ফুচকার গাড়িটা ধীরে ধীরে স্টেশন বাজারের কাছে এসে দাঁড়াল। এগিয়ে যেতে জানা গেল, ফুচকা নেই। কিন্তু, দেখতে পাচ্ছি আছে। নীরবে সরে এলাম আমরা। সারা দিনের বিক্রি না-হওয়া আনাজ, ঝোলায় ভরছিলেন এক বৃদ্ধা। ফুচকাবিক্রেতার বয়স সত্তরের উপরে, বললেন, “এই কয়েকটা ফুচকা বাঁচিয়ে রেখেছি, খেয়ে নাও।” আমার বন্ধুটি জানাল, ওঁরা স্বামী-স্ত্রী। আনাজের ঝোলা মাটিতে রেখে বৃদ্ধা ফুচকা খাচ্ছেন। বলছেন, “আর একটু ঝাল দাও!” ফুচকাবিক্রেতা একমনে শাল পাতায় ফুচকা দিচ্ছেন, মাঝেমাঝে তাকিয়ে দেখছেন স্ত্রীকে। গোধূলি বয়সি সে মানবীর মুখে তখন আনন্দের আলো।
পাশ থেকে বন্ধুটি বলে উঠল, “এই হল প্রেমের শান্তি, বুঝলি!” ‘শান্তি’ শব্দটির সঙ্গেই আমাদের যাবতীয় ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক জড়িয়ে আছে কি? রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “ইচ্ছার শেষ চরিতার্থতা প্রেমে। প্রেমে— কেন, কী হবে, এ-সমস্ত প্রশ্ন থাকতেই পারে না। প্রেম, আপনিই আপনার জবাবদিহি, আপনিই আপনার লক্ষ্য।” বন্ধুটি বলল, এ-কথা পুরোপুরি মানতে সে নারাজ। প্রশ্ন তো থাকবেই। যে ক্রমান্বয়ে বিচ্ছেদের ঘূর্ণিতে একা, যে ভালবেসে যন্ত্রণাদীর্ণ, সে কোনও প্রশ্ন করবে না? জবাবদিহি চাইবে না?
কিন্তু প্রশ্ন করব কাকে? যাকে ‘ভালবাসছি’ বলে জানি, তাকে? বন্ধুর বক্তব্য, “অবশ্যই!” একটু ভিতু স্বরেই বললাম, কাউকে ‘ভালবাসছি’, এ-কথার মানে তো আমার মনে প্রেমের যে সংজ্ঞাগুলি অবস্থান করছে তার সঙ্গে সেই ব্যক্তির কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া। সংজ্ঞা থেকে যখনই সে বিচ্যুত হবে, প্রেমহীন হবে মন। কিন্তু যদি তাকে বিচ্যুত হওয়ার স্বাধীনতা দিতে পারতাম, এবং তার পরেও একই রকম জ্বালিয়ে রাখতে পারতাম ‘ভালবাসা’ কথাটির মহিমা, সে হত মনের এক নতুন দিগন্ত ভ্রমণ!
“ঠিকই। কিন্তু পূরবী-তে রবীন্দ্রনাথ কী বলেছেন মনে কর।” কী বলছেন? “আমার বন্দনা না-পাওয়ারে।” এই না-পাওয়াকে ঘিরেই যত সমস্যা! রবীন্দ্রনাথ তাকে বন্দনা করতে চাইছেন। কেউ কেউ তাকে নীরবে মেনে নেয়। আবার কেউ সেই না-পাওয়াকে নামিয়ে আনতে চায় জীবনের সমান পাটাতনে। প্রেমে, আমার যে কষ্ট হচ্ছে, সে-ই একই পরিমাণ কষ্ট অপর জনও পাক, এই সমান্তরাল ইচ্ছের কথা সে ভাবে। এই ইচ্ছের ভিতর এক ধরনের মানবিক প্রতিশোধ আছে। মানবিক হলেও, তা শেষ পর্যন্ত কিন্তু প্রতিশোধ। প্রতিশোধকে চালিত করে নিয়ন্ত্রণহীন যন্ত্রণা, যা মাঝ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। আর দুঃখ, মৃতের নামে গাছতলায় জ্বেলে রাখা শান্ত এক মাটির প্রদীপ। প্রজ্বলনই তার প্রত্যুত্তর।
বাতাসে এখন অল্প শীত। চারিদিকে আম্রমুকুলের গন্ধ। মনে পড়ল দ্য হোয়াইট বেলুন ছবিটির কথা। জ়াফর পানাহির বানানো প্রথম ছবি। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। ছবিটিতে, তেহরানের বাজারে রঙিন মাছের দোকানে একটি গোল্ড ফিশ দেখে এক সাত বছরের বালিকার তা কিনতে ইচ্ছে করে। মা-র কাছ থেকে সে টাকা নিয়ে বাজারে কিনতেও যায়। এবং সেই নিষ্পাপ বালিকার মাছ কিনতে যাওয়ার নানাবিধ ঘটনাকে ঘিরেই এই ছবি। মাছটি কিনতে এসে মা-র দেওয়া টাকা বালিকাটির হাত থেকে একটা গর্তের ভিতর পড়ে যায়। অনেকে তা উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও, কোনও লাভ হয় না। শেষে একটি আফগান কিশোর বেলুনবিক্রেতা টাকাটি উদ্ধার করে দেয়। অনেকেরই মনে থাকবে, টাকাটি পাওয়ামাত্র বালিকাটি মাছের দোকান থেকে গোল্ড ফিশ কিনে বাড়ির দিকে দৌড়ে যায়। এক বারও ফিরে তাকায় না। তেহরানে সে দিন নববর্ষ। সকলেই উৎসবের আনন্দে বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছে। কেবল ওই কিশোর বেলুনবিক্রেতা একমনে তাকিয়ে থাকে সে-বালিকার চলে যাওয়ার দিকে। মাত্র দশ মিনিটের জন্য চরিত্রটিকে এনে, তাকেই ছবির প্রধানতম চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পানাহি। বালিকাটিকে দেখার আগের, ও দেখার পরের সেই কিশোর কিন্তু এক নয়। তার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে, প্রেম। জার্নাল-এ শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, “বিয়িং আর বিকামিং-এর মুখোমুখি ছবি”, দ্য হোয়াইট বেলুন-এর শেষ দৃশ্য সেই ‘বিকামিং’-কে দেখায়।
বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী লিভ উলম্যানকে একটি চিঠিতে তাঁর প্রেমাস্পদ ও সিনেমার জাদুকর ইঙ্গমার বার্গম্যান লিখছেন, “উই মেক ইচ আদার অ্যালাইভ। ডাজ় ইট ম্যাটার ইফ ইট হার্টস?” এই যন্ত্রণা কিন্তু প্রতিশোধের কথা বলে না, যন্ত্রণার ভিতর পুড়তে-পুড়তে জেগে ওঠার কথা বলে। সংযুক্ত থাকার কথা বলে। এমনই এক যন্ত্রণা-প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়েছিলাম জয় গোস্বামীর বহু প্রসিদ্ধ কবিতা ‘প্রাক্তন’-এর শেষ দু’টি লাইনে। কবিতাটির কথক, এক জন নারী। প্রথম থেকেই কবিতাটি কতকগুলি প্রশ্ন তার বিগত প্রেমিকের জীবনের দিকে ছুড়ে দিতে চায়। যেমন, ঠিক সময়ে সে অফিসে যায় কি না, ঠিক মতো খায় কি না, কার সঙ্গে থাকে এখন ইত্যাদি। এই সব দৈনন্দিন প্রশ্ন পেরিয়ে, শেষে পৌঁছে কবিতাটি দু’বার প্রশ্ন করে, ‘কার গায়ে হাত তোলে এখন?’— আঘাত সম্পর্কিত এ প্রশ্নের ভিতরে বিগত প্রেম থেকে প্রাপ্ত অত্যাচারের প্রতি একান্ত অধিকারবোধ কি নেই? এবং তারই সঙ্গে জুড়ে আছে এক আশঙ্কা। ‘কার গায়ে হাত তোলে এখন?’ নতুন কেউ কি এখন সেই আঘাতের— আহত হওয়ার— অধিকারও পেয়ে গিয়েছে? ‘আহত হওয়ার অধিকার’! যে আঘাতের তীব্রতায় সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয় শেষ অবধি, বিচ্ছেদের পর সেই আঘাতও কি সম্পর্কের প্রাপ্তি হয়ে উঠতে পারে? সে যন্ত্রণাও হয়তো নিজের অতীত সত্তার অঙ্গ হয়ে ওঠে। কে জানে!
অবশ্য ভিন্ন এক আশঙ্কার কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন বসন্তকাল। ৫ এপ্রিল, ১৯১৪। পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথ বইতে প্রত্যক্ষদর্শী অমল হোম লিখছেন, “গভীর রাত্রি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, মনে হল যেন শান্তিনিকেতনের নীচের তলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদু মধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, গুরুদেব জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুনগুন করে গান গাইছেন।… আমি গুরুদেবের কাছে গেলাম, কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ করলেন না। আপন মনে যেমন গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। …তিনি গাইছিলেন, ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’।” গানটির রচনা-সময় সম্পর্কে পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার রবীন্দ্রগানের অন্তরালে গ্রন্থে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, নোবেল প্রাপ্তির পর বিদেশের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রশংসার পাশাপাশি কিছু বিরূপ সমালোচনা, পাবনা ভ্রমণের বিতর্ক এবং অসুস্থতা, রবীন্দ্রনাথকে বিষাদগ্রস্ত করেছিল। সেই বিষাদকে অতিক্রম করে যাওয়ার উপায়-অন্বেষণ, এই গান।
গানটি জানায়, যখন চতুর্দিকে বসন্তকাল, সে-সময় জ্যোৎস্নার রাতে সবাই বনের ভিতর চলে গেছে। ‘সবাই’ কথাটির মধ্যে কিন্তু কথক উপস্থিত নেই। সে যায়নি। পরের লাইনে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে—/ এই নিরালায় রব আপন কোণে/ যাব না এই মাতাল সমীরণে।” মাতাল কেন? কারণ বাইরে বসন্তকাল। গানটির পরবর্তী অংশের সঙ্কল্প, “আমার এ-ঘর বহু যতন ক’রে/ ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।” এই ঘর-ই কি আমাদের মনোজগৎ? খেয়াল করতে অনুরোধ করব, ঠিক এর পরেই গানটির সুর আকাশউন্মুখ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে”। এর পর সুর ফিরে এসে দাঁড়ায় এক আশঙ্কাবাক্যের ভিতর, “যদি আমায় পড়ে তাহার মনে/ বসন্তের এই মাতাল সমীরণে।” যার জন্য ঘর ধুয়ে রাখা, নিজেকে শুদ্ধ করে তোলা, সেই চিরন্তন জীবনদেবতা আর আমার মধ্যে রয়েছে বসন্তের মাতাল সমীরণ। সেই বসন্তের মধ্যে দিয়ে আসার সময় তিনি যদি চারিদিকের অনন্ত বসন্তে আমাকেই ভুলে যান? তখন আমার কী হবে?
এই আশঙ্কার নিরাময়ে রাখতে চাইব আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘মাস্টারক্লাস’-এ বলা কয়েকটি কথা, “ব্যক্তিমানুষ ফুরিয়ে যাবে, তাদের নিয়তিও শেষ হয়ে যাবে। …কিছু দিন আগে ইরানে এক লেখিকা আত্মহত্যা করেছেন। জঙ্গলের মধ্যে দড়ি থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর দেহ পাওয়া যায়— একটা ফোটোগ্রাফ থেকে আমরা সেটা দেখলাম। …যদি ছবিটার অন্য দিকে তাকাও, দেখবে বাকি পৃথিবী— পাখি, প্রকৃতি, সৌন্দর্য— তারা একই ভাবে বহমান। সব কিছু সহ্য করেও বয়ে চলেছে।”
এও কি প্রেমের এক রূপ নয়? সমস্ত চরাচরের মধ্যে সেই প্রেমের ধারণা ছড়িয়ে রয়েছে। সেখানে ভালবাসার অর্থ কেবল ‘আমি’-তেই সীমাবদ্ধ নেই, আমার চাওয়া-পাওয়া সেখানে সর্বোচ্চ নয়। সর্বোচ্চ কী? প্রেমে সংযুক্ত থাকার আনন্দ!
দূরে কোথাও কীর্তন হচ্ছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। হাঁটতে-হাঁটতে এসে দাঁড়িয়েছি গঙ্গার ধারে। আমি ও আমার বন্ধু। আমার বন্ধুটির নাম? বসন্তকাল!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)