E-Paper

খেলার মাঠে বর্ণ-বিষ

সম্প্রতি নামিবিয়া ও জ়িম্বাবোয়েতে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনোযোগের কেন্দ্র ছিল চোদ্দো বছরের বিস্ময়-ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী। তা নিয়ে অসুবিধে নেই, তবে এই ক্রীড়ামোদী মানুষদেরও একটা জরুরি বিষয়ে বড় একটা নজর পড়েনি।

সূর্যশেখর দাস

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৮

এখন দুনিয়া জুড়েই অভিবাসন একটি বিপজ্জনক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুনিয়া প্রায় ভুলতে বসেছে যে অভিবাসন কোনও সমাজের কত গভীরে চারিত হয়ে তাকে সমৃদ্ধ করে থাকে। একদম অন্য এক ক্ষেত্র থেকে উদাহরণ দেওয়া যাক— খেলার মাঠ।

সম্প্রতি নামিবিয়া ও জ়িম্বাবোয়েতে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনোযোগের কেন্দ্র ছিল চোদ্দো বছরের বিস্ময়-ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী। তা নিয়ে অসুবিধে নেই, তবে এই ক্রীড়ামোদী মানুষদেরও একটা জরুরি বিষয়ে বড় একটা নজর পড়েনি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে যে অন্তত ২৪০ জন ক্রিকেটার খেললেন, তাঁদের মধ্যে ৯২ জনই হয় দক্ষিণ এশীয়, বা তাঁদের পূর্বপুরুষরা দক্ষিণ এশীয়। এই খেলোয়াড়দের অনেকেই দলকে নির্ভরতা জুগিয়েছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের যতই অপছন্দ করুন, তাঁর দেশেরই অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় ক্রিকেট দলে সকলেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার! আবার নিউ জ়িল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মতো দলগুলিতেও ভারতীয়, পাকিস্তানি, এমনকি সিংহলি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে দলকে গৌরবান্বিত করেছেন।

যাঁরা ভাবছেন শুধু যুব দলেই বুঝি এই অ-শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটাররা সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁরা আমেরিকার সিনিয়র ক্রিকেট দলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারেন— সৌরভ নেত্রভালকর, মোনাঙ্ক পটেল, সায়ান জাহাঙ্গির, আলি খান, সেহান জয়সূর্যের মতো খেলোয়াড়রা ইতিমধ্যেই নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ঠিক যেমন আদিল রশিদ, মইন খানের মতো ক্রিকেটাররা দীর্ঘদিন ধরেই ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে সমৃদ্ধ করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সদ্য অবসর নেওয়া, পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করা উসমান খোয়াজার ব্যাট অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বার বার ঝলসে উঠেছে।

খেলোয়াড়দের ‘গায়ের রং’ নিয়ে কথা উঠলে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রসঙ্গ উঠবেই। একটা সময় ছিল যখন কৃষ্ণাঙ্গ বা অ-শ্বেতাঙ্গরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দেশের হয়ে খেলতে পারতেন না। শ্বেতাঙ্গ প্রশাসকদের কারণে বহু অ-শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়ের কেরিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ সাদা চামড়ার খেলোয়াড়রা যা করতে পারেননি, কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়ক তেম্বা বাভুমা তা করে দেখিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকা গত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করেছে। এই ‘রেনবো নেশন’-এর ক্রিকেটাররা ভারতের মাটিতেই ভারতকে টেস্ট সিরিজ়ে হোয়াইটওয়াশ করেছে। এই দলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বোলার কাগিসো রাবাডা এক জন কৃষ্ণাঙ্গ, স্পিন বিভাগে অপরিহার্য সদস্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত কেশব মহারাজ।

২০১৬-র নভেম্বরে পারথে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ম্যাচেই কেশব মহারাজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আগমন, ওই টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার এক নম্বর ফাস্ট বোলার ডেল স্টেন মাত্র একটা উইকেট নিয়েই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন চোটের কারণে। বিশেষজ্ঞরা যখন ভেবেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা এ বার অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করবে, তখনই অ-শ্বেতাঙ্গ কেশব রুখে দাঁড়ান, ডুমিনি-বাভুমারা জ্বলে ওঠেন, ম্যাচের সেরা হন রাবাডা। ওই ম্যাচে ২০টা উইকেটের মধ্যে ১৯টাই নিয়েছিলেন অ-শ্বেতাঙ্গ বোলাররা— সেই দেশের হয়ে, তার পঁচিশ বছর আগে পর্যন্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কালো ও বাদামি রঙের খেলোয়াড়দের যে মাটিতে খেলার সুযোগই তেমন ছিল না। কেশবের বাবা আত্মানন্দ মহারাজ ছিলেন এক জন দক্ষ উইকেটকিপার, কিন্তু বর্ণবৈষম্যের বিষে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছিল।

বর্তমানে শুধু ক্রিকেট নয়, ফুটবল থেকে শুরু করে অন্যান্য খেলাতেও অ-শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের দাপট ক্রমশ বাড়ছে। নিজ যোগ্যতার দৌলতেই তাঁরা স্ব-নির্বাচিত দেশের হয়ে সাফল্যের নতুন অধ্যায় লিখছেন। মার্কাস রাশফোর্ড, জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা-র মতো অ-শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়রা ইংল্যান্ডের জাতীয় ফুটবল দলে নজরকাড়া ফুটবল খেলছেন। আর বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা শক্তি ফ্রান্সের তো বরাবরই কৃষ্ণাঙ্গ, অ-শ্বেতাঙ্গ, অভিবাসী খেলোয়াড়রা প্রধান চালিকাশক্তি। ফ্রান্সের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার জ়িনেদিন জ়িদান আলজেরীয় শরণার্থীর সন্তান। ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপ এবং ২০০০-এর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ফরাসিদের জয়ে জ়িদানের বিরাট অবদান ছিল। আবার এই সময়ের শ্রেষ্ঠ বলে খ্যাত, ফরাসি ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপে স্বদেশকে ২০১৮-র বিশ্বকাপ জিততে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এমনকি গত বিশ্বকাপের ফাইনালেও দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে আর একটু হলেই আর্জেন্টিনা তথা মেসির হাত থেকে বিশ্বকাপ কেড়ে নিচ্ছিলেন বলা চলে। গোটা বিশ্বকাপেই দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছেন।

বিভিন্ন খেলায় অভিবাসীদের অবদান এতটাই, লিখতে গেলেও বুঝি ফুরোবে না। তার পরেও কিন্তু আমেরিকার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এখন অভিবাসন প্রক্রিয়াকে রীতিমতো বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কার্যত গর্তে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশাপাশি, ফ্রান্সের দক্ষিণপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন-এর মতো রাজনীতিকরা অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন করে তুলছেন। খেলার ময়দানে অভিবাসী, অ-শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়দের একাংশ এখনও বর্ণবৈষম্যের চূড়ান্ত শিকার হয়ে চলেছেন প্রতি দিন। গায়ের চামড়ার রং নয়, প্রতিভার বিচারে তাঁদের উপযুক্ত সম্মান দেওয়া হোক, বর্ণবৈষম্যের বিষকুম্ভ ছুড়ে ফেলা হোক— মানবিক ক্রীড়াপ্রেমীদের এই অভিপ্রায়টুকু কি বড় বেশি চাওয়া?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

South Africa Racial Discrimination

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy