E-Paper

মহিলার নগ্নতা লজ্জার কেন

ফ্লরিডাবাসী লেখিকা, ইলন মাস্কের প্রাক্তন বান্ধবী অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ার সমাজমাধ্যমে নিজের চোদ্দো বছরের ছবি দিয়েছিলেন।

প্রহেলী ধর চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৭

এ বছরের গোড়ায় চ্যাটবট ‘গ্রক’-কে দিয়ে দু’-একটি নির্দেশের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে কয়েক লক্ষ বিকৃত ছবি বানিয়েছিল অনেকে— বিনামূল্যে, কোনও উচ্চমার্গীয় প্রযুক্তিজ্ঞান ছাড়াই। ছবিগুলির থেকে কুড়ি হাজার বেছে সমীক্ষায় দেখা যায় যে, সমাজমাধ্যমে মহিলাদের শেয়ার করা ছবি তাঁদের সম্মতির পরোয়া না করেই ব্যবহার করা হয়েছে এই কাজে। এক জন বেশ ফলাও করে লিখল, কী ভাবে সে গ্রককে দিয়ে প্রায়-নিরাবরণ ছবি বানিয়েছে এক মহিলার। সেই বর্ণনার সঙ্গে মহিলার প্রকৃত ছবি, এবং গ্রক-নির্মিত ছবি— দুই-ই দিল, যাতে কারও মনে সংশয়ের অবকাশ না থাকে। বিকৃত যৌন রুচি ছাড়েনি নাবালিকাদেরও। সমীক্ষাটি দেখাচ্ছে বেশ কয়েকশো ছবি আঠারো বা তার কমবয়সিদের, গোটা ত্রিশেক নিতান্তই শিশুকন্যাদের।

ফ্লরিডাবাসী লেখিকা, ইলন মাস্কের প্রাক্তন বান্ধবী অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ার সমাজমাধ্যমে নিজের চোদ্দো বছরের ছবি দিয়েছিলেন। সেটিও কুরুচিকর সম্পাদনায় আন্তর্জালে ঘুরছে। ক্লেয়ার সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ উগরেছেন। মাস্কের সংস্থাটির বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন। এর পরই বিষয়টি জনসমক্ষে। সংবাদসংস্থা, টেলিভিশনে ক্লেয়ার-এর সাক্ষাৎকার, বক্তব্য প্রকাশিত। নইলে বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মহিলাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা আর কবে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে দাঁড়িয়েছি!

শতকের গোড়ায় যখন ইন্টারনেট, সমাজমাধ্যমের রমরমা শুরু হয়নি, স্থানীয় খবরের বৈশ্বিক খবরে রূপান্তরিত হতে বাকি, তখনই ডিজিটাল ছবি ‘মর্ফিং’-এর আমদানি। ঐশ্বর্য রাই থেকে সানিয়া মির্জ়া— খ্যাতিমান মহিলাদের মুখ এমন ভাবে অন্য মহিলাদের নগ্ন শরীরে জোড়া হয়েছিল যে, আসল-নকল বোঝার উপায় ছিল না। ঐশ্বর্য, সানিয়া লড়েছিলেন কি না মনে নেই; কিন্তু সব বয়সি মহিলাদের উপরে পারিবারিক তথা সামাজিক সতর্কবার্তা জারি হয়েছিল যে, ভুলেও কোথাও ছবি দিয়ো না। কারণ কখন কার ছবি বিকৃত হয়ে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়বে; সমাজে সেই মেয়ের বা পরিবারের মুখ দেখানোর জো থাকবে?

প্রতিস্পর্ধী না-হয়ে, অন্যায়ের সঙ্গে এ ভাবেই আজন্মকাল কায়দা করে ঘর করতে শেখানো হয়েছে, বিশেষত সাধারণ মেয়েদের। রাষ্ট্রপুঞ্জের বৈশ্বিক সমীক্ষা দেখাচ্ছে, ৩৮% মহিলা নিজে ডিজিটাল হয়রানির শিকার বলে স্বীকার করছেন; অথচ ৮৫% মহিলা জানিয়েছেন যে, অন্য মহিলাকে ডিজিটাল নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছেন। শতাংশের বিপুল প্রভেদে প্রমাণিত, আজও বিশ্ব জুড়েই মেয়েরা আপন নির্যাতনের কথা স্বীকারে অস্বস্তিতে ভোগেন। এই অস্বস্তি বা ভয়ের বাতাবরণই এমন ঘটনার ধারাবাহিকতাকে অক্ষুণ্ণ রাখে— রাষ্ট্রপুঞ্জের সাক্ষাৎকারে মনে করিয়েছেন নারীবাদী কর্মী ও লেখক লরা বেটস। বলেছেন, বিকৃত যৌন সুখ চরিতার্থের পাশাপাশি মহিলাদের ব্ল্যাকমেলিং, ভয় দেখাতে, হুমকি দিতেও ছবি বিকৃতি চলছে।

প্রবণতা নতুন নয়। যদি আরও পিছিয়ে যাই, দেখব পাসপোর্ট ছবি কিংবা চার-ছয় মাপের প্রিন্টেড ছবি থেকে কাটা মহিলাদের মুখকে আঠা দিয়ে জোড়া হচ্ছে আদিরসাত্মক পত্রিকা থেকে কাটা নিরাবরণ নারীশরীরে; বা ফোটোগ্রাফিরও আগের যুগে যদি যাই, দেখব সেখানে হাতে আঁকা কোনও মহিলার নিরাবরণ ছবি ছড়ানো হচ্ছে হেনস্থার উদ্দেশ্যে। আমাদের অন্তরে, সমাজের অন্দরে জেফ্রি এপস্টিনরা নানা রূপে বরাবরই লুকিয়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে আত্মপ্রকাশের ধরনটা পাল্টেছে।

কারণ একটাই— মহিলাদের শরীর নিয়ে ছুতমার্গ, লজ্জা; শুচিতা রক্ষার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি বহুলাংশে রাষ্ট্রীয় দায়। সভ্যতা, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে, মহিলাদের শরীর নিয়ে ভয় দেখানোর পদ্ধতিটি পাল্টালেও, ভয়ের উৎস ও তীব্রতাটি রয়ে গিয়েছে আদি, অকৃত্রিম ভাবেই। ফলে তা নারী নির্যাতনের অবিরাম হাতিয়ার। লরা বলছেন, এই কারণেই ডিপফেক বা বিকৃত ছবি, ভিডিয়ো, কণ্ঠস্বরের ৯০ শতাংশই মহিলাদের। অধিকাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারী অ্যাপ, ওয়েবসাইটে পুরুষশরীরকে পরিবর্তিত বা বিকৃত করার যথেষ্ট সুবিধাই নেই।

পুরুষশরীরের সঙ্গে যে হেতু লজ্জা, বা ‘মূল্যবোধ’ জড়িয়ে নেই, তাই তার বিকৃতিকরণে সংসারে কারও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয় না, তাই বিকৃতও করা হয় না। পুরুষশরীরকে ‘বীরের শরীর’ হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয়, তাই তা প্রদর্শনে আমরাও প্রথাগত শিক্ষা অনুযায়ী কেবল শৌর্য, বীর্য, পরাক্রমের ঝলকানিই দেখি; নির্লজ্জতা বা অশ্লীলতা নয়। পুরুষের নগ্নতাকে স্বাভাবিক তথা ‘ম্যানলি’ বলে নির্মাণ করেছি বলেই, ব্লকবাস্টার হিন্দি সিনেমার নায়ক যখন পূর্ণ নিরাবরণ বাগানে হাঁটেন, তখন তিনি ‘আলফা ম্যান’-এ উত্তরিত। অথচ সেই সিনেমারই যৌন দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য নিন্দিত হন নায়িকা।

যৌনতার এই লিঙ্গভিত্তিক নির্মাণ আমাদেরই গড়া। যুগে যুগে তাকে লালন করেছি, প্রশ্রয় দিয়েছি। তাই নগ্নতা; অপ্রাপ্তবয়স্ক মহিলা ও শিশুদের ছবি বিকৃত করায় তার বিরুদ্ধে আমরা যতই অভিযোগ, মামলা করি— আমাদের মনের মধ্যের একপেশে লিঙ্গভিত্তিক নির্মাণ ও ছুতমার্গ নির্মূল না-হওয়া অবধি মহিলাদের সঙ্গে ঘটে চলা যৌন নির্যাতন থেকে মুক্তি নেই। মুক্তি নেই, যত ক্ষণ না কমলা ভাসিন-এর উক্তিকে বিশ্বাস করছি যে— শরীর হননের মাধ্যমে তুমি আমার সম্মানহানি করতে পারো না…। কারণ আমার সম্মান শরীরে নয়, রেখেছি আমার আত্মায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Security Social Media

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy