E-Paper

যেটুকু দেখছি, তা-ই কি সব

গত কয়েক বছরে, বিশেষত শেষ ছয়-আট মাসে বাইরের জগতের কাছে বদলে যাচ্ছে মুর্শিদাবাদের পরিচিতি।

অরিতা ধারা ভট্ট

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৬

নমকহারাম দেউড়ি। মিরজাফরের বাড়ি ছিল এখানেই।” গাইডের কথা শেষ না হতেই পটাপট ছবি তুলতে লাগলেন পর্যটকরা। এক জনের গলা ভেসে এল, “জায়গাটাই বিশ্বাসঘাতকদের হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই শুনি ট্রেনে-বাসে আগুন, রাস্তা অবরোধ। মালদহে, মুর্শিদাবাদে ঝামেলা লেগেই আছে। ঘুরতে আসব ভেবেও ভয় পাচ্ছিলাম।” বুকে বড় লাগল কথাটা। মুর্শিদাবাদ মানেই কি বাইরের জগতের কাছে বিশ্বাসঘাতক! সিনেমা, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, রাজনীতি— মুর্শিদাবাদের অবদান কম নয়। সব ভুলে শুধু এটাই মনে রাখা হচ্ছে!

যুবকটির বাড়ি মুর্শিদাবাদ, এখন থাকেন বেঙ্গালুরুতে। সহকর্মীদের মধ্যে আলোচনায় ভিটেমাটির প্রসঙ্গ উঠলেই এড়িয়ে যান। “তোদের ওখানে তো শুধু গোলমাল। বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকে নাকি? সারা দেশ এক দিকে, তোদের গতি অন্য দিকে,” গোছের নানা মন্তব্য শুনতে হয় তাঁকে।

গত কয়েক বছরে, বিশেষত শেষ ছয়-আট মাসে বাইরের জগতের কাছে বদলে যাচ্ছে মুর্শিদাবাদের পরিচিতি। গত বছর এপ্রিলের গোড়ায় ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরোধিতায় ধুলিয়ান, শমসেরগঞ্জের মতো জায়গায় অশান্তি, আগুন জ্বালানোর মতো ঘটনা ঘটে। হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা ও পরবর্তী কর্মসূচিতে মুর্শিদাবাদের নাম উঠে আসে। একাধিক জায়গায় ট্রেন পোড়ানো, জাতীয় সড়ক অবরোধ হয়। এ বছর বেলডাঙায় বড়সড় অশান্তি হয়। এখন ভোটের আবহেও কমিশনের বিশেষ নজরে মুর্শিদাবাদ।

পলাশির যুদ্ধে নবাবকে সঙ্গ দেননি তাঁর বিশ্বস্ত মিরজাফর। সিরাজ কেমন ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা কেমন ছিল, কাছের লোকদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতেন, কার পক্ষে কোন বিদেশি শক্তি ছিল, এ সবে না ঢুকেই মিরজাফরকে বিশ্বাসঘাতক তকমা দিয়েছে ইতিহাস। সেই তকমার ভার এখনও বহন করছে তাঁর পরিবার। বাইরের জগতের কাছে তাঁরা ‘বিশ্বাসঘাতকের বংশ’। এখন গোটা জেলাই সেই তকমার শরিক। নেতাদের দলবদল, অন্য সম্প্রদায় সম্পর্কে তাঁদের উস্কানি বদলে দিচ্ছে জেলার মানুষের সমীকরণ। এত বছরের সহাবস্থান সত্ত্বেও পরস্পরের দিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন তাঁরা, হারাচ্ছে ভরসা, বিশ্বাস।

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, বিকাশ সিংহ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, নবারুণ ভট্টাচার্য, কীর্তন-গায়িকা রাধারানি দেবী— বহু বিশিষ্টজনের নাম জড়িয়ে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে। বর্তমান সময়েও অনেক শিল্পী দেশকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গিয়েছেন। ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান থেকে অভিনেতা আমির খান, সুরকার সেলিম আসতে পারেন মুর্শিদাবাদে। কিন্তু আশপাশের জেলার লোক আসতে ভয় পান। দৈনন্দিন কোনও অশান্তি, ধর্মভেদ এখনও নেই মুর্শিদাবাদে। কিন্তু তার পরেও কিছু মানুষের উগ্র মানসিকতা দরজা খুলে দিচ্ছে বিপরীতমনস্ক মানুষের সম-উগ্র ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠারও।

মালদহের কালিয়াচকে এসআইআর-এর কাজে যুক্ত বিচার-আধিকারিকদের আটকে রাখা নিয়ে যে গোলমাল হল, তাতে মুর্শিদাবাদের যোগসূত্র কিছু আছে কি না, প্রমাণিত নয়। কিন্তু মালদহ, মুর্শিদাবাদকে এক বন্ধনীতে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা খুব চেনা। মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের শুনতে হয়েছে, প্রশাসন, নির্বাচন এমনকি বিচারব্যবস্থায় ‘হস্তক্ষেপ’-এর সাহস দেখিয়েছেন তাঁদের লোকেরা। কিন্তু কে কার লোক? যিনি ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে খাটছেন তিনিই বা কার, যারা অশান্তি পাকাচ্ছে তারাই বা কার? বিভেদের জাল বুনে দেওয়া হচ্ছে ক্রমাগত। তৈরি করা হচ্ছে নেতিবাচক আখ্যান। তার প্রভাব পড়ছে পর্যটনেও।

চেম্বার অব কমার্সের মুর্শিদাবাদ ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ়-এর সাধারণ সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, “মুর্শিদাবাদ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বরাবর। মিলেমিশে বাসও বরাবরের। কিন্তু এখনকার মতো পরিস্থিতি ছিল না। প্রতি বছর যদি অশান্তি হয়, তা হলে পর্যটকরা আসবেন কেন?” তাঁর দাবি, “আগে হিন্দু পর্যটকেরাই বেশি আসতেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ৮০ শতাংশ মুসলিম পর্যটক আসেন এখন। বদলটা এখন চোখে পড়ে। হয়তো অনেকে ভরসা রাখতে পারছেন না।” সম্প্রতি বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠা নিয়ে যা হচ্ছে, সেটাও ধর্ম-নির্বিশেষে মানুষ ভাল ভাবে নিচ্ছেন না বলে দাবি অনেকের।

গত বছরের হাজারদুয়ারিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ পর্যটক এসেছেন (ছবি)। ইদের পরদিন শুধু হাজারদুয়ারিতেই লোক এসেছেন কুড়ি হাজারের বেশি। কিন্তু সকলেই কিছু নির্দিষ্ট জায়গা ছুঁয়ে ফিরে যান, রাত্রিবাস করেন না। মুর্শিদাবাদের একটা বৃহত্তর অংশ পর্যটকদের কাছে অচেনাই। বালুচরে (জিয়াগঞ্জ) জন্ম যে বালুচরী শাড়ির, তার নামে এখন বিষ্ণুপুরকে চেনেন মানুষ, ব্রাত্য মুর্শিদাবাদ। নবাবি স্থাপত্য, টেরাকোটার মন্দির থেকে রেশম, কাঁসা শিল্প রয়েছে। কিন্তু যতখানি তুলে ধরা দরকার, ততটা হচ্ছে না— দাবি মুর্শিদাবাদবাসীর। গ্রামীণ পর্যটনে দু’বার কেন্দ্রীয় সরকারের পুরস্কার পেয়েছে মুর্শিদাবাদের বরানগরের কিরীটেশ্বরী মন্দির। সেটাই বা তুলে ধরা হচ্ছে কোথায়? মুর্শিদাবাদকে কী ভাবে দেখতে চান মানুষ, কোন তকমা দিতে চান, সেটা ভাবতে হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Murshidabad

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy