×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ জুন ২০২১ ই-পেপার

সত্যজিৎ, মৃণাল, ও একটি ছবি

শিলাদিত্য সেন
১৪ মে ২০২১ ০৪:২৫

মনে পড়ে মা, ছেলেবেলায় তুমি একবার আমাকে সত্যজিৎ রায়ের অপরাজিত দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলে?... দেখতে দেখতে তুমি খুব কেঁদেছিলে। তোমার কান্না দেখে আমারও কান্না পেয়েছিল। বাড়ি ফিরে তুমি আমাকে বলেছিলে, বড় হয়ে তুইও একদিন চলে যাবি বাইরে। আর আমি? সর্বজয়ার মতো একা পড়ে থাকব।... সবই ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল কাল রাতে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে... কাল সন্ধেবেলায় শিকাগো ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ক্লাবে গিয়েছিলাম সেই অপরাজিত আবার দেখতে। দেখতে দেখতে আমি এবার খুব কেঁদেছিলাম। বারবার তোমার সেই পুরনো কথাগুলো মনে পড়ছিল।” মৃণাল সেন তাঁর ‘একটি ব্যক্তিগত চিঠি’ শিরোনামের এই অনতিদীর্ঘ রচনায় উল্লিখিত চিঠিটির টুকরো টুকরো কিছু অংশ আমাদের পড়িয়েছিলেন। চিঠিটি তাঁর স্ত্রী গীতা সেনকে লেখা পুত্র কুণালের, আশির দশকে, শিকাগো থেকে।

সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে, তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে এ-লেখায় প্রথমেই জানিয়েছিলেন মৃণালবাবু: “রকমারি বিশেষণে জর্জরিত কণ্টকিত অথবা সমৃদ্ধ কোনো প্রবন্ধ রচনা(য়)... আমার মন সায় দেয় না।” সে জন্যই বেছে নিয়েছিলেন অন্তরঙ্গ ঘরোয়া অনুষঙ্গ, একটি চিঠি, অথচ যা অসম্ভব প্রাসঙ্গিক।

অপরাজিত দেখে ফিরে তুমুল তর্ক ওঠে কুণাল আর তাঁর বন্ধুদের মধ্যে। অনেকেই সর্বজয়াকে ছেড়ে কথা বলতে ছাড়েন না। বলেন: এ অন্যায় সর্বজয়ার, ছেলের ভবিষ্যৎ নেই? ছেলেকে আঁচলে বেঁধে রাখবে? কুণাল মাকে চিঠিতে লেখেন: “আমি কিন্তু ওদের দলে নেই। খুব তর্ক করেছি ওদের সঙ্গে।”

Advertisement

মৃণালবাবু ওই তর্কের সূত্রে কেন অপরাজিত তাঁর কাছে সত্যজিতের ছবিগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়, তা ব্যাখ্যা করতে থাকেন। বিভূতিভূষণের উপন্যাস, ঘটনা বা চরিত্র আক্ষরিক অর্থে ‘সেকেলে’, বিশের দশকের; আর সত্যজিৎ পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে ছবি করতে এসে ‘সেকেলে’ সময়ের এতটুকু হেরফের ঘটতে দেননি। অথচ ছবি দেখতে দেখতে কী ঘটে যায়, শিকাগো শহরে বসে গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে কত স্বচ্ছন্দেই না ছবিটির সঙ্গে নিজেদের ভিড়িয়ে দেয়, যেন আয়নায় দেখতে পায় নিজেদের এবং সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে যে যেমন বোঝে এবং যে যেমন করে নিজের ভবিষ্যতের পথ খুঁজে নিতে চায় সেই ভাবে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। “সর্বজয়ার আচরণেও কারও আঁতে ঘা লাগে, অস্বস্তি বোধ করে, বিরক্ত হয়, কেউ-বা আবার সর্বজয়ার একাকিত্বে শিউরে ওঠে, মনে মনে ছুটে যায় সর্বজয়ার কাছে, সান্ত্বনা দেয়,” লিখেছিলেন মৃণাল সেন (সিনেমা, আধুনিকতা, প্রতিক্ষণ, ১৯৯২)।

দু’দশক পরে আত্মস্মৃতি লেখার সময় প্রায় গানের ধুয়োর মতো ফিরিয়ে আনেন তিনি ওই অপরাজিত প্রসঙ্গ: “বিশের দশকের কাহিনি... সত্যজিৎবাবু ছবি করেছিলেন পঞ্চাশের দশকে এসে, সেই ছবি দেখে নিজেদের মধ্যে তর্ক শুরু করল একদল তরুণ-তরুণী আশির দশকের মাঝামাঝি। কী আশ্চর্য! সমস্ত সময়ের সীমারেখা মুছে ফেলে অপরাজিত হয়ে উঠেছে সমকালীন ভাষ্য, সাম্প্রতিকের চিহ্ন।” (তৃতীয় ভুবন, আনন্দ, ২০১১)।

আসলে ঘটনায় বা চরিত্রের আচরণে হাল আমলের ছাপ থাকলেই কোনও ফিল্ম যে সমকালীন নাও হয়ে উঠতে পারে, এ বোধ থাকে না অধিকাংশেরই। আজকের ব্যবহারিক জীবনের উপাদান দিয়ে তৈরি, বা আজকের জীবনযাত্রার উপকরণে ঠাসা কাহিনির চিত্ররূপ হলেই সে ছবিকে ‘সমকালীন’ ঠাহরানোর মধ্যে বড় রকমের একটা ভুল থেকে যায়। শুধু দর্শক কেন, সিনেমায় হালফিল বাস্তবের স্থূল শারীরিকতা চিত্রিত করা বা তাকে ‘সমকালীন’ বলে দেগে দেওয়ার অস্বস্তিকর সরলীকৃত ধারণা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন না ভারতীয় পরিচালকদের বড় একটা অংশও। অতএব পুরনো বা নতুন বলে নয়, যে ছবির আখ্যান আমাদের আজকের কথা ভাবিয়ে তুলতে পারবে, ঘটনা বা চরিত্রের ভিতরে চলমান সময়-সমাজ-মনস্তত্ত্বের হাওয়া বইয়ে দিতে পারবে, সে-ছবিই হয়ে উঠবে সমকালীন। “সমকালীনতা নির্ণীত হবে ব্যবহার্য উপাদান থেকে নয়— কীভাবে সেই উপাদানকে ব্যবহার করা হচ্ছে, কী ঢঙ-এ তার বিশ্লেষণ হচ্ছে তার উপর,” বলেছিলেন মৃণাল সেন। আর এ-ও বলেছিলেন বিরক্ত হয়ে, “অপরাজিত-র মতো এক অসামান্য আধুনিক ছবি তৈরি করা সত্ত্বেও কোনো কোনো দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হয়ে থাকে সত্যজিৎ রায় নাকি সমকালীন জীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি।”

সত্যজিতের শতবর্ষে জীবিত থাকলে ফের হয়তো নতুন কোনও ভাবনার কথা বলতেন মৃণালবাবু অপরাজিত নিয়েই। দীর্ঘ তিন দশক তাঁর সঙ্গে মতবিনিময়কালে দেখেছি, কী ভাবে তিনি বুঁদ হয়ে থাকতেন সত্যজিতের অপরাজিত-তে। এক বার ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে তাঁকে অনুরোধও করা হয়েছিল ছবিটির উপর একটি বই লিখতে, প্রথমে সম্মত হলেও পরে লেখেননি সে বই।

মে মাসে তাঁরও জন্মদিন, আজ। বছর দুয়েক পরে শতবর্ষ পূর্ণ হবে তাঁরও। ১৯২৩-এ জন্মানোর সময় সত্যজিতের মতো তাঁরও মাথার উপর ছিল দেড়শো বছরের ঔপনিবেশিকতার ভার, যে ঔপনিবেশিকতা আমাদের স্বাধীন জীবনকে ভরিয়ে তুলেছে নানা অসঙ্গতি আর আত্মবৈপরীত্যে। ওই ‘একটি ব্যক্তিগত চিঠি’-তে অপু সম্পর্কে লিখেছিলেন: “বৃহত্তর জগতের টানে ধীরে ধীরে কেমন করে ঘরের টান আলগা হয়ে আসে। আলগা হয়ে আসে বলেই একদিন গড়ের মাঠে বসে কত সহজেই না শহরের বন্ধুকে বলতে পারে, মাকে ম্যানেজ করেছি, দু’টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।”

একদা ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রজা আমরা, আমাদের প্রগতি-র বাঁকে বাঁকে কত না আঁধার লুকিয়ে থাকে। জ্ঞানের আলো নিয়ে ‘এনলাইটেনমেন্ট’-এর যাত্রী হতে চেয়েছিল অপু, হতে চেয়েছিল বিশ্বায়িত আধুনিকতার অন্যতম পথিক, তার অগ্রগতির উল্টো পিঠে তাই মরণ ঘনিয়ে আসে মনসাপোতায় পড়ে-থাকা যক্ষ্মাক্রান্ত নিঃসঙ্গ সর্বজয়ার।

দিনকাল খুব একটা পাল্টেছে কি?

Advertisement