Advertisement
০৭ ডিসেম্বর ২০২২
Jhulan Goswami

লর্ডসে দিদিগিরি, কিছু কিছু রূপকথা সত্যিও হয়!

পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকা চাকদহ থেকে উঠে এসে বিশ্বক্রিকেটের সেরার সিংহাসনে! ঝুলন গোস্বামীর কাহিনি আসলে রূপকথার মতো। কী লিখলাম?

অনিন্দ্য জানা
অনিন্দ্য জানা
শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৭:৩৭
Share: Save:

জনপ্রিয় নায়িকা ওয়াশরুমে যাবেন। কিন্তু ব্যাঙ্কোয়েটের সামনের সারির টেবিল ছেড়ে উঠছেন না! যদি ফিরে এসে জায়গা না পান! জায়গাটা কোথায়? না, এক কালো ট্রাউজার্স আর লম্বা ঝুলের সবজেটে শার্টের পাশে।

Advertisement

যাঁর পাশে বসা এবং নিজস্বী তোলার জন্য ব্যস্ত এবং বিখ্যাত নায়িকার ঝুলোঝুলি, তিনি বেজায় অপ্রতিভ। কারণ, তিনি জানতেন না, তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চে উঠে পুরস্কার নেবেন ভেবেই উত্তেজিত টালিগঞ্জের নায়িকা। শুধু উত্তেজিতই নয়, তারকার কাছে বিবিধ প্রশ্ন তাঁর। শিশুর মতো কৌতূহল। যা দেখেশুনে আরও বিব্রত একহারা চেহারার মেয়েটি (স্বাভাবিক। বাউন্ডারির দড়ির এ পারে তো তিনি স্বাভাবিকের চেয়েও স্বাভাবিক। নইলে কি আর উদ্যোক্তাদের বলেন, ‘‘আবার গাড়ি পাঠানোর কী দরকার! আমি নিজেই ড্রাইভ করে চলে আসতে পারব’’)। হাসতে হাসতে তিনি বলছেন, ‘‘আরে, তোমাকে তো টিভি খুললেই দেখা যায়। কত লোক চেনে তোমায়। কী অসম্ভব পপুলার তুমি!’’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! সেলুলয়েডের নায়িকা এতটাই মোহিত যে, বাস্তবের মহানায়িকাকে এক দণ্ডও ছাড়তে রাজি নন। চেয়ার ছেড়ে তো উঠতে চাইছেনই না, পারলে প্রকৃতির ডাকও উপেক্ষা করেন।

ততটা অবশ্য করতে হল না। প্রায় ডেলি প্যাসেঞ্জারীয় কায়দায় রুমাল ফেলে ট্রেনে ‘সিট’ রাখার মতো করে এক পরিচিতকে জামিনদার বানিয়ে জায়গা রেখে গেলেন নায়িকা। দৌড়ে গেলেন। ছুটে ফিরলেন। অতঃপর আবার শুরু হয়ে গেল দু’জনের কিচিরমিচির।

মধুমিতা সরকার এবং ঝুলন গোস্বামী।

মধুমিতা সরকার এবং ঝুলন গোস্বামী।

মধুমিতা সরকার আর ঝুলন গোস্বামীকে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, সেলিব্রিটি একেই বলে! তার পর মনে হল, নাহ্, সেলিব্রিটি নয়। সেলিব্রিটি তো আজকাল নুড়িপাথরের মতো এপাশে-ওপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। একটা ঢিল আকাশে ছুড়লে মাটিতে নেমে আসার সময় এক কিলোমিটারের বৃত্তের মধ্যে গোটা দশেক সেলিব্রিটির মাথায় তো পড়বেই! সেলিব্রিটি-টেলিব্রিটি নন। রিমলেস চশমা-চোখে, মুখে হাসি নিয়ে ঈষৎ ঝুঁকে যিনি পাশের চেয়ারে বসা সহ-অতিথির সঙ্গে কথা বলছেন বা ছবি তোলার সময় হাসছেন, তিনি ‘আইকন’। বিগ্রহ। যিনি কোথাও অধিষ্ঠিত হলে আপনা থেকেই তাঁর চারপাশে একটা ভক্তি, সম্ভ্রম এবং সমীহের মন্দির তৈরি হয়ে যায়।

Advertisement

কখনও আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে, কখনও একটু ঝুঁকে তিনি যখন বাকি অভ্যাগতদের সঙ্গে কথা বলছেন, তখন ভাবছিলাম, ঝুলন গোস্বামী এখনও ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য। প্রাক্তন অধিনায়কও বটে। ডানহাতি জোরে বোলার। যাঁকে বিশ্বের ‘সর্বকালের অন্যতম সেরা’ বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার ক্যাথরিন ফ্রিৎজপ্যাট্রিক খেলা ছাড়ার পর চাকদহের ঝুলন গোস্বামীই ধারাবাহিক ভাবে বিশ্বের দ্রুততম বোলার। ক্রিকেট সার্কিটে নামই হয়ে গিয়েছে ‘চাকদহ এক্সপ্রেস’। সেই নামে তাঁর জীবনীচিত্রও তৈরি হচ্ছে। যাতে নামভূমিকায় অভিনয় করছেন বিরাট কোহলির স্ত্রী অনুষ্কা শর্মা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এক দিনের ক্রিকেটে বোলারদের বিশ্ব ক্রমতালিকায় শীর্ষে পৌঁছেছেন। ২০১৮ সালে তাঁর সম্মানে ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ-এপ্রিলে এক দিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপে একটা রেকর্ড করেছেন এবং ছুঁয়েছেন দু’টো মাইলফলক। রেকর্ড— বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সব থেকে বেশি উইকেট নেওয়া। অস্ট্রেলিয়ার লিন ফুলস্টনের ৩৯ উইকেটের রেকর্ড ভেঙে গত বিশ্বকাপে ঝুলনের উইকেট সংখ্যা ৪৩। প্রথম মাইলফলক— মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে ২৫০ উইকেট নেওয়া। দ্বিতীয়, মিতালি রাজের পর দ্বিতীয় মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে ২০০টি এক দিনের ম্যাচ খেলার নজির।

ঝুলন গোস্বামীর জীবনীচিত্র ‘চাকদহ এক্সপ্রেস’-এ অনুষ্কা শর্মা।

ঝুলন গোস্বামীর জীবনীচিত্র ‘চাকদহ এক্সপ্রেস’-এ অনুষ্কা শর্মা।

পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকা চাকদহ থেকে উঠে এসে বিশ্বক্রিকেটের সেরার সিংহাসনে! ঝুলন গোস্বামীর কাহিনি আসলে রূপকথার মতো। কী লিখলাম? ‘রূপকথার মতো’? নাহ্, ‘মতো’ নয়। রূপকথা। সত্যি রূপকথা।

ঝুলন গোস্বামীকে প্রথম দেখেছিলাম ইডেনে। সম্ভবত ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচ চলছিল। যত দূর মনে পড়ছে, সচিন তেন্ডুলকরের বিদায়ী সিরিজ। তবুও মাঠ ফাঁকা। দর্শক-টর্শক বিশেষ নেই। কারণ, একে তো ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটাররা বহু দিন হল ক্রিকেটবিশ্বে সমীহ জাগানো ছেড়ে দিয়েছেন। যেটুকু যা পরিচিতি আছে, সেটাও গদাম-গদাম আইপিএলে। ঢিকির-ঢিকির টেস্ট ক্রিকেটে নয়। ফলে কাজের দিনে অফিস বা কলেজ কেটে তাঁদের দেখতে আর কার উৎসাহ থাকবে! আর ইয়ে, গণধোলাই খাওয়ার সম্ভাবনা আছে জেনেও বলছি, পড়ন্তবেলার সচিন ‘ফ্যান’ টানতেন বেশি। ‘দর্শক’ কম। ফলে ইডেন খুব শান্তিপূর্ণ এবং মাপমতো ফাঁকা।

ক্লাব হাউসের লোয়ার টিয়ারের দর্শকাসনে খুব এলেবেলে ভাবে বসেছিলেন ঝুলন গোস্বামী। একাই। কোনও বন্ধুবান্ধব, গুণমুগ্ধ (বা মুগ্ধা) নেই। কোনও সইশিকারি নেই। ভিড়ভাট্টা নেই। বসে বসে নিবিষ্ট মনে বোরিং টেস্ট ম্যাচ দেখছেন। আলাপ করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন অনুজ সহকর্মী। কাছে যেতেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ভারতীয় দলের ফাস্ট বোলার। আমি এমনিতেই বেঁটেখাটো, মোটাসোটা, কালোকোলো মানুষ। এক ঝটকায় প্রায় ৬ ফুট উচ্চতার কেউ সামনে দাঁড়িয়ে পড়লে একটা ধাক্কা লাগে। সেটা আরও জোরালো হল, যখন লো অ্যাঙ্গল থেকে মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে দেখলাম, শার্ট-ট্রাউজার্স পরিহিত চেহারার মাথাটা ক্লাব হাউসের টংয়ে প্রেস বক্সের ছাদ ছাড়িয়ে আকাশে উঠে গিয়েছে।

৫ ফুট ১১ ইঞ্চির ফ্রেমটা দেখে ঝপ করে একটাই শব্দ মনে হয়েছিল— ‘ইনটিমিডেটিং’। ভীতিপ্রদ! আর আলাপের পর তাঁর ঝরঝর করে হাসি দেখে মনে হয়েছিল— ‘ডিজ়আর্মিং’। এতটাই সারল্য সেই প্রাণখোলা হাসিতে যে, সামনে দাঁড়ানো মানুষটা চণ্ড রেগে থাকলেও তাকে নিরস্ত্র, বর্মহীন করে দেবে।

কিছু এলোমেলো ভদ্রতাসূচক কথা হয়েছিল। কিছু খুচরো কুশল বিনিময়। কিছু হেঁ-হেঁ। কিছু হুঁ-হুঁ। ওই পর্যন্তই। আনুষ্ঠানিক আলাপ হলেও ঝুলনের সঙ্গে স্বভাবজ আলস্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়নি। নিয়মিত তো দূরস্থান, অনিয়মিত যোগাযোগও ছিল না। তবে কি, ‘ক্রিকেটামোদী’ হিসেবে সমস্ত ক্রিকেট ম্যাচই চেটেপুটে খেয়ে থাকি। সে শীতকালে কালীঘাট, বাটা বা রাজস্থান মাঠেই হোক অথবা সারা বছর টিভিতে কাঁহা কাঁহা মুলুকে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট থেকে লাল বলের টেস্ট ক্রিকেট। বলা বাহুল্য, সেই বহুভোজী মেনু থেকে ভারতের মহিলা ক্রিকেটও বাদ পড়ে না। ফলে ঝুলন গোস্বামীদের খেলা নিয়মিত দেখতাম। মাঠে তুঙ্গ উত্তেজনার ম্যাচ চলছে আর ক্যাপ্টেন মিতালি রাজ বাউন্ডারি লাইনের ধারে একটা চেয়ারে বসে অন্য একটা চেয়ারে দু’পা তুলে দিয়ে পেপারব্যাক পড়ছেন— এটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে এখনও অন্যতম ‘কুল’ দৃশ্য বলে মনে হয়। খেলা তো বটেই, ভারতীয় পুরুষদলের ক্রিকেটারদের পাশাপাশিই মিতালি রাজ, ঝুলন গোস্বামী, স্মৃতি মন্ধানা, হরমনপ্রীত কৌরদের নিয়ে স্টার স্পোর্টসে যে ফিচার টাইপের অনুষ্ঠান হয়, সেগুলোও গিলতাম।

ভেবে দেখছি, ঝুলন গোস্বামী বরাবরই দূরের গ্রহ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে মৌখিক আলাপের সামান্যতাটুকুই রয়ে গিয়েছিল। কারণ, কেন জানি না এটা কখনও মনে হয়নি যে, এক বাঙালি কন্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলছেন বা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতোই তিনিও এক বাঙালি, যিনি দেশের অধিনায়কত্ব করেছেন। সৌরভ যদি ভারতীয় ক্রিকেটে ‘দাদাগিরি’ করে থাকেন, তো ঝুলনও ‘দিদিগিরি’ করেছেন। কিন্তু বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে ঝুলনকে বরাবর জাতীয় বীরাঙ্গনা এবং বিশ্ব নাগরিক হিসেবেই বেশি ভেবে এসেছি।

এমনই বেশ চলছিল। সব গোলমাল করে দিল গত শনিবার লর্ডসের বিকেল। জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে পৃথিবীর বিখ্যাততম প্যাভিলিয়ন থেকে বেরিয়ে মাঠে ঢুকছেন এক বঙ্গতনয়া। দু’পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ‘গার্ড অফ অনার’ দিচ্ছে ইংল্যান্ড টিম। সায়েবসুবোয় ভরা গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো! মুখ দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু সমবেত সংবর্ধনার জবাবে আকাশের দিকে তোলা ব্যাটিং গ্লাভস-পরা হাতটি কি খানিক অসংবৃত ছিল? হৃদ্‌স্পন্দনের মতোই পদক্ষেপও কি খানিক এলেমেলো? খানিক বিহ্বল? খানিক দ্রুত? কে জানে!

পর দিন ‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখেছিল, ‘দ্য ইনসিডেন্ট থ্রেটন্‌ড টু ওভারশ্যাডো অ্যান অকেশন হুইচ ওয়াজ় মেন্ট টু বি অল অ্যাবাউট দ্য ফাইনাল ম্যাচ ফর দ্য থার্টি-নাইন ইয়ার ওল্ড ঝুলন গোস্বামী... শি ওয়াজ় বোল্ড ফর আ গোল্ডেন ডাক বাই ফ্রেয়া কেম্প’।

ঠিকই। হতাশ ঝুলনের ফিরে আসা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, গরিমাময় ক্রিকেট কেরিয়ারের অন্ত এমন একটা নিদারুণ ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাবে! হতে পারেন মহিলা ক্রিকেটে সর্বাধিক উইকেটশিকারিনী। কিন্তু জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে প্রথম বলেই সটান বোল্ড? একটা রানও হল না? এতটাও নিষ্করুণ হতে পারেন ক্রিকেটদেবতা? এতটাই?

খেলা শেষের পর অবশ্য মনে হল, ঝুলন গোস্বামীর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার জীবনের শেষ পরিচ্ছেদটা ততটাও খারাপ লেখা হল না। ভারত ম্যাচ জিতল। সিরিজ জিতল। ঝুলন গোস্বামী জীবনের শেষ ম্যাচে দুটো উইকেটও তুললেন। আর সতীর্থেরা কাঁধে তুললেন তাঁকে।

দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনের শেষে গায়ে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে তিনি যখন লর্ডসের গ্যালারির সামনে দাঁড়িয়ে ছবির জন্য পোজ দিচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল, তাঁর ভিতরেও কি ‘চাকদহ এক্সপ্রেস’-এর মতোই হুড়মুড়িয়ে চলে আসছে একের পর এক দৃশ্য? ভিতরে ভিতরে অনবরত হচ্ছে স্মৃতির ভাঙচুর? কোথায় পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকা। আর কোথায় ক্রিকেটের মক্কা লর্ডস! দুই জংশনের মধ্যবর্তী একের পর এক স্টেশন। নিছক স্টেশনও নয়। মাইলফলক।

১৯৯৭ সালে ইডেনে মহিলা বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ম্যাচের বলগার্ল সে দিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল, দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলতে হবে। যত সহজে লিখলাম, ঠিক ততটাই বা তার চেয়েও কঠিন ছিল সেই ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া। চাকদহ থেকে দক্ষিণ কলকাতার বিবেকানন্দ পার্কের ভৌগোলিক দূরত্ব ছেড়ে দিন, তার চেয়ে অনেক বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ মানসিকতার দূরত্ব। সকাল ৭টায় প্র্যাকটিস শুরু। সেই প্র্যাকটিস ধরতে ভোর ৪টেয় কিটব্যাগ কাঁধে বাড়ি থেকে ট্রেন ধরতে বেরোনো। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। প্র্যাকটিস শেষে হা-ক্লান্ত শরীরের বাড়ি ফেরা। তার পর লেখাপড়া। তার পর আবার পর দিন ভোরে বেরোনোর অপেক্ষা।

কিন্তু সে তো গেল কায়িক পরিশ্রম। মানসিক পরিশ্রম? গাঁয়ের মেয়ে ক্রিকেট কিট কাঁধে ট্রেনে করে কলকাতায় যাচ্ছে— নব্বইয়ের দশকের শেষে তো দূরস্থান, এমন দরাজ সমাজ কি এখনও তৈরি হয়েছে আমাদের? খানিক টিপ্পনী, খানিক টিকা, খানিক চোরা অসম্মান কি ছিল না সেই যাত্রাপথে? বিলক্ষণ ছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল জেদ। একলা মেয়ের জেদ। তীব্র একমুখিতা যে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলতে হবে।

ভাগ্যিস সেই যাত্রায় ঝুলন গোস্বামী পিছনটা দেখতে পাননি! পিছনে তাকানো মানুষকে দুর্বল করে। পরিতাপের কারণ হয়। হাজার হাজার, কোটি কোটি বছরে মানুষের প্রচুর বিবর্তন হয়েছে। কান ছোট হয়েছে, চার-পায়ে চলাফেরা থেকে চার হাত-পা হয়েছে। সেই বিবর্তনের ভিড়ে মানুষের মাথার পিছনে একটা চোখ তৈরি হয়ে গেলেও যেতে পারত। হয়নি ভাগ্যিস! তা হলে মানুষ সব সময় অবলীলায় পিছনটা দেখতে পেত। সেই অনতি-অতীত তাকে সামনে এগোতে দিত না। সামনে তাকাতে দিত না। পিছনের টান মানুষকে দুর্বল করে। যা পরে পরিতাপের কারণ হয়। গুণিজনেরা বলেন, পিছনে তাকালে পিছন ফিরে তাকানো উচিত। খানিকটা চেষ্টা করে, খানিকটা মাথা ঘুরিয়ে দেখা উচিত। যা আমরা করি জীবনের এক একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে। বিশেষ দরকারে। বিশেষ কারণে। অহরহ নয়। ফিরে দেখাটা অভ্যাস করে ফেললে মুশকিল!

ভাগ্যিস ঝুলন গোস্বামী পিছনে দেখেননি! সংকল্পে দৃঢ় থেকেছেন। দু’দশকের কেরিয়ার শেষে লর্ডস সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি কি পিছনে ফিরে দেখেছেন? হয়তো দেখেছেন। হয়তো দেখেননি। দেখুন বা না-দেখুন, ঝুলন গোস্বামীর কাহিনি যতটা না পরিশ্রমের, তার চেয়েও অনেক বেশি প্রত্যয়ের।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবন শেষ করলেন মহিলা ক্রিকেটের সর্বোচ্চ (৩৫৫) উইকেটশিকারী হিসেবেই। কেরিয়ারের শেষে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দু’বার বিশ্বকাপ ফাইনাল গিয়েও এক বারও কাপ জেতা হল না, এটাই আক্ষেপ। তা তো বটেই। কে না জানে (ঝুলন গোস্বামীর মতো লড়ুয়ে তো আরওই জানেন), রানার্স হওয়ার মধ্যে সান্ত্বনা পুরস্কার আছে। কিন্তু কোনও গরিমা নেই। ওই যে বলে না, ‘ইউ ক্যান নট উইন আ সিলভার, ইউ ক্যান ওনলি লুজ আ গোল্ড!’ তুমি রুপো জিততে পারো না। তুমি শুধু সোনাটা হারতে পারো।

ওই আক্ষেপটুকু ছাড়া বাকি মুহূর্তগুলো উপভোগের। বলেছেন ঝুলন গোস্বামী। বলেছেন বটে ‘উপভোগের’। কিন্তু আমরা জানি, বাকি মুহূর্তগুলো লড়াইয়ের। লড়াই তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে। লড়াই সামগ্রিক ভাবে মহিলা ক্রিকেটের প্রতি কটাক্ষ, অশ্রদ্ধা এবং নিয়ত অবিশ্বাস আর অবজ্ঞার বিরুদ্ধে। লড়াই সমাজের বিরুদ্ধে। লড়াই সময়ের বিরুদ্ধে। অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। ঝুঁকির বিরুদ্ধে।

ঝুলন গোস্বামীর কাহিনি যতটা না পরিশ্রমের, তার চেয়েও অনেক বেশি প্রত্যয়ের।

ঝুলন গোস্বামীর কাহিনি যতটা না পরিশ্রমের, তার চেয়েও অনেক বেশি প্রত্যয়ের।

লর্ডসে ঝুলন গোস্বামীকে দেখতে দেখতে ইডেনে তাঁকে প্রথম দেখার দিনটা মনে পড়ছিল। সেদিন লো অ্যাঙ্গল থেকে মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে মনে হয়েছিল, তাঁর মাথাটা ক্লাব হাউসের টংয়ে প্রেস বক্স ছাড়িয়ে আকাশে উঠে গিয়েছে। গত শনিবার লর্ডসে তাঁর সম্মানে ‘গার্ড অফ অনার’ দেখতে দেখতে মনে হল, যে কোনও কৌণিক দূরত্বেই দেখা যাক, আকাশ ছাড়িয়ে ঝুলন গোস্বামী চির উন্নত শির।

শেষে এসে আচমকা খেয়াল পড়ল, পুরো লেখায় তাঁকে ‘ঝুলন গোস্বামী’ লিখলাম। ‘ঝুলন’ নয়। নাম ধরে লেখাটা এল না। সমীহ হল। কারণ, টলিউডের জনপ্রিয় নায়িকার মনোযোগ এবং পুজো পেয়ে যতই বিড়ম্বিত হোন, ঝুলন গোস্বামী নিছক ‘সেলিব্রিটি’ নন, তিনি বিগ্রহ। ‘আইকন’। যিনি কোথাও অধিষ্ঠিত হলে আপনা থেকেই চারপাশে একটা ভক্তি, সম্ভ্রম এবং সমীহের বাতাবরণ তৈরি হয়ে যায়। আমার দোষ নেই। মধুমিতা সরকারেরও দোষ নেই।

(গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.