E-Paper

‘নরম মেয়ে’র উপাখ্যান

আর একটু তলিয়ে ভাবি যদি? মেয়েরা নিজেদের কী ভাবে দেখেন, সমাজ তাঁদের কী ভাবে দেখে এবং দেখতে শেখায়— এমনকি নিজেদের চোখেও— সে প্রশ্নে যদি ঢোকা যায়?

শ্রীমন্তী রায়

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৭

কয়েক দিন আগে সমাজমাধ্যমে একটা পোস্ট ভাইরাল হল। একটি মেয়ের বিয়ে এবং বৌভাতের ছবি, সঙ্গে ক্যাপশন: বাবার টাকায় শেষ সাজ, এবং বরের টাকায় প্রথম সাজ। স্বভাবতই স্মার্টফোনের পর্দায় ঝড় উঠেছে। হরেক মন্তব্যের মধ্যে বিশেষ ভাবে ফুটে উঠল কর্মরতা মেয়েদের কথাগুলি— এখন নিজে উপার্জন না-করে বিয়ে করা অনুচিত, কারণ ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’ মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার অন্যতম ধাপ। ছবির মেয়েটিকে তাঁরা তিরস্কার করলেন— কেউ সস্নেহ, কেউ কঠোর ভাবে। বুঝিয়ে বললেন, অন্য কারও টাকার জোরে ‘ভাল থাকা’ নিয়ে গর্বিত হতে নেই।

তাঁদের এই তিরস্কারের সঙ্গে দ্রুত একমত হওয়ার আগে একটা অন্য কথা ভাবা যাক— তাঁরা কি ধরেই নিলেন যে, বাংলায় তথা ভারতে সমস্ত মেয়ে একই রকম পরিবেশে বড় হয়ে ওঠে, যেখানে তাদের আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়া, সমানাধিকারের কথা শেখানো হয়, এবং বড় হয়ে ওঠার সময় পরিবারের ‘ছেলেদের’ সঙ্গে তাদের পার্থক্য করা হয় না? অথবা, বড় হওয়ার সময়ে এমন পরিবেশ না পেলেও সব মেয়েই কোনও জাদুমন্ত্রে শিখে নিতে পারে জীবনের পাঠ? গুরুগ্রামে এক বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত এক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার সগৌরব বলেছিলেন, তাঁর বিয়ের পণের টাকা তিনি বাবার থেকে নেননি, পুরোটাই নিজে দিয়েছেন! উচ্চশিক্ষিত, কর্মরত সেই মহিলার কাছে সেটাই ক্ষমতায়নের শীর্ষ ছিল— তিনি ভাবতে পারেননি যে, পণের টাকা কে দিলেন সেটা মূল প্রশ্ন নয়, পণ যে দিতে হল, সেটাই অবমাননাকর। এই সামাজিক রীতিকে প্রশ্ন করার কথা তাঁর মনে আসেনি।

বলতেই পারেন, এ সব ব্যতিক্রমী উদাহরণ। কিন্তু, আর একটু তলিয়ে ভাবি যদি? মেয়েরা নিজেদের কী ভাবে দেখেন, সমাজ তাঁদের কী ভাবে দেখে এবং দেখতে শেখায়— এমনকি নিজেদের চোখেও— সে প্রশ্নে যদি ঢোকা যায়? যে মেয়ে বাবার টাকা অথবা বরের টাকা নিয়ে সুখী, আর যে মেয়ে নিজের পণের টাকা নিজে দিয়ে গর্বিত হচ্ছেন, তাঁরা আসলে দাঁড়িয়ে আছেন একই প্রান্তে। সমাজ তাঁদের শিখিয়েছে যে, ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে পুরুষ, টাকা আসলে তারই। সেই ‘শিক্ষা’কে তাঁরা অস্বীকার করছেন না— এক পক্ষ ক্ষমতার সেই উচ্চাবচতাকে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট, আর অন্য জন নিজেকে দেখছেন সেই পুরুষের জায়গায়।

এই সংজ্ঞাকে অক্ষুণ্ণ রেখেই সমাজমাধ্যমের পরিসরে আরম্ভ হয়েছে এক নতুন নারীত্বের নির্মাণ— যাকে বলা হচ্ছে ‘সফট গার্ল’, যেখানে নারী ‘বেছে নিচ্ছে’ তথাকথিত এক ‘শান্তিপূর্ণ’ জীবন, সেখানে পুরুষের আধিপত্যকে প্রশ্ন করার তাগিদ নেই। বরং মেয়েদের তুলে ধরা হচ্ছে পুরুষদের সহকারী হিসাবে, নরম মানসিকতার অধিকারী হিসাবে, কাজ হিসাবে বেছে নেওয়া হচ্ছে এমন সব ক্ষেত্র, যেখানে তুলনামূলক ভাবে পুরুষ-প্রাধান্য কম— এমন কাজ, যেগুলিকে সাধারণত নারীদের ক্ষেত্র হিসাবেই দেখা হয়।

এটা অনস্বীকার্য যে, সমাজমাধ্যম লিঙ্গ নির্বিশেষে বহু মানুষের কাছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। তার মধ্যে অনলাইন ব্যবসা আছে, নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনও আছে। কিন্তু, যদি লিঙ্গের প্রিজ়ম দিয়ে দেখি? ভারতীয় মহিলা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের যদি ধরি, দেখা যাবে, তাঁদের এক বড় অংশের কনটেন্ট কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে: কেনাকাটা, রান্না, বাচ্চার টিফিন, শাড়ি-গয়নার সংগ্রহ, অনুষ্ঠান বাড়ির সাজ, গর্ভবতী অবস্থার রুটিন, অতিথি অভ্যর্থনার প্রস্তুতি— তালিকাটি দীর্ঘ, এবং পরিচিত। এগুলো সবই ‘মেয়েদের কাজ’। পিতৃতন্ত্র ঠিক যে ভাবে যে-যে ক্ষেত্রে মেয়েদের দেখতে চায়, সচেতন কিংবা অসচেতন ভাবে মেয়েরা আটকে পড়ছেন সেই খাঁচাতেই।

জুডিথ বাটলার তাঁর জেন্ডার ট্রাবল বইয়ে ‘জেন্ডার পারফর্মিটিভিটি’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন যে, জেন্ডার বা লিঙ্গপরিচিতি কোনও স্থির সত্তা নয়, এবং এটি এক দিনে তৈরি হয় না— সার্বিক আচরণের মাধ্যমে আমরা ‘জেন্ডার’ পরিচয় তৈরি করি সমাজের তথা পিতৃতন্ত্রের তৈরি করা নিয়মের শর্ত মেনে। আমাদের প্রতিদিনের কাজগুলি বার বার করে করতে থাকি, ফলে সেটিকেই নিয়ম বলে মেনে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, ‘মেয়েরা ঘরের কাজ করবে এবং পুরুষরা বাইরের’— এটি আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নির্মিত নিয়মই ছিল, যা সমাজের নারী ও পুরুষ অনুশীলন করত। নারীবাদী আন্দোলনের চাপে এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন ধীরে ধীরে সমাজের সর্ব ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পেল, তখন পুরুষতন্ত্রও তার বয়ান পাল্টাল। ‘শাড়িতেই নারী’ ‘আমি নারী, আমি সব পারি’ জাতীয় প্রশস্তি ঢুকে পড়ল চলতি বয়ানে। কিন্তু, সে বয়ানের চলন মেনেও নারী আটকে থাকলেন সেই শাড়ি গয়না ঘরকন্নার পরিচিত খোপে।

আজকের ‘স্বাধীন’, ‘সার্বভৌম’ কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও কি ভাবছেন যে, তাঁরাও আসলে পুরুষতন্ত্রের বেঁধে দেওয়া ছকেই পা ফেলছেন? এ সব কনটেন্টে গৃহকর্মকে অধিকাংশ সময়ে এমন ভাবে তুলে ধরা হয়, যেন তা নারীত্বের সহজাত বৈশিষ্ট্য হিসাবে প্রতিভাত হয়। ফলে, গৃহকর্মের সমার্থক যে ‘গৃহশ্রম’ হয়, এবং তার যে অন্যান্য পেশাদারি কাজের মতোই গুরুত্ব এবং সাম্মানিক প্রাপ্য, সে কথাটি ক্রমে ‘অবৈধ’ হয়ে ওঠে। বিয়ে, মাতৃত্বকে এমন ভাবে মহিমান্বিত করা হয়, যাতে দু’টি বিষয়কেই ‘সমাজের নিয়ম’ এবং ‘নারীজীবনের চরম প্রাপ্তি’ বলে মনে হয়— দু’টিই যে ব্যক্তিগত পছন্দের এবং মতের ক্ষেত্র, সে কথা বলার পরিসরই আর থাকে না। এমন কনটেন্ট সংখ্যায় প্রচুর, এবং তুমুল জনপ্রিয়। এখানে যে-হেতু ক্ষমতার কাঠামোকে কোনও প্রশ্ন করা হয় না, সে-হেতু পুরুষতন্ত্রের চোখে তা তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ। স্বাধীন নারীরা এখানে পুরুষতন্ত্রের ভাষাতেই কথা বলেন।

স্বাভাবিক ভাবেই পিতৃতন্ত্র এই পুনর্নির্মাণকে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বলে প্রচার করছে। তার মতে, এটি ‘চয়েস ফেমিনিজ়ম’, কারণ নারীরাই এটি বেছে নিচ্ছেন। ভোগবাদী ও নব্য উদারনৈতিক পরিবেশে ‘পছন্দ’ ও ‘ক্ষমতায়ন’-এর ভাষ্যকে ব্যবহার করে পিতৃতন্ত্র নারীদের সামনে এক আকর্ষণীয় আত্মপরিচয়ের মডেল তুলে ধরছে, যেখানে ভোগ্যপণ্য ও আত্মপরিচর্যার ‘ক্রয়ক্ষমতা’কেই নারী স্বাধীনতার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। আড়ালে চলে যাচ্ছে কাঠামোগত বৈষম্য, শ্রমের শোষণ, লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার সম্পর্ক, মূলগত বিষয়গুলি।

নিবেদিতা মেনন তাঁর সিয়িং লাইক আ ফেমিনিস্ট গ্রন্থে সমসাময়িক পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে ‘ন্যুড মেক-আপ’-এর তুলনা করেছিলেন। এই জাতীয় প্রসাধনের মূল উদ্দেশ্য হল, প্রচুর মেক-আপ করার পরও যেন মনে না-হয় যে, মেক-আপ করা হয়েছে। মেনন বলছেন, সমসাময়িক পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোও আসলে এমনই, যেখানে তা চায় তার ‘ক্ষমতা’-কে যেন আর ক্ষমতা বলে মনে না-হয়— শোষণকে ‘রীতি’, বৈষম্যকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হয়। নারীপুরুষ-নির্বিশেষে সবাইকে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর প্রশ্নহীন অংশীদার করে তুলতে চায়, যারা বুঝবেই না যে, পিতৃতন্ত্র আদর্শ পুরুষ ও নারীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যকে ‘ন্যায্য’ বলে স্বীকার করে, পুরুষদের প্রাধান্য ও নারীদের অধীনতাকে স্বাভাবিক ও বৈধ মনে করে। প্রথাগত লিঙ্গ ভূমিকাকে বজায় রাখার জন্য পিতৃতন্ত্র খুঁজে বার করে তার সহযোগীদের, যেমন আজকের ‘সফট গার্ল’-রা।

ভবিষ্যতেও যে এই নির্মাণ একই রকম ভাবে টিকে থাকবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। বাজারের চাহিদা-কাঠামো পাল্টালে পিতৃতন্ত্র ফের তার বয়ান বদলাবে। কিন্তু, সেই নতুন বয়ানেরও মূল উদ্দেশ্য হবে পিতৃতন্ত্রের কাঠামোকে বজায় রাখা, প্রশ্নাতীত রাখা। নারীকে বেঁধে রাখা তার ‘পার্সোনাল’-এর পরিসরে। সেটা যে আসলে ‘পলিটিক্যাল’, এই কথাটা বারংবার জোরের সঙ্গে বলে চলাই প্রতিরোধের প্রধান পথ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Empowerment Society

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy