির উত্তর প্রদেশের দলীয় মুখপাত্র বিজয় বাহাদুর সিংহ বিষয়টিকে সামাল দিতে নামেন। তিনি জানান, এই মত তাঁর দলের নয়। তাঁর দল তাজকে ভারতের গর্ব বলেই মনে করে। এই মত সঙ্গীতের একান্ত ব্যক্তিগত।

আরও পড়ুন: শাহ আসার আগের রাতে শোভন-ব্যানার গোটা বেহালায়

তাজের সামনে দৃষ্টি বিনিময়ে ট্রাম্প দম্পতি। ছবি: রয়টার্স।

ভারতে ক্রমজায়মান অবস্থাতেই চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাজমহল। তাজকে ঘিরে আবর্তিত নানা কিংবদন্তির সঙ্গে সংযোজিত হতে শুরু করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি-প্রসূত মিথ-এর মিছিল। ‘তাজমহল রাজস্থানের কোনও হিন্দু মন্দির ভেঙে বানানো’, ‘তাজ আসলে একটা শিব মন্দির’, ‘তাজের নীচে, মাটির তলায় আজও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে প্রাচীন হিন্দু স্থাপত্যের নিদর্শন’— এই ধরনের প্রচার কখনও ফিস ফিস করে, কখনও বা বেশ উচ্চগ্রামেই গীত হতে শুরু করে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির রাজনৈতিক কার্যক্রমের একটা বড় অংশই হল ভারতের ইসলামি শাসনকে এক ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে দেখানো। সেখানে একটা মুঘল স্থাপত্য যদি বিশ্বে দেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে, তা হলে তা রীতিমতো ‘লজ্জা’-র বিষয়। তাঁদের এই মনোভাব কিন্তু আকাশ থেকে পড়েনি। এ দেশের ইতিহাস যখন এশিয়াটিক সোসাইটি আর ব্রিটিশ প্রাচ্যবাদী পণ্ডিতদের হাতে রচিত হতে শুরু করে, তখন ব্রিটিশ শাসকের দায় ছিল তার ঔপনিবেশিক শাসনকে জাস্টিফাই করা। তাই ভারতে ইসলামি শাসনকে একটা ‘অন্ধকারময় যুগ’ হিসেবে দেখানোটা তাদের কাছে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সুলতানি শাসনকে একেবারে মাৎস্যন্যায়, বাবরকে বহিরাগত আক্রমণকারী, আকবরকে মন্দের ভাল, জাহাঙ্গিরকে বেচারা, শাহজাহানকে অন্তঃসারশূন্য স্বর্ণযুগের দিশারি আর আওরঙ্গজেবকে নরপিশাচ হিসেবে দেখানোটা তাদের নিজেদের শাসনকে বৈধ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য একান্ত জরুরি ছিল। শাহজাহান প্রজাশোষণের পয়সায় তাজমহল বানিয়ে রাজকোষ ফাঁকা করে দেন, তার পরে আওরঙ্গজেব আরও সব পিশাচবৃত্তি চালিয়ে দেশকে একেবারে অন্ধকারের চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড করে ছেড়ে দেন। তাঁর পরের মুঘল শাসন একেবারেই রাবিশ। গদ্দারি আর খুনোখুনিতে ভরপুর। এমন দশা থেকেই ভারতের ভাগ্যবিধাতাকে পাঁজাকোলা করে উদ্ধার করে ব্রিটিশ শাসন— এমন একটা রৈখিক ও ভারি সরল ইতিহাস নির্মিত হয়। এতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যতটা লাভবান হয়েছিল, তার চাইতে অনেক বেশি ফায়দা লোটে হিন্দুত্ববাদ। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মা যা হইয়াছেন’ এই ইতিহাস-নির্মাণ থেকেই জাত। ইসলামি অপশাসন থেকে উদ্ধারের জন্য আপাতত ইংরেজ শাসন জরুরি— এই মনোভাব ১৯ শতকের হিন্দু রিফর্মারদের মধ্য একান্ত ভাবে ক্রিয়াশীল ছিল, এ কথা অস্বীকার করা যায় কি?

ভারতের আইডেন্টিটি আইকন তাজমহল, এটাই পছন্দ নয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের।

এই মনোভাবের উত্তরাধিকারই বহন করছে আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজিনীতি। আর এই কারণেই যাহা কিছু ইসলামি, তাহাই ডাহা গদ্দারি আর ভায়োলেন্সে পূর্ণ— এই বার্তা দিতে দ্বিধাবোধ করেন না তাঁরা। ২০১৭-এ জুন মাসে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জানান, “রামায়ণ আর গীতা ভারতীয় সংস্কৃতির পরিচায়ক, কখনই তাজমহল নয়। “প্রায় কাছাকাছি সময়েই উত্তরপ্রদেশের সরকারি টুরিজম বুকলেট থেকে তাজমহল ভ্যানিশ হয়ে যায় (এমন সুচারু তাজ-ভ্যনিশ পি সি সরকারও করতে পারেননি)। একই সঙ্গে তাজকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বহাল থাকে চরম দক্ষিণ উগ্রবাদীদের তরফে। ঈষৎ নরমভাবাপন্নদের মতে, তাজ সুন্দর হতে পারে, কিন্তু তা ভারতে ‘বহিরাগত’ মুঘলদের প্রজাশোষণের প্রতীক বলে বর্ণিত হতে থাকে।

আরও পড়ুন: ছ’মাসে প্রথম, ভর্তুকিহীন রান্নার গ্যাসের দাম কমল কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাইয়ে

এই সব মোটা দাগের রাজনৈতিক প্রচারের মাঝখানে ঢুকে পড়ে ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপাগান্ডাও। জনপ্রিয় ফিকশন লেখক অশ্বিন সাংঘি ২০১২-য় ‘দ্য কৃষ্ণ কি’ নামে এক উপন্যাস লেখেন। ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য দা ভিঞ্চি কোড’-এর ধাঁচায় লিখিত এই আর্কিওলজিক্যাল থ্রিলারের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল তাজমহল। অশ্বিন এখানে তাজকে ঘিরে থাকা কিংবদন্তিগুলিকে একটা ‘রিসার্চ’-এর খোলস পরান। এবং তাজের পিছনে এক বিশাল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ক্রিয়াশীল হিসেবে দেখান। তাজ আসলে এক হিন্দু মন্দির, তাকে ‘কভার আপ’ করে রাখা হয়েছে এমন এক কারণে, যার শিকড় ‘মহাভারত’-এ নিহিত আর সেই শিকড়ের গোড়ায় রয়েছে শ্রীকৃষ্ণ— এমন এক কল্প-ইতিহাস খাড়া করেন অশ্বিন। পশ্চিমি আর্কিওলজিক্যাল থ্রিলারের কপিক্যাট এই লিখন ভারতে সমসময়ে মাথা তুলতে থাকা উগ্র হিন্দুত্ববাদের অন্য এক অভিমুখ খুলে দিয়েছিল, সন্দেহ নেই। আর এক লেখক আমিশ ত্রিপাঠী তাঁর ‘শিভা ট্রিলজি’-তে শিবকে পুনর্জন্ম দান করে নয়া-হিন্দুত্ববাদকে হলিউডি আধুনিকতায় যখন উন্নীত করছেন, অশ্বিনের কৃষ্ণ-দর্শন প্রায় একই সময়ে কৃষ্ণকে শিখণ্ডী বানিয়ে তাজমহলের ইতিহাসকে অন্য খাতে বইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই হাইপোথিসিস থেকে সঙ্গীত সোম বা যোগীর বাচন খুব দূরে নয়। সঙ্গীত বা যোগী যদি আম জনতার মনে তাজ-বিদ্বেষ প্রবিষ্ট করাতে চেয়ে থাকেন, তা হলে অশ্বিন তাকে ইন্টেলেকচুয়ালাইজ করে ইংরেজি জানা ভারতীয় পাঠকের প্লেটে তুলে দেন।

তাজকে পিছনে রেখে ট্রাম্প জামাতা। ক্যামেরায় কন্যা ইভাঙ্কা। ছবি: এপি।

এত সব সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতে এসে তাজমহল দেখতে চাইলেন। ট্রাম্প-পত্নী তাজ মহলে তোলা তাঁদের ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে তাতে ভারত-প্রেমের সিলমোহর বসালেন। সর্বোপরি যোগী আদিত্যনাথ ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের হাতে স্মারক হিসেবে তুলে দিলেন তাজমহলেরই ছবি। যমুনার কালো জলে বয়ে গেল তাঁর অতীত উক্তিসমূহ, তাঁর দলের তাজ-বৈরিতা। দলপতি নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহও স্পিকটি নট হয়ে থাকলেন। ‘কলঙ্ক’ তাজমহল ট্রাম্প-স্পর্শে খানিক সময়ের জন্য হলেও জাতে উঠল।

আরও পড়ুন: ‘সেনাই সন্ত্রাসের উৎস’, রাষ্ট্রপুঞ্জের বাইরে পোস্টার পাক সংখ্যালঘুদের

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অব্যবহিত পরে উৎপল দত্ত ‘জনতার আফিম’ নামের একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। তাতে বার বার একটি সংলাপ উচ্চারিত হয়েছিল—“তাজমহল উড়িয়ে দিলে নীচে হনুমান জন্মভূমি পাওয়া যাবে”। ১৯৯২-এ দাঁড়িয়ে করা এই বক্রোক্তি যে পরবর্তী কালে সত্য হিসেবে দেখা দেবে, তা ক্রান্তদর্শী নাট্যকার বুঝেছিলেন। কিন্তু তা যে বুমেরাং হয়ে যেতে পারে, বৃহত্তর ক্ষমতার সাপেক্ষে নিজের ছোড়া থুতু নিজেকেই চেটে খেতে হয়ে পারে, তা বোঝা যায়নি। যোগীর হাতে তাজের ছবি তাই কেমন একটা খাপছাড়া বলেই মনে হল।

এমনই গড়াবে দিন। দূষণে আক্রান্ত তাজ ক্রমে তার চেহারা হারাবে। মলিন এই সৌধকে যে যেমন ইচ্ছে ব্যবহার করবে। বারোয়ারি দুধের বাটির মতো যে পারবে যখন ইচ্ছে তাতে চুমুক দেবে। কালের অমোঘ নিয়মে তাজ ডুবে যাবে। হয়তো তার কিংবদন্তিগুলিই ভেসে থাকবে। ভেসে থাকবে গ্রামের মেলায় ফোটোগ্রাফারের তাঁবুতে তোলা সদ্য প্রেমে পড়া যুবক-যুবতীর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে তাজের কাট-আউট। বেঁচে থাকবে রফি সাহেবের ‘যো ওয়াদা কিয়া ও নিভানা পড়েগা’ গানে, ১৯৬৩ সালে প্রদীপকুমারের অভিনয়ে। তাজ থাকবে বৈরিতা আর অ্যাডমিরেশনের মাঝখানের ধূসর অঞ্চলে। হনিমুন যুগল তার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবেন। হয়তো সেই মধুচন্দ্রিমাও ফিকে হতে হতে একদিন উবে যাবে। ছবি থাকবে। কাট আউট-ই হোক বা রিয়্যাল, ছবি থাকবে। এ কথা ট্রাম্প জানেন। সম্ভবত যোগী ও তাঁর দলও জানে। তাই...

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন