E-Paper

আরও বিপর্যয়ের দিকে

ইরানের জনতার একাংশ উচ্ছ্বাস দেখালেও তা সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়নি। বরং তেহরান, মাশহাদ-সহ বিভিন্ন শহরে ইজ়রায়েল ও আমেরিকা-বিরোধী বড় বড় মিছিল হয়েছে। সেখানে খামেনেইকে ‘শহিদ’-এর সম্মান জানানো হয়েছে।

পলাশ পাল

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৭:১৭

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পরিকল্পনা ছিল— ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলেই তেহরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। জনগণ নেতৃত্বহীন অবস্থার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাবে।

বাস্তবে তেমন কিছু ঘটেনি। ইরানের জনতার একাংশ উচ্ছ্বাস দেখালেও তা সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়নি। বরং তেহরান, মাশহাদ-সহ বিভিন্ন শহরে ইজ়রায়েল ও আমেরিকা-বিরোধী বড় বড় মিছিল হয়েছে। সেখানে খামেনেইকে ‘শহিদ’-এর সম্মান জানানো হয়েছে। এমনকি খামেনেই শাসনের বিরোধীদের একাংশও আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়— বহিরাগত আক্রমণ প্রায়শই একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে সাময়িক ভাবে স্তব্ধ করে দেয় এবং শাসকগোষ্ঠীকে শক্তিশালী করে তোলে।

এই পরিস্থিতিতে তেহরানও পাল্টা আঘাতের পথ বেছে নেয়। লক্ষণীয়, তেহরান এই যুদ্ধে এখন প্রায় সমগ্র পশ্চিম এশিয়াকেই জড়িয়ে নিয়েছে। ইজ়রায়েলের পাশাপাশি আরব আমিরশাহি, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত-এর মতো দেশগুলিকে নিশানা বানিয়েছে। এই অঞ্চল জুড়ে আমেরিকার অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ইরান কেবল সামরিক ঘাঁটিই নয়, বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, বন্দর, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও নিশানা বানিয়েছে। সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর বাড়ার সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যেই একাধিক হামলার কারণে সৌদি আরবে বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক সংস্থা ‘সৌদি আরামকো’ তাদের উৎপাদন সাময়িক ভাবে কমাতে বাধ্য হয়েছে।

যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে হয়তো পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ডিস্যালিনেশন প্লান্টগুলিও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এই প্লান্টগুলির মাধ্যমে সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করে পানীয় জল তৈরি করা হয়, যার উপর উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু শহর নির্ভরশীল। কোনও বড় ডিস্যালিনেশন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েক মিলিয়ন মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গেও যুক্ত এই প্লান্টগুলি। ফলে এগুলো ধ্বংস হলে একযোগে জলের ঘাটতি, বিদ্যুৎ সঙ্কট এবং শিল্প উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এরই মধ্যে ইরানে একটি জল প্রকল্পের উপর আঘাত হানার অভিযোগ উঠেছে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে। একই অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধেও— বাহরাইনের জল প্রকল্পে আঘাত হানার জন্য।

বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যায়। তেহরান এই পথ অবরুদ্ধ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যেই জ্বালানি সঙ্কট— তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। এর প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে মূল্যবৃদ্ধি মাথাচাড়া দেবে। ভারত, চিন, ইউরোপের মতো আমদানিকারকদের উপর এর প্রভাব সরাসরি পড়বে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অনেক দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর নয়। বিশেষত কাতার কুয়েত বাহরাইন আরব আমিরশাহির মতো দেশ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্য আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ় প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এদের খাদ্য সরবরাহে দ্রুত ঘাটতি দেখা দেবে। সঙ্কটে পড়বে অসংখ্য মানুষ। ইরান এই অবরোধ চালিয়ে যেতে কতটা মরিয়া,একাধিক তেলবাহী জাহাজের উপর হামলার ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।

এ ছাড়াও হরমুজ় প্রণালীর তলদেশে জালের মতো বিছানো রয়েছে সাবমেরিন ‘ফাইবার অপটিক কেবল’। পৃথিবী জুড়ে ইন্টারনেট সংযোগে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের ফলে এগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আর্থিক লেনদেন ও ডিজিটাল পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়বে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও আরব আমিরশাহিতে গড়ে উঠেছে বড় বড় ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড রিজিয়ন, যেখানে আমেরিকার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। ইরানের ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দু’টি এবং বাহরাইনের একটি ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক অর্থনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাতেও পড়বে।

ইরানের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি— লেবাননে হিজ়বুল্লা, ইয়েমেনে হুথি এবং গাজ়ায় হামাস-এর সম্পর্ক অনেক দিনের। তেহরান অস্ত্র, অর্থ ও কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে তাদের সমর্থন করে। ইরানের পাল্টা আঘাতের পর পরই হিজ়বুল্লা ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালায় এবং তার জবাবে তেল আভিভও লেবাননে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে প্রায় দু’পক্ষের শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ঘরবাড়ি হারিয়েছেন কয়েক হাজার। সংঘর্ষের ক্ষেত্র যত বিস্তৃত হবে, ধ্বংসের মাত্রাও তত বাড়বে।

বেপরোয়া ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের শাসন পরিবর্তন ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হবেন না বলেই ধারণা। সে ক্ষেত্রে দু’টি পথ খোলা রয়েছে— সরাসরি স্থল অভিযান বা ইরানের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করা। কিন্তু দু’টি পথই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরান ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান, সামরিক শক্তি এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে কঠিন প্রতিপক্ষ। স্থল অভিযান শুরু হলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও ব্যাপক হতাহতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে রাশিয়া ও চিনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। উপরন্তু আমেরিকান জনমতের একটি বড় অংশই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। বাকি থাকে তেহরানকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অস্ত্র— ইরানের ভিতরে ও বাইরে কুর্দি-সহ বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর ক্ষোভকে কাজে লাগানো। ট্রাম্প এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদিও তাতে নতুন করে শরণার্থী সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

আধুনিক যুদ্ধে সামরিক সাফল্যের হিসাব দিয়ে জয় বা পরাজয় নির্ধারিত হয় না। যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হল— মানবিক বিপর্যয়। ইতিমধ্যেই ইরানে মৃত্যু হাজারের কাছাকাছি, যার মধ্যে দেড় শতাধিক শিশু। আরও কয়েক হাজার মানুষ গৃহহীন। তাই এই সংঘাতের দ্রুত অবসান এখনই কাম্য।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US-Israel vs Iran US-Iran Conflict US-Iran Relation Iran-Israel Situation Donald Trump

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy