খবরটা যখন সহকর্মী ফোনে জানালেন, মনে হল, যাক, এত দিনে হদিস মিলল। পশ্চিমবঙ্গে যে এত বছর ধরে রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা ঘাপটি মেরে বসে ভোট দিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের একাংশের সন্ধান তো মিলল।
এ বার খবরটা বলা যাক, কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল লোকসভায় জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের মোট সংখ্যা কমে গিয়েছে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২৪ লক্ষ। আর এসআইআর-এর পর ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তালিকা মোতাবেক তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৬ লক্ষ। মৃত-বেপাত্তা-স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম এখানে বাদ গিয়েছে। এঁদের বাদ দিয়েও তো কয়েক লক্ষ রয়ে গেলেন, বিয়ের পরে পদবি বদলের কারণে যাঁদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টে করা মামলায় মোস্তারি বানু এই সমস্যার কথাই বলেছেন। মন্ত্রক এ-ও জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি ১০০০ পুরুষ ভোটারের বিপরীতে মহিলা ভোটারের সংখ্যা (লিঙ্গ অনুপাত) ২০২৫ সালে ভোটার তালিকার স্পেশাল সামারি রিভিশন (এসএসআর)-এ ছিল ৯৬৯। এসআইআর-এর পরে সেটা এখনই ৯৬৪-তে নেমেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। এর আগে এই অনুপাত ২০২১ সালে ছিল ৯৬১। সেটা থেকে বেড়ে ওই অনুপাত ২০২২ সালে ৯৬৫, ২০২৩ সালে ৯৬৭ এবং ২০২৪ সালে ৯৬৮ হয়েছিল। এখন সেটা ৯৬৯ থেকে ৯৬৪ হয়ে গিয়েছে।
তা হলে যাঁরা বাদ পড়ছেন বা পড়বেন, তাঁদের সকলেই অনুপ্রবেশকারী?
রাজ্য জুড়ে যে মানুষেরা সব কিছু ফেলে শুনানিতে লাইন দিয়েছেন, এখন ট্রাইবুনালের নথি জমা দেওয়ার জন্য লাইন দিচ্ছেন, তাঁরা কারা? সব সন্দেহভাজন? যাঁদের বিচারাধীন বলা হচ্ছে?
গণতন্ত্রে বিচারাধীন? চমৎকার।
খুব পরিষ্কার করে বলছি, সাধারণ, গরিব মানুষকে যখন বার বার লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয় ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য এবং দেশে থাকার অধিকার আদায়ের জন্য (দেশে থাকার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছি, কারণ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বার বারই বলছেন, চিহ্নিত করো, বাদ দাও, দেশ থেকে তাড়াও, ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’), মহিলা এবং মুসলিমদের নির্বিচারে ভোটার তালিকার বাইরে রাখা হয়— তখন সেই প্রক্রিয়া আর যা-ই হোক, গণতন্ত্র নয়। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, এটা আমরা যেন না ভুলি, কয়েক লক্ষ ভোটারকে বাইরে রেখে আমরা এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছি।
যে কোনও গণতন্ত্রেই ভোটের প্রক্রিয়ায় ভোটারদের বেশি করে শামিল করা, ভোটদানে উৎসাহিত করাই লক্ষ্য, সেখানে আমাদের দেশে এ বার উলটপুরাণ শুরু হল— যা ধিক্কারযোগ্য, যা ন্যক্কারজনক। দিনের শেষ বিষয়টা এটাই দাঁড়াচ্ছে, পয়সা খরচ করে আদালতে উকিল দাঁড় করাতে পারলে বা কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হলে আপনার ভোটার তালিকায় নাম উঠলেও উঠতে পারে। নইলে আপনার হাতে একটি বৃহৎ শূন্য।
ভোটার তালিকায় জল মেশানো বা ভূতের আবির্ভাব নতুন নয়। সেই তালিকা ঝেড়েপুঁছে পরিষ্কার করা নির্বাচন কমিশনের কাজ, তারা তা করবে, কঠোর ভাবেই করবে। কোনও ‘অনুপ্রবেশকারী’ (এটা তো প্রিয় শব্দ নব্য ভারতের) ভোটার তালিকায় থাকবেন না, এটাই কাম্য, এটাই হওয়া উচিত। তার জন্যও যা যা দরকার তা করতে হবে। কিন্তু তার নাম করে এই ভাবে নির্বিচারে ভোটারদের পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দেওয়া, ভয় দেখানো— এ সব কোন গণতান্ত্রিক শিক্ষা? যা নির্বাচন কমিশন দিচ্ছে?
কাজের চাপে বিএলও-র মৃত্যু বা ভয়ের চোটে কোনও নাগরিকের মৃত্যু নিয়ে যখন শোরগোল হল, কমিশন সূত্রে বলা হল যে, পশ্চিমবঙ্গে তো খসড়া তালিকার প্রক্রিয়ার ৯০ শতাংশের বেশি কাজ হয়েই গিয়েছে, তা হলে আর কিসের চাপ, কিসেরই বা আত্মহত্যা? খুব ভাল যুক্তি। আমরা মেনে নিলাম। তার কয়েক দিনের মধ্যেই চলে এল লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি, যার কারণ হিসেবে বলা হল, যে ম্যাপিং-এর এই ৯০ শতাংশ কাজেই এত জল মেশানো যে তা ছাঁকতেই হবে!
ভাল কথা। ছাঁকুন। তবে সেই ছাঁকনির নির্দেশ আসতে লাগল ওয়টস্যাপে। জল মেশানোর দায়ে এ দিক-ও দিক শাস্তি দেওয়া হতে লাগল, বড় মেজো সেজো সব স্তরে পর্যবেক্ষক বসানো হল। তাতেও ‘ভরিল না চিত্ত’। যত দিন না মুখার্জি/মুখোপাধ্যায় বা ব্যানার্জি/বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফারাকের জন্যও ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’তে ডাক না পড়ল, শহুরে মধ্যবিত্ত বুঝতেই চাইল না যে বাঙালির পদবি, পরিবার, সমাজ-সংস্কৃতি না-বোঝা মনুষ্যকৃত এই অসামান্য বিভাগটি তাঁদের জন্যও। তার আগে পর্যন্ত আমরা শুধুই ভেবেছি, ও তো মুসলমানগুলোর নাম বাদ যাচ্ছে, আমাদের আর কী?
মুসলমান এবং মহিলা— নব্য শাসনতন্ত্রে নিশানা তো এই দুই গোত্র। শুধু বিজেপি নয়, চার দিকে তাকিয়ে দেখুন, এ আমাদের অন্তরের কথা। ভোটের জন্য আমি কোনও গোত্রের মুসলমানকে গলা জড়িয়ে ধরলাম সেই ভণ্ডামি সরিয়ে রেখে দেখুন, এই ভারতকে শুধুমাত্র হিন্দুদের থাকার বাসস্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে কি না? নইলে মুসলমানের মিষ্টির দোকান থেকে যেন প্রসাদ না নেওয়া হয়, মুসলমানপ্রধান কাশ্মীরে যেন কেউ বেড়াতে না যান, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতা ত্যাগ করুন— বলার মতো স্পর্ধা তো এই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা দেখিয়েই চলেছেন। তাঁর দল থেকে কোনও প্রতিবাদ এসেছে কি? আসেনি।
চিন্তায় আর একটি দৈন্য এবং স্পর্ধার বিষয় হল মুসলমান এবং মহিলাদের শুধুমাত্র তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক ভেবে নেওয়া। কেন? তৃণমূল এবং তাদের সরকার সকলকে টাকার দাস মনে করে, মনে করে টাকা দিলেই হয়ে গেল, যদিও টাকা তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কিন্তু এই মনোভাব তো বিরোধী দলগুলোরও, নইলে গরিব মানুষের নাম যখন বাদ যাচ্ছে, মুসলমানদের নাম যখন বাদ যাচ্ছে, মহিলাদের নাম যখন বাদ যাচ্ছে, রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশিদের নাম করে প্রধান বিরোধীদের উল্লাস যখন দেখার মতো— অন্য বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা কী ছিল?
এসআইআর শুরুর প্রথম থেকে তাঁরা কী করেছেন? কোন স্পর্ধায় তাঁরা ভেবে নিলেন যে, সব মুসলমান এবং মহিলামাত্রেই তৃণমূলের দলদাস? কেন তাঁরা ভাবলেন, আমরা কেন জড়াব, যাচ্ছে তো তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক, আমাদের কী? সত্যিই তো কী? দরিদ্র মানুষ তো স্লোগানের উপকরণমাত্র। ধিক্কার এবং গভীর ধিক্কার এ রাজ্যের শাসক-বিরোধী সকলকে, মানুষকে আপনারা মনুষ্যেতর ভেবে নিয়েছেন যে একটা খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে দিলেন এবং তার পরই কোতল। এই ভাবনার নাম গণতন্ত্র? মানুষকে, নাগরিককে ‘নাগরিক’ বলে সম্মান দিতে শেখেননি, সকলেই আপনাদের কাছে ভোটব্যাঙ্ক এবং দলদাস।
আর আমাদের মতো শহুরে মধ্যবিত্তের কথা তো ছেড়েই দিন। নোটবন্দির সময়েও শুনেছিলাম, সীমান্তে সেনারা কত কষ্ট করেন, আর আপনারা এইটুকু করতে পারবেন না? আমরা তো মেনেই নিয়েছি ভারত একটি লাইন-তন্ত্র, এখানে গরিব মানুষ লাইন করে দাঁড়াবেন, মরবেন নিজের অধিকারটুকু পাওয়ার জন্য। ‘জোশ’ তো একেই বলে।
আর এখন তো সকলেই রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, সোজা ভাষায় মুসলমান হলেই তাড়াও। এই প্রক্রিয়ায় যে সব প্রশ্ন করা হয়েছে, তাতে ধরে নেওয়া হয়েছে, ছ’টি সন্তান একমাত্র মুসলিমদেরই হয়, বহুবিবাহ মুসলিমদের, ফলে সন্তান-বাবার বয়সের ফারাক বা মা-সন্তানের বয়সের ফারাক দিলেই জালে সব পড়বে ধরা। চমৎকার ভাবনা। তারিফযোগ্য।
দেশ থেকে নাবালিকা বিবাহ উঠে গিয়েছে, দেখুন তো, জানতেই পারিনি আর আমাদের নেতানেত্রীদের পরিবারে বোধ হয় স্বাধীনতার পর থেকেই দু’টি সন্তানের নীতি চালু হয়েছে।
অশালীন শোনাচ্ছে? শোনাক, কারণ গণতন্ত্রের নামে যে সব বিধি তৈরি হয়েছে এবং যা চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে, তার চেয়ে এই বাক্য কম অশালীন।
অশালীন এই আচরণ যখন গৃহসহায়িকাদের নাম তালিকায় নাম না উঠলে আমরাই বলেছি, হিন্দু তো, চিন্তা কোরো না বা ‘মুসলিম, তোমার কিন্তু বিপদ আছে’। বলিনি? অস্বীকার করতে পারি কি আমরা, হে শহুরে ভণ্ড মধ্যবিত্ত?
গ্রামের মানুষ আমার সহনাগরিক নন, মহিলা আমার সহনাগরিক নন, মুসলমানরা তো ননই, এই বিশ্বাস নিয়ে কোথায় চলেছি আমরা? লক্ষ্মীর ভান্ডার যখন হয়েছে, নারায়ণ ভান্ডার কেন হবে না— এ হেন পুরুষতান্ত্রিক, নির্বোধ প্রশ্ন এই রাজ্যের পুরুষদের একটা অংশ এমন অকুণ্ঠিত ভাবেকরতে পারে?
নিয়মের পর নিয়ম, বিধির পর বিধি স্রেফ ওয়টস্যাপ বার্তায় পাঠানোর নতুন সংস্কৃতি তৈরি করা, বিএলও থেকে বিচারবিভাগ, সকলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কোনও কাজের দায় স্বীকার না করা নির্বাচন কমিশন যখন গণতন্ত্রের কথা বলে, বলে যোগ্য ভোটার যেন এক জনও বাদ না যান, এটাই তাদের লক্ষ্য, অথচ ভোটারদের সচেতন করা, ট্রাইবুনালে কোথায় কী ভাবে কত দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে, সেটা পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন বোধ করে না (ফেসবুক পোস্ট ধর্তব্য নয়), কিংবা অনলাইন আবেদনে ১০০০ শব্দ লিখতে বলে, তখন তা চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রের প্রহসন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটকের কথা বড় মনে হয়। নাটকের একটি দৃশ্যে ঔরঙ্গজেবের ভণ্ডামি দেখে সহোদরা জাহানারা বলেছিলেন, আবার বলি, ঔরঙ্গজেব, চমৎকার।
আবার বলি, চমৎকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)