আজ ২৫ জুন থেকে মস্কোয় শুরু হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবির প্রদর্শনী। চারিদিকে যুদ্ধের দামামার মাঝে সৌহার্দের সন্দেশ। রুশ সাংস্কৃতিক সংস্থা জিইএস-২ হাউস অব কালচারের আয়োজনে মস্কোভা নদীর তীরে তাদের সভাঘরে প্রদর্শনী, সঙ্গী ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক ও বিশ্বভারতী। শিরোনাম, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন আ সিঙ্গল নেস্ট: ফলোয়িং দ্য ওয়ে অব টেগোর’।
যে ৫৯টি ছবি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, তাদের মধ্যে আছে প্রাকৃতিক দৃশ্য, মানুষের প্রতিকৃতি, জীবজন্তুর চিত্র। অধিকাংশ ছবিই আলঙ্কারিক, প্রকৃতির নিখুঁত অনুকরণের চেষ্টা তাতে নেই। কয়েকটি জ্যামিতিক আকারের, কিছু নাটকীয় ও অদ্ভুত মুখোশের নকশায় চিত্রিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রবীন্দ্র-ছবিগুলি রেখা ও রূপকল্পের ছন্দে আভাসিত অন্তরের তীব্র আকুতি। নন্দলাল বসুর মতে, “সে ছবি কেবল চোখ মেলে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা ছাড়া বোঝবার আর কোন প্রকৃষ্ট উপায় দেখিনে।” আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে রাণী চন্দ উল্লেখ করেছেন ছবি-আঁকা সম্বন্ধে কবির নিজস্ব ধারণা : “স্বপ্ন বলে একটা পদার্থ আছে। বরাবর মানুষ সেই স্বপ্নকে সার্থক করতে চেয়েছে। আমার হাতেই তা আছে, যা পাইনি। শিল্পী তুলি নিয়ে বসল। আপন অন্তরের যা রূপ ফুটিয়ে তুলল। যা বিধাতা পারেনি। আমার হাতে ভার ছিল, তাই দেখিয়েছি।” অবন ঠাকুরের ভাষায় ‘ইট ওয়াজ় ইউনিক’; বিশ্লেষণের নয়, বোধের সামগ্রী।
১৯৩০-এ সোভিয়েট ইউনিয়নের বৈদেশিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সংস্থার আমন্ত্রণে তাঁর প্রিয় লেখক টলস্টয়, তুর্গেনেভ ও গোর্কির দেশে প্রথম পা রাখেন সত্তর ছুঁই-ছুঁই রবীন্দ্রনাথ। তত দিনে রবিরশ্মির স্নিগ্ধ উদ্ভাস মন ছুঁয়েছে রুশ পাঠকের, আইভান বুনিনের সম্পাদনায় নিকোলাই পুশেশনিকভ কর্তৃক অনূদিত রুশ ভাষায় গীতাঞ্জলি ১৯১৪-তেই পৌঁছেছে ঘরে ঘরে। রবীন্দ্র-গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক— অনুবাদের নিবিড় অনুষঙ্গ গড়ে উঠেছে মস্কো ও লেনিনগ্রাদ জুড়ে। ১১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর, যে দু’সপ্তাহ কবি মস্কোয় কাটালেন তা ছিল ব্যস্ত নির্ঘণ্টে ঠাসা। তাঁর সৃষ্টিসুখের পসরায় তখন সবেমাত্র যোগ দিয়েছে তাঁর আঁকা ছবিগুলি। রাশিয়াবাসীর কাছে তার হদিস তখনও পৌঁছয়নি। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া ভ্রমণের একটা উল্লেখযোগ্য দিক তাই বাছাই করা চিত্রের প্রদর্শনী।
১৭ সেপ্টেম্বর মস্কোর স্টেট মিউজ়িয়ম অব নিউ ওয়েস্টার্ন আর্ট গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখতে শিল্পরসিকেরা ভিড় জমালেন। গান কবিতা গল্প লেখার পাতায় কাটাকুটি করে যে সংশোধন ও পরিমার্জনের কাজ তিনি করতেন, তা বিভিন্ন আকার ধারণ করে একটা শিল্পের রূপ পরিগ্রহ করেছিল আগেই। ক্রমে ছবি আঁকার ঝোঁক তাঁকে পেয়ে বসল। রাশিয়ার কাছে তিনি তাঁর ‘সৃষ্টির... নতুনতম প্রকাশের ফল’ তুলে ধরলেন। ত্রেতিয়াতভ আর্ট গ্যালারির ডিরেক্টর জানালেন, রাশিয়াবাসী ‘সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সব নতুন বিকাশকে বিরাট মূল্য দেয় বলে’ তাঁদের শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উপকৃত হবেন। এর আগে রবীন্দ্রসৃষ্টি প্রসঙ্গে রুশ জাতির মনোভাব যাঁরা তুলে ধরেছেন, তাঁদের অন্যতম আইভান বুনিন এবং নিকোলাই রোয়েরিখ। রবীন্দ্রনাথ-রোয়েরিখ প্রথম সাক্ষাৎ ১৯২০-তে, লন্ডনে। প্রখ্যাত এই রুশ শিল্পীর প্রকৃতিচেতনায় কবি মুগ্ধ হয়েছিলেন।
সৃজনের রূপভেদ থাকতে পারে, কিন্তু যে সন্ধিৎসা থেকে তার জন্ম, তার মূলে আছে মানবিক সংবেদন। বলশেভিক বিপ্লবের আঁচে জ়ার প্রভুত্ব ধ্বংস হলেও যে সৌন্দর্যচেতনা প্রাসাদে অট্টালিকায় শিল্পসামগ্রীর মধ্যে ধরা ছিল, তার উদার গ্রহীতা হতে সোভিয়েট অনীহা দেখায়নি। সেই অভিজ্ঞতা রবীন্দ্র-কলমে: “ধনীদের পরিত্যক্ত প্রাসাদ থেকে ছাত্ররা অধ্যাপকেরা অর্ধঅভুক্ত শীতক্লিষ্ট অবস্থায় দল বেঁধে যা-কিছু রক্ষাযোগ্য জিনিস সমস্ত উদ্ধার করে য়ুনিভার্সিটির ম্যুজিয়ামে সংগ্রহ করতে লাগল।” সংস্কৃতির বিনিময়ের মধ্যে যে মানবমনের সহমর্মিতা লালিত হয়, তার আর এক প্রমাণ, মস্কোয় সের্গেই আইজ়েনস্টাইনের বিখ্যাত ছবি ব্যাটলশিপ পোটেমকিন দেখেন রবীন্দ্রনাথ। আইজ়েনস্টাইনের ভাবী পত্নী পেরা আতাশেভা সাক্ষী ছিলেন ছবি দেখার সময় রবীন্দ্র-অভিব্যক্তির। যে দৃশ্যে নিরীহ মানুষের উপর জ়ারের সেনা গুলি চালাচ্ছে, কবি তখন বিচলিত হয়ে উঠছেন, হাতের মুঠো দৃঢ় হচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথ যখন রাশিয়া ভ্রমণ করছেন, তখন ভারতে ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘনাচ্ছে। বিপ্লবের আঁতুড়ঘর রাশিয়ার সঙ্গে কোনও ভারতীয়ের সম্পর্ক যে ইংরেজ শাসক ভাল চোখে দেখবে না, জানা ছিল তাঁর। পাছে বিশ্বভারতীর উপর এর কোনও প্রভাব পড়ে, তাই তিনি রাশিয়ায় তাঁর কর্মসূচি ও কথাবার্তায় ছিলেন সতর্ক; নতুন শিক্ষাপ্রসারের কাজ সেখানে কী ভাবে ত্বরান্বিত হচ্ছে তা বোঝায় মন দিলেন। ২০ সেপ্টেম্বর রথীন্দ্রনাথকে লিখছেন, “আমরা শ্রীনিকেতনে যা করতে চেয়েছি, এরা সমস্ত দেশ জুড়ে প্রকৃষ্টভাবে তাই করছে। আমাদের কর্মীরা যদি কিছুদিন এখানে এসে শিক্ষা করে যেতে পারত তা হলে ভারি উপকার হত।”
রবীন্দ্রনাথের এই অন্তর্দৃষ্টি আজ অনেকাংশেই বাস্তবায়িত। আজ বছরে প্রায় কুড়ি হাজারেরও বেশি ভারতীয় শিক্ষানবিশ হাতে-কলমে তালিম নিতে ভারত-রুশ যৌথ ব্যবস্থাপনায় রাশিয়া পাড়ি দিচ্ছে। নীতি আয়োগের অধীনে ‘অটল ইনোভেশন মিশন’ প্রকল্পের কর্মসূচিকে রাশিয়ার সোচি-তে সিরিয়াস এডুকেশনাল সেন্টারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে কারিগরি শিক্ষা ও শিল্পোদ্যোগ ভাবনাকে একটা পোক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানোর মিলিত প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। শিক্ষাবিস্তার, পরিকাঠামো বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দুই দেশের এই উদ্যোগ এক সংহত প্রয়াস। ভারত-রুশ সম্পর্ক আজ রাষ্ট্রীয় স্তরে স্থায়ী আন্তঃসরকারি কমিশনের পর্যায়ে উন্নীত। দুই দেশের অর্থনৈতিক বোঝাপড়ার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত— এমন এক সময়ে যখন রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া-যাত্রা শতবর্ষ ছোঁবে অচিরেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)