বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক সম্প্রতি কারাবাস থেকে মুক্তি পেয়েছেন। লাদাখে আন্দোলন চালানোর অপরাধে কারাদণ্ডিত সোনম ভারতের মূল ভূখণ্ডে এখনও স্বল্প আলোচিত চরিত্র। কিন্তু লাদাখ ও লাদাখ-ব্যক্তিত্ব সোনমেরএই কাহিনির গুরুত্ব কত গভীর ও ব্যাপক, তা বোঝা খুব জরুরি।
ভারতের উত্তরতম প্রান্তে অবস্থিত লাদাখ বর্তমানে কেবল এক কৌশলগত ভূখণ্ড নয়, বরং এক গভীর সাংবিধানিক ও পরিবেশগত আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকে লাদাখের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল, যার উত্তর দিকে চিনের জিনজিয়াং প্রদেশ, পূর্বে তিব্বত, পশ্চিমে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত গিলগিট অঞ্চল, এবং দক্ষিণে ভারতের হিমাচল প্রদেশ। ২৫৫০ থেকে ৭৭৪০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই অঞ্চলটি মধ্য এশিয়ার কারাকোরাম এবং হিমালয় পর্বতশ্রেণির মাঝখানে এক প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে। ২০১৯-এর ৫ অগস্ট ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে এবং রাজ্যটিকে দু’টি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে— জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। লাদাখকে একটি ‘বিধানসভা বিহীন’ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনে। এই পরিবর্তনের ফলে লাদাখবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি— জম্মু ও কাশ্মীরের আধিপত্য থেকে মুক্তি— পূরণ হলেও, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাবে দ্রুত অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে।
লাদাখের গুরুত্ব আরও বেশি, কেননা এ হল এমন একটি অঞ্চল যা সরাসরি দু’টি শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমানা ভাগ করে। মূলত দু’টি প্রশাসনিক জেলায় বিভক্ত এই অঞ্চল: লে এবং কারগিল। লে জেলা মূলত বৌদ্ধধর্মাবলম্বীপ্রধান অঞ্চল, যেখানে তিব্বতি ও অন্যান্য মঙ্গোলীয় জনজাতির বাস। অন্য দিকে, কারগিল জেলা মূলত শিয়া মুসলিমপ্রধান অঞ্চল। এই বৈচিত্রময় জনজাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশই ভারতের তফসিলি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃত। এটাই লাদাখের ষষ্ঠ তফসিলের দাবির প্রধান ভিত্তি। ২০১৯-এর পরিবর্তনের পর লাদাখের শাসনভার সরাসরি কেন্দ্রের নিযুক্ত লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে চলে যায়, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুতির বোধ তৈরি করে। তাঁরা মনে করেন যে তাঁদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র এখন বহিরাগতদের আক্রমণ এবং অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের মুখে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
২০১৯-এর ৫ অগস্ট ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল লাদাখের জন্য এক দ্বিমুখী অভিজ্ঞতা। এক দিকে লে অঞ্চলের মানুষ বহু দশক ধরে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রশাসনিক অবহেলা থেকে মুক্তির জন্য পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। অন্য দিকে, কারগিল অঞ্চলের মানুষেরা এই সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁদের মতে, তাঁদের স্বায়ত্তশাসনকে এই পদক্ষেপ দুর্বল করে দিতে চলেছে।
লে এবং কারগিল উভয় অঞ্চলের মানুষই লক্ষ করেন, ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পর তাঁদের জমির উপর থাকা নিরঙ্কুশ অধিকার ও কর্মসংস্থানের সুরক্ষা লোপ পেয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ থাকাকালীন লাদাখের দু’টি স্বশাসিত পরিষদ— ‘লাদাখ অটোনোমাস হিল ডেভলপমেন্ট কাউন্সিল’ (এলএএইচডিসি-লে) এবং ‘কারগিল অটোনোমাস হিল ডেভলপমেন্ট কাউন্সিল’ (এলএএইচডিসি-কারগিল)— কার্যকর ছিল। যদিও এই পরিষদগুলো এখনও বিদ্যমান, কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের কাঠামোয় লেফটেন্যান্ট গভর্নরের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কাছে পরিষদগুলো কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে। এই ক্ষমতার অভাববোধ থেকেই ‘লে অ্যাপেক্স বডি’ (এলএবি) এবং ‘কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ (কেডিএ) নামক দু’টি সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামে। তাদের প্রধান দাবি: ১) লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা প্রদান, ২) সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে লাদাখকে অন্তর্ভুক্ত করা, ৩) লাদাখের জন্য পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, ৪) লোকসভায় লাদাখের জন্য দু’টি আসন বরাদ্দ করা।
লক্ষণীয়, ভারতের সংবিধানের ২৪৪(২) ও ২৭৫(১) অনুচ্ছেদের অধীনে ষষ্ঠ তফসিলের বিধান রয়েছে। মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর (অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজ়োরাম) জনজাতিভুক্তদের স্বশাসন নিশ্চিত করার জন্য এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় ‘স্বশাসিত জেলা পরিষদ’ (অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলস বা এডিসি) গঠিত হয়, যা স্থানীয় জনজাতিভুক্তদের জমি, বন ব্যবস্থাপনা, কৃষি, বিবাহ, উত্তরাধিকার ও সামাজিক রীতিনীতি সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়।
লাদাখ এই ষষ্ঠ তফসিল চায় এক সুরক্ষাকবচ হিসাবে, কেননা এখানে বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত ভঙ্গুর। অনিয়ন্ত্রিত খনি খনন, বাঁধ নির্মাণ বা বৃহৎ পর্যটন প্রকল্প শুরু হলে হিমবাহগুলি দ্রুত গলে গিয়ে জলসঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে গঠিত স্বশাসিত পরিষদগুলো এই ধরনের ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরাসরি আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পাবে, যা বর্তমানে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশাসনের অধীনে সম্ভব নয়।
সোনম ওয়াংচুক এক জন বিশ্বখ্যাত উদ্ভাবক ও পরিবেশবিদ। লাদাখের অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে তিনি আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপি যখন তাদের প্রতিশ্রুতি (ষষ্ঠ তফসিল প্রদানের আশ্বাস) রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন ওয়াংচুক একুশ দিনের আমরণ অনশন শুরু করেন। এই প্রশ্ন তোলেন— ভারত সরকার কেন লাদাখের মতো একটি সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করছে। কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর এই আন্দোলনকে জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী হিসেবে দেখতে শুরু করে। ওয়াংচুক নাকি লাদাখের তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে চালিত করছেন, নেপাল বা বাংলাদেশের মতো অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।
শেষে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে লাদাখের আন্দোলন এক নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী মোড় নেয়। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ওয়াংচুক পুনরায় ৩৫ দিনের জন্য অনশন শুরু করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর লে শহরে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালীন পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষে চার জন যুবক নিহত হন এবং প্রায় ৯০ জন আহত হন। এই ঘটনাটি লাদাখের শান্ত ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সোনম ওয়াংচুককে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর অধীনে গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে লাদাখ থেকে সরিয়ে রাজস্থানের জোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
আদালতে দীর্ঘ শুনানি চলাকালীন নরেন্দ্র মোদী সরকার ওয়াংচুককে এক জন ‘বিপজ্জনক আন্দোলনকারী’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন, ওয়াংচুক লাদাখের যুবকদের ‘আরব বসন্ত’সদৃশ বিদ্রোহের জন্য উস্কানি দিচ্ছেন। এমনকি তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির দাবিকেও সরকারের তরফে ‘সিন্থেটিক’ বা কৃত্রিম বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য সরকারের এই কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করেছিল। বিচারপতিরা প্রশ্ন তোলেন, এক জন পরিবেশবিদ কী ভাবে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এতটা বড় হুমকি হতে পারেন যে তাঁকে বিচারহীন ভাবে আটকে রাখা হবে। চাপের মুখে এবং লাদাখ-সহ সারা দেশের তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।
লাদাখের ষষ্ঠ তফসিলের দাবির বিপরীতে কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব দিলেও লে অ্যাপেক্স বডি এবং কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স এই প্রস্তাবগুলি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, কেন্দ্রের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়ার বদলে, সরাসরি জনগণের ক্ষমতায়ন চাই, যা একমাত্র ষষ্ঠ তফসিলে সম্ভব। তাঁরা এও মনে করেন যে, ৩৭০ ধারা বাতিলের ফলে যে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল ষষ্ঠ তফসিলই পূরণ করতে পারে। লাদাখের এই দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন ভারতীয় গণতন্ত্রের এক জটিল সন্ধিক্ষণকে তুলে ধরে। এক দিকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্তে অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা, অন্য দিকে স্থানীয় জনজাতিভুক্তদের অধিকার এবং পরিবেশগত সুরক্ষা। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন— লাদাখের মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমান সরকার লাদাখকে কেবল একটি ভূখণ্ড হিসেবেই দেখে এবং সেখানকার মানুষের আবেগ ও সাংবিধানিক দাবিকে অবজ্ঞা করে। এই কারণেই এই সীমান্ত অঞ্চলে অস্থিরতা এত বেড়েছে। স্পষ্টতই ষষ্ঠ তফসিলের দাবি লাদাখের মানুষের কাছে এখন কেবল শুধু আইনগত দাবি নয়, বরং তাঁদের অস্তিত্বের পরিচয়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। তাঁরা চান, নিজেদের ভূমির উপর নিজেদের অধিকার, এবং সংবিধানে তার স্থায়ী স্বীকৃতি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)