নূতন মন্ত্রিসভা নূতন ভাবে শুরু হইল, কিন্তু তাহাতে অনেকাংশেই পুরাতনের ছাপ থাকিয়া গেল। শুধু ছাপ নহে, পুরাতন ভ্রান্তি, পুরাতন উদ্বেগ। রাজনাথ সিংহের স্থানে যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ভার লইলেন অমিত শাহ, তখন অনেকের মনেই সংশয় জন্মিয়াছিল যে নূতন মন্ত্রীর পরিচিত চরমপন্থা যদি স্বরাষ্ট্র-অন্তর্গত বিবিধ ক্ষেত্রে, যেমন কাশ্মীরে, গৃহীত হয়— তাহাতে সত্যই দেশের ভাল হইবে কি না। রাজনাথ সিংহ যে ভাবে স্বরাষ্ট্রভার বহন করিয়াছেন, অমিত শাহ মোটেই সেই ভাবে কাজটি করিবেন না। দায়িত্ব লইবার পরেই দেখা গেল, আশঙ্কা সত্য, অমিত শাহ জঙ্গি তালিকা বানাইয়া বলপ্রয়োগের নকশা তৈরি করিতে উদ্যত। অথচ এই পাঁচ বৎসরে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট। কাশ্মীরের সঙ্কট ঠিক সোজাসাপ্টা চরমপন্থা দিয়া মেটানো অসম্ভব, শান্তির সন্ধান করিতে হইলে ওই চরম পথটি বাদ দিয়া অন্য ভাবে অগ্রসর হইতে হইবে। বাস্তবিক, গত সরকার কঠোর হাতে দমননীতি প্রয়োগ করা শুরু করিবার পরই উপত্যকায় যুগপৎ জঙ্গির সংখ্যা এবং জঙ্গিবাহিনীর প্রতি নাগরিক সহানুভূতির পরিমাণ অনেক দ্রুত বাড়িতে শুরু করিয়াছে। জঙ্গি হানাও বাড়িয়াছে। সরকারি হিসাবই বলিয়া দেয়, এই মুহূর্তে কাশ্মীরে চিহ্নিত জঙ্গির সংখ্যা তিন শতাধিক। এর মধ্যে ধ্বনিত হইতেছে নূতন মন্ত্রী-প্রস্তাবিত নূতন প্রশাসনিক ছক। জম্মু ও কাশ্মীরে আসন পুনর্বিন্যাসের নামে যদি রাজ্য পরিচালনার ক্ষমতা মুসলিমপ্রধান কাশ্মীর উপত্যকার বদলে হিন্দুপ্রধান জম্মুর হাতে তুলিয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে উপত্যকার বিস্ফোরক পরিস্থিতি নিশ্চিত দ্রুততর বেগে মন্দ হইবে। 

অমিত শাহের দক্ষিণ হস্ত হিসাবে মনোনীত হইয়াছেন অজিত ডোভাল। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে ডোভালকে ইতিমধ্যেই বিশেষ ক্ষমতা দিয়া প্রায় মন্ত্রীর তুল্য স্থানে বসানো হইয়াছে, মন্ত্রীর মতো তাঁহার পদটিও পাঁচ বৎসরের জন্য বহাল হইয়াছে। প্রসঙ্গত, অজিত ডোভালই বিগত পাঁচ বৎসরের চরমপন্থী কাশ্মীর নীতির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ও সক্রিয় কর্তা। কাশ্মীরের ‘ডাব্‌ল স্কুইজ়’ নীতির প্রকাশ্য প্রণয়ন তাঁহারই কাজ। একই সঙ্গে কাশ্মীরে আক্রমণ চালাইয়া ও উপত্যকার উপর চাপ বাড়াইয়া ভারতের অধিকার সর্বতো ভাবে মান্য করিয়া চলিবার সাঁড়াশি নীতিটির কথা বলিয়া ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রপুঞ্জে তিনি অপ্রিয় হইয়াছেন। পুলওয়ামার কথা ভারত ভুলিবে না, এবং জঙ্গিদেরও ভুলিতে দিবে না, এই মর্মে সাম্প্রতিক অতীতে একটি উক্তি করিয়াছেন তিনি, যাঁহার কাশ্মীর নীতি সম্পর্কে ‘তীব্র’ এবং ‘ব্যাপ্ত’ এই দুইটি শব্দ বিশেষজ্ঞ মহলে ঘোরাফেরা করে। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ডোভাল একটি বৃহত্তর পূর্ণাঙ্গ নীতি অনুসরণ করিতেছেন, এমন দাবি যাঁহারা করেন, তাঁহারাও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন থাকেন, ডোভালের কাশ্মীর নীতির ‘তীব্রতা’ লইয়া। কাশ্মীরে নাশকতার সংখ্যা যদি এই তীব্রতায় বাড়ে, পুলওয়ামাকে সত্যই হয়তো ভোলা যাইবে না। কাশ্মীরই ভারতকে তাহা ভুলিতে দিবে না, অতীত হিসাবে পিছনে ফেলিয়া আসিতে দিবে না।

একটি কথা এত দিনে স্পষ্ট। কাশ্মীরকে যদি অঙ্গরাজ্য হিসাবে দেখিতে হয়, কাশ্মীরিদেরও নাগরিক হিসাবে কতগুলি অধিকার ও মর্যাদা দিতে হইবে। অনন্ত কাল ধরিয়া তাঁহাদের আফস্পা ও সেনাতন্ত্রের অধীন রাখা যাইবে না। সাধারণ জীবনযাপনের পথ হইতে সাধারণ কাশ্মীরিদের এত দূরে সরাইয়া আনা যাইবে না। নির্বাচনের সময় যে ভাবে শ্রীনগর ও জম্মুর প্রধান সংযোগ-সড়কটিকে দীর্ঘ দিনের জন্য অকেজো করিয়া রাখা হইল, তাহাই প্রমাণ, অবশিষ্ট ভারত হইতে কাশ্মীর কত, কত দূরে। নূতন মন্ত্রককে মনে করাইয়া দেওয়া দরকার: এই ক্রমশ-বর্ধমান দূরত্ব ঘুচাইয়া যদি কাশ্মীরি নাগরিকদের কাছে টানা যায়, একমাত্র তবেই ‘কাশ্মীর নীতি’র সাফল্য সম্ভব। অন্যথা— ব্যর্থতা সুনিশ্চিত।