E-Paper

‘অবিবাহিত, তবুও পেলেন!’

ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসীরা বলবেন, এ আবার কী! আধুনিক কালে, বৈবাহিক মতে সংসারবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা তো ব্যক্তির নিজস্ব।

শ্রীদীপ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৩

বহু দশক আগে ‘প্রফেসর’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, যার যতই বাড়ি পেতে অসুবিধা হোক না কেন, অধ্যাপকের হয় না। দিনকাল বদলেছে, বহু বছর অধ্যাপনা করার পরেও বাড়ি পেতে অসুবিধা হয় বইকি। অন্য ভাবে বলতে গেলে, ‘সৎ চরিত্র’-র সামাজিক স্বীকৃতি ও ছাড়পত্র পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাই যথেষ্ট নয়। সমাজ, সেই সমাজের বাড়িওয়ালা বা কর্তৃপক্ষ আপনাকে কোন চোখে দেখে, তা প্রাথমিক ভাবে নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট পূর্বস্থিতির উপরে, আপনি বিবাহিত না অবিবাহিত? বিয়ের বৈধতা অব্যর্থ ভাবে প্রমাণের জন্য, আপনার সন্তান ক’টি ইত্যাদি।

ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসীরা বলবেন, এ আবার কী! আধুনিক কালে, বৈবাহিক মতে সংসারবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা তো ব্যক্তির নিজস্ব। তার উপর কেন নির্ভর করবে তার বাঁচার সুবিধা-অসুবিধা? ন্যায্য প্রশ্ন। নৈতিকতার তালাচাবি আগলে বসে আছেন যাঁরা, তাঁরা অবশ্য ঠিক বুঝিয়ে দেবেন, এ সব ক্ষেত্রে যুক্তি খাটে না। নিয়ম মানে নিয়ম, এবং তা সমাজের কল্যাণেই। সেই সমাজের বিচারে ‘একা’ একটি বিপজ্জনক ব্যাপার, এবং ব্রাত্য। তাই এককদের সামাজিক ভাবে বহিষ্কারই শ্রেয়। সরাসরি না তাড়ালেও, এককদের প্রতি সন্দিগ্ধ হওয়া প্রয়োজন; বিস্তর যাচাই প্রক্রিয়ায় পাশ করালেও তাদের বাতিল করলেই মঙ্গল। কারও অধ্যাপনা, গবেষণা ও যাবতীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুঁজি তাই এককের বিরুদ্ধে একত্র সামাজিক প্রতিরোধকে কিছুমাত্রায় নরম করতে পারলেও, তাকে বাতিল করতে পারে না। অবিবাহিত অধ্যাপকের প্রবেশাধিকার থেকে যায় অনিশ্চিত।

অবিবাহিত মানেই সে সম্ভাব্য দুশ্চরিত্র, আলবাত বাউন্ডুলে। তাকে সীমার বাইরে না রাখতে পারলেই গোলমাল। সম্প্রতি এই বাতিল-কাণ্ডের সম্মুখীন হতে হয়েছিল আর এক বার, এই মাঝবয়সেও। বছরের শুরুতে সামান্য সঞ্চয়-প্রয়াসে নতুন ভাড়াবাড়ির সন্ধানে বেরিয়েছিলাম— গত দশ বছর যেখানে ছিলাম, তার ভাড়া বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। সন্ধানের শুরুতেই বুঝলাম, বাড়ি পেতে গেলে আয়কর রিটার্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপত্র এবং শেষ কয়েক মাসের বেতনের নথিও যথেষ্ট নয়। সব দালালেরই এক রায়: আমার ‘ব্যাচেলর’ পরিচয় কোনও অবস্থাতেই প্রকাশ করা যাবে না; একা থাকি বা একাই থাকব, উল্লেখ করা মানেই আমার প্রবেশের সম্ভাবনা বিপন্ন করা। কেন এ নিয়ম, সে প্রশ্ন বৃথা। ঢুকতে চাইলে নিয়ম মানতে হবে; প্রবেশাধিকার মিলবে সামাজিক আনুগত্যের শর্তে।

বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আমার রাজনৈতিক মতামত বা যৌন অবস্থান এ ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। আমি কেন বিবাহপ্রথার বিরোধী; বা বৈবাহিক জীবনকে কেন নীরস একঘেয়ে মনে করি, সেই ব্যাখ্যা বৈঠকে মুখরোচক হলেও, বাড়িওয়ালা মহলে কুৎসা ভিন্ন কিছু নয়। কারণ সমাজের বিচারে অবিবাহিত মানেই অনুশাসনহীন জীবনযাপন, চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, অনুমান করে নেওয়া নানান অনৈতিক প্রবণতা। সেই অনুমান কি শুধুই নৈতিক নিন্দা? না কি সেটা এক রকম সামাজিক বিদ্বেষ ও ভয়ের প্রতিফলন— আপেক্ষিক স্বাধীনতার সঙ্গে, পারিবারিক বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করে, নিজের শর্তে যাঁরা জীবন কাটান, তাঁদের প্রতি?

এই বিপন্ন নৈতিকতা পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব এসে পড়ে এই শহুরে ‘খাপ’গুলির উপরে, যারা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামাজিক সুস্থতা বজায় রাখতে সচেষ্ট। এঁদেরই এক জন কোনও দ্বিধা না করে বললেন, “কয়েক মাস সময় নিন না! বিয়েটা করে ফেলুন, তার পর আবার আবেদন করুন, তখন আমরা বিবেচনা করব। আজীবন একা থাকবেনই বা কেন?” যুক্তি-তর্কে নতুন বাড়ির তালা খোলে না। তাই ভাবলাম, খুব দূরে না খুঁজে যে হাউজ়িং সোসাইটিতে আছি, সেখানেই দেখি, তা হলে এত ঝক্কি পোহাতে হবে না। ভুলে গিয়েছিলাম যে, বিয়ে নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি অপরিবর্তিত থাকলেও, মাঝবয়সি অবিবাহিত বাসিন্দাদের প্রতি সামাজিক অসহনশীলতা কিছুমাত্রায় লাঘব হয়নি। যখন বললাম, আমি এখানে দশ বছর সম্মানজনক ভাবে বাস করেছি, আমার জীবনধারা বা আচরণের বিরুদ্ধে কেউ কখনও আপত্তি জানাননি, তা হলে সমস্যা কিসে— তখন উত্তর এল, নিয়ম নিয়মই, কেবল আমার জন্য কোনও ব্যতিক্রমকে যৌক্তিক করে তোলা যাবে না। একই অবিবাহিত ব্যক্তি কী ভাবে একই কমপ্লেক্সের অন্য ফ্ল্যাটে গিয়ে সমাজের পক্ষে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, সে প্রশ্নের উত্তরসন্ধান বৃথা।

শেষ পর্যন্ত বাড়ি পাওয়া গেল কি না, প্রশ্ন সেটা নয়। বসবাসের মতো একটা মৌলিক প্রয়োজনীয়তাকেও সমাজের যে বৈষম্যমূলক মনোভাব ও বিভাজনের মানসিকতা এত কঠিন করে তোলে শুধু এই কারণে যে মানুষটি অবিবাহিত— আসল কথা সেটাই। বাড়ি শেষ পর্যন্ত একটা পাওয়া গিয়েছিল— এমন এক কৌশলে, যার ভিত্তি আমার শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধা। কাগজপত্র জমা দেওয়ার শেষ ধাপে, এক কর্মচারী তাঁর বিস্ময় সংবরণ করতে না পেরে বলেই বসেছিলেন, “আরে, আপনি তো দেখছি অবিবাহিত, তাও পেয়ে গেলেন!”

সমাজতত্ত্ব বিভাগ, শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

unmarried

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy