E-Paper

শতবর্ষ পেরিয়ে আগুয়ান

শতাব্দীপ্রাচীন কলেজ ভবন ও সংলগ্ন এলাকাটি বর্তমানে গ্রেড-১ হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত। স্বভাবতই এখানে নতুন ভবন নির্মাণ অ-বৈধ ও অসম্ভব। অন্য সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বা বেসরকারি বহু কলেজের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস আছে, মৌলানা আজাদ কলেজের আজও কোনও জমি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য নেই।

শান্তনু ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৫

১৯২৪-এর ৯ ডিসেম্বর, বাংলার তৎকালীন বড়লাট লর্ড লিটনের হাতে বহুপ্রতীক্ষিত ‘ইসলামিয়া কলেজ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। শুরু হয় এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক যাত্রা, আজ যা মৌলানা আজাদ কলেজ নামে শতবর্ষ পেরিয়ে অগ্রগমনের পথে। আনুষ্ঠানিক ভাবে পঠনপাঠন শুরু হয় ১৯২৬-এর ২ জুলাই। সে বছর ১৩ মে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেলে আইএ, আইএসসি ও বিএ পাঠক্রম চালুর অনুমোদন। অবিভক্ত বাংলার মুসলমান সমাজের দীর্ঘলালিত এক স্বপ্নপূরণ হয়।

১৯৪৮-এ নাম হল সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ, ১৯৬০-এ স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের নামে মৌলানা আজাদ কলেজ। ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে, ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফারসি ছিল সরকারি ভাষা। ১৭৮১-তে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদ্রাসা স্থাপন করেন। ঔপনিবেশিক শাসকের আনুকূল্যে সেটাই ছিল প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন; লক্ষ্য: ইসলামি সংস্কৃতি এবং ফারসি ও আরবি ভাষা চর্চা। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মুসলমান সমাজের একাংশ পাশ্চাত্যশিক্ষা প্রসারের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। স্যর সৈয়দ আহমেদ ১৮৭৫-এ আলিগড় অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজের পত্তন করেন, পরে যা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৮০-র দশকের গোড়া থেকেই কলকাতায় আলিগড়ের পদাঙ্ক অনুসরণে একটি ‘মহমেডান আর্টস কলেজ’-এর দাবি উঠতে শুরু করে। ১৯১৩ থেকে কলকাতায় এই কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ সরকারি স্তরে দানা বাঁধতে শুরু করে। পরের বছর জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সংশোধিত গেজ়েট বিজ্ঞপ্তি জারি হয়, যদিও সরকারি তরফে জমি ক্রয়ে আরও প্রায় দু’বছর কেটে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্গঠন বিলের প্রস্তুতির জন্য ইসলামিয়া কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে বাংলার মুসলিম সমাজকে ১৯২৪ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

বড়লাট লিটন দ্বিতীয় বার ইসলামিয়া কলেজে আসেন ১৯২৬-এর ২৮ ডিসেম্বর, কলেজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে। এই তারিখটিকেও তাই শতবর্ষের সূচনাবিন্দু ধরা যায়। আলিগড়ে অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন লিটনের পিতা রবার্ট লিটন, ভারতের তৎকালীন ভাইসরয়। পিতা ও পুত্রের হাতে দুই ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সূচনা এক অদ্ভুত সমাপতন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রতিকূলতা ছিল। সরকারি কলেজ রূপে কলেজের আত্মপ্রকাশ, যদিও সরকারের আশা ও উদ্দেশ্য ছিল, কালে এই প্রতিষ্ঠান মুসলমানদের দ্বারা স্বাধীন ভাবে পরিচালিত হবে; পরিচালন সমিতি বা অছি পর্ষদ থাকবে, যাবতীয় খরচ কলেজই সংগ্রহ করবে। শুধু মুসলমান ছাত্রদের পড়াশোনার কথা বলা হয়েছিল বলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেনেটের একাধিক সদস্য অনুমোদন বিষয়ক সভায় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তির তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মের ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তি করা যায় না; তা ছাড়া পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের মধ্যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও প্রগতির সূচনাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের মিলনে সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধি সহজতর হবে। অনেক বাধা কাটিয়ে কলেজ যে শেষ পর্যন্ত দিনের আলো দেখে তার জন্য আবুল কাসেম ফজলুল হকের ভূমিকা যারপরনাই, অনেকেই তাই এই মানুষটিকে কলেজের রূপকার হিসাবে মানেন।

কেবল কৃতী ও সফল পড়ুয়াদের সংখ্যার বিচারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বিচার করা চলে না। কলেজে পড়তে আসা এখনকার ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখান থেকে পড়ে কর্মজীবনে যায়, পরপ্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়াতে সক্ষম হয়— এর সামাজিক গুরুত্ব অসীম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রেও এই কলেজ এক উজ্জ্বল উদাহরণ: অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত তাঁর আট দশক বইয়ে লিখেছেন, ১৯৪৬-এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দিনগুলোয় এই কলেজের মুসলমান ছাত্ররা কী ভাবে তাদের হিন্দু শিক্ষকদের নিরাপদে কলেজে পৌঁছে দিত।

শতাব্দীপ্রাচীন কলেজ ভবন ও সংলগ্ন এলাকাটি বর্তমানে গ্রেড-১ হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত। স্বভাবতই এখানে নতুন ভবন নির্মাণ অ-বৈধ ও অসম্ভব। অন্য সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বা বেসরকারি বহু কলেজের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস আছে, মৌলানা আজাদ কলেজের আজও কোনও জমি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য নেই। নেই কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিজস্ব খেলার মাঠ। দীর্ঘদিন কোনও ছাত্রীনিবাস ছিল না, সম্প্রতি তা চালু হলেও চাহিদার তুলনায় স্থান সঙ্কুলান যথেষ্ট নয়। বেকার হস্টেলে হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের থাকার সুযোগ নেই। অথচ এই কলেজে দূরের নানা জেলা, বিহার ঝাড়খণ্ড অসমের মতো পড়শি রাজ্য, এমনকি বাংলাদেশ থেকেও পড়ুয়ারা পড়তে আসে। ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছিলেন একে ঘিরে দ্বিতীয় আলিগড় তৈরির; মৌলানা আজাদ কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রসমাজ, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের আশা— শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সমারোহের অঙ্গ হয়ে উঠুক সরকারের তরফে কলেজ/ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের আনন্দময় বার্তা।

অর্থনীতি বিভাগ, মৌলানা আজাদ কলেজ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

educational institution heritage Students

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy