ছোটবেলার পাড়ায় একটা বাড়ি ছিল। যত দূর মনে পড়ে, কোনও দিন বাড়ি মেরামত করতে দেখিনি। তবে কয়েক বছর অন্তর বেশ খরচপাতি করে দেওয়ালে বাহারি রং হত, পুরনো গ্রিল বদলে নতুন নকশা কাটা গ্রিল বসত, অন্দরসজ্জাও বদলানো হত। সেই আমলেও বাড়িতে এসি মেশিন বসানো হয়েছিল। কিন্তু বাড়ির স্বাস্থ্যে নজর না-দেওয়ায় কালক্রমে দেওয়াল ভাঙতে থাকে, নোনা ধরে যায়। তখন হাজার মেরামত করেও বাড়ি বাঁচানো যায়নি।
সর্বশেষ কেন্দ্রীয় বাজেটে পরিবেশ সংক্রান্ত বরাদ্দ দেখতে দেখতে সে কথাই মনে হচ্ছিল। এক ঝলক দেখলে মনে হবে, আগের বাজেটের থেকে বরাদ্দ বেড়েছে। সরল অঙ্কে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু সার্বিক ভাবে পরিবেশের উন্নতিতে বাজেট বরাদ্দ হয়েছে কি? এ কথা ইতিমধ্যেই বহুচর্চিত যে, দেশের বায়ুদূষণ নিয়ে, বিশেষত শীতে দিল্লির যা অবস্থা হয়েছিল, সে ব্যাপারে বাজেটে অর্থমন্ত্রী কোনও কথা বলেননি। পরিবেশের বাজেটেও আলাদা করে সে প্রসঙ্গ চোখে পড়েনি। কেন এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতেই পারে। তবে আপাতত বোঝা প্রয়োজন, বাজেটে সামগ্রিক ভাবে পরিবেশের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা গুরুত্ব পেয়েছে।
শুরুতেই বলা প্রয়োজন— সার্বিক ভাবে পরিবেশের বাজেট বলতে শুধু বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের বাজেট দেখা যথেষ্ট নয়। সার্বিক পরিবেশের মধ্যে নাগরিক, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, গাছপালা, পাহাড়, নদী ইত্যাদির সঙ্গে নাগরিকের দৈনিক আন্তঃক্রিয়াই পরিবেশ রক্ষার দিকটিকে নির্দেশ করে। এই কারণেই বাজেটে পরিবেশকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করতে গেলে নাগরিক, বিশেষত পরিবেশগত দিক থেকে সংবেদনশীল এলাকার নাগরিকদের বাজেটে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, বোঝা জরুরি।
এ বারের বাজেটে ‘চমকপ্রদ’ বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম ট্রেকিং এবং অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এই পর্যটনের পরিকাঠামো তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের কথা জানানো হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, নিঃসন্দেহে। কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাবও বলছে, গত কয়েক বছর ধরে জিডিপি-র প্রায় ৫ শতাংশ পর্যটন থেকে আসছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনার কথাও নাকচ করে দেওয়া যায় না। এই পরিস্থিতিতে পর্যটন শিল্পের হাত ধরে আর্থিক উন্নতির ভাবনা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু বিচক্ষণ ভাবনা বলা যায় কি? বিশেষত, উত্তরাখণ্ড, হিমাচলের মতো হিমালয়ের পার্বত্য এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের খেসারত ইতিমধ্যেই দিতে হয়েছে। বিরূপ প্রকৃতির সামনে প্রাণহানি এবং সম্পত্তিহানি হয়েছে। ২০১৩ সালে কেদারনাথ বিপর্যয়ের পরেই নদীর খাত দখল করে হোটেল, রিসর্ট নির্মাণের বিষয়টি সামনে এসেছিল। তার পরেও ছবি কত দূর বদলেছে, প্রশ্ন ওঠে। মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, ট্রেকিংয়ের রাস্তাগুলি সিংহভাগই পরিবেশগত দিক থেকে সংবেদনশীল এলাকার মধ্যে। সেখানে পর্যটন পরিকাঠামো তৈরি হলে পর্যটক বাড়বে। তাতে কিন্তু প্রকৃতির উপরে চাপ বাড়বে বই কমবে না। সেই চাপ যদি বাড়ে, তা হলে সেই পর্যটন কোনও ভাবেই পরিবেশবান্ধব থাকে না। মুখে বা হোর্ডিংয়ে যতই ‘ইকো-টুরিজ়ম’ বলা হোক না কেন, বাস্তবে এ দেশের সিংহভাগ পর্যটনস্থলের পরিবেশের কী অবস্থা, তা বুঝতে পরিবেশবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
অনেকেই বলতে পারেন, পর্যটন পরিকাঠামো তৈরি হলে তা স্থানীয় মানুষের জীবিকাকে প্রভাবিত করবে, আয় বৃদ্ধি করবে। আপাতভাবে এই যুক্তি ঠিক। তবে এই উন্নয়ন স্বল্পস্থায়ী, কারণ প্রকৃতির ক্ষতি হলে তা ঘুরে স্থানীয় মানুষের ক্ষতি করবে। ক্ষতি হবে পর্যটন পরিকাঠামোরই। পাহাড় বা সমুদ্রের ধারে ঝড়, অতিবৃষ্টি, ধসে যে ক্ষতি হয় তার উদাহরণ প্রতি বছরই দেশের কোনও না-কোনও প্রান্তে দেখা যায়। এখানেই অনেকে প্রশ্ন তোলেন যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের যে আর্থ-সামাজিক লোকসান হয়, তা কি বাজেটে ঠাঁই পায়? সেই ক্ষতিপূরণে কি বাজেট কোনও দিশা দেখায়? জলবায়ু বদলের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পরিবেশ সংক্রান্ত বাজেটে পৃথক বরাদ্দ কেন থাকছে না?
উল্লেখ্য, এই বাজেটে ‘কার্বন ক্যাপচার’ খাতে বিরাট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই পরিকাঠামো সিমেন্ট, ইস্পাত কারখানা থেকে নির্গত কার্বনকে রুখবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ ঠেকাতে ভারতের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই বরাদ্দ সাযুজ্যপূর্ণ। কিন্তু সে সবের বাইরেও প্রশ্ন ওঠে, পাহাড়, নদী, জঙ্গলের ক্ষত কি এ ভাবে সারানো যাবে? পাহাড়, জঙ্গল নিয়ে দেশের বর্তমান সরকারের মনোভাব নিয়ে অবশ্য বার বারই প্রশ্ন উঠেছে। তার সর্বশেষ উদাহরণ আরাবল্লী পর্বতের বিভিন্ন অংশ ‘লিজ়’ দেওয়ার প্রক্রিয়া। তবে আপাতত কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। কারণ, ওই প্রক্রিয়া আপাতত শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপে স্থগিত হয়েছে। তবে এ বারের বাজেটে অরণ্য ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে বরাদ্দের পরিসংখ্যান দেখলে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব বুঝতে অসুবিধা হয় না। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন খাতে ১০৬.৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গত বছর বরাদ্দ ছিল ১৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ৪৬ কোটি টাকা কম বরাদ্দ করা হয়েছে। জলজ জীববৈচিত্র সংরক্ষণের বরাদ্দ গত বছর ছিল ৩৫ কোটি টাকা, এ বছর ২১ কোটি।। কেউ অবশ্য বলতেই পারেন যে, বাঘ এবং হাতি সংরক্ষণে বরাদ্দ কমানো হয়নি। ঠিকই, তবে বন্যপ্রাণ শুধু বাঘ ও হাতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সামগ্রিক ভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ না-হলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হবে। বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হলে যতই টাকা বরাদ্দ করা হোক না কেন, বাঘ ও হাতির সংরক্ষণও কার্যকর হবে না।
দেশের আর্থিক উন্নতির দিশা নির্ধারণে সামগ্রিক পরিবেশ ভাবনা এখনও গুরুত্ব পায় না। প্রান্তিক নাগরিকের দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণও সেখানে কার্যত গৌণ। বরং পরিবেশ থেকে সম্পদ আহরণই রাষ্ট্রের কাছে মোক্ষলাভের পথ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)