E-Paper

হাতে রইল শুধুই ডিম

গত দেড় মাসের ঘটনাবলি রাজনীতিকদের মধ্যে নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। রাজনীতিকরা নীতি, নৈতিকতা বিসর্জন দিতেই পারেন। কিন্তু তাঁরা মানুষের রায়ের অন্যথা করতে পারেন কি? তাঁরা কি ভোটারদের প্রতি দায়বদ্ধতা বিসর্জন দিতে পারেন?

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০৭:৪৭

ভারতের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক দর্শনের একটা বড়সড় ফারাক রয়েছে। দ্বিতীয়টি মনে করে, রাজনৈতিক লক্ষ্য সঠিক হলে, সেই লক্ষ্য পূরণে যে কোনও কৌশলও সঠিক। কিন্তু এ দেশের রাজনৈতিক দর্শন বরাবরই রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সেই লক্ষ্য পূরণের পন্থা— দু’দিকেরই নৈতিক দিকটিতে জোর দিয়ে এসেছে।

গত দেড় মাসের ঘটনাবলি রাজনীতিকদের মধ্যে নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। রাজনীতিকরা নীতি, নৈতিকতা বিসর্জন দিতেই পারেন। কিন্তু তাঁরা মানুষের রায়ের অন্যথা করতে পারেন কি? তাঁরা কি ভোটারদের প্রতি দায়বদ্ধতা বিসর্জন দিতে পারেন?

বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের রায় ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। তাঁরা চেয়েছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এসে তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে। সেই ভোটের জোরেই বিজেপির ২০৮ জন বিধায়ক জিতে এসেছেন। আবার রাজ্যের একটা বড় অংশের মানুষ তৃণমূলকেও ভোট দিয়েছেন। তাঁদের ভোটের জোরেই তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। এই ভোটাররা বিজেপিকে সরকারে দেখতে চাননি।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের কথা ধরা যাক। রাজ্যের যে সব ভোটার বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপির সরকার চেয়েছিলেন। যাঁরা বিজেপিকে কেন্দ্রে সরকারে দেখতে চাননি, তাঁরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের ভোটে জিতে তৃণমূলের ২৯ জন সাংসদ লোকসভায় গিয়েছিলেন।

বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হতেই দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছেন। ‘বিদ্রোহী তৃণমূল’-এর সাংসদরা বলছেন, তাঁরা লোকসভায় বিজেপি সরকারকে সমর্থন করবেন। কিন্তু তাঁদের যে বিজেপি-বিরোধী ভোটাররা ভোট দিয়ে জিতিয়ে লোকসভায় পাঠিয়েছিলেন। মানুষের রায়কে সম্মান জানাতে হলে তাঁদের লোকসভায় বিজেপির বিরোধিতাই করার কথা। তার কী হবে?

‘বিদ্রোহী তৃণমূল’-দের মধ্যে বিধায়করা আবার বলছেন, তাঁরা বিধানসভায় বিরোধীর ভূমিকা পালন করবেন। যদিও তাঁদের আনুগত্য আসলে সরকারের প্রতি বলে অভিযোগ। তার প্রমাণ হল, রাজ্য জুড়ে তৃণমূল নেতাদের বিভিন্ন অভিযোগে ধরপাকড় শুরু হলেও এই ‘বিদ্রোহী বিধায়ক’-দের বিরুদ্ধে কোথাও কোনও পদক্ষেপ হয়নি। তাঁদের এক জনকেও কেউ ডিমও ছোড়েনি। পুলিশি পদক্ষেপ দূরের কথা। জাদুবলে তাঁরা সকলে ‘ভাল তৃণমূল’ হয়ে গিয়েছেন। অথচ বিজেপির ভোটাররা চেয়েছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এসে দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপে বাছবিচার করবে না।

তা হলে ভোটারদের হাতে কী রইল? শুধুই ডিম?

হয়তো তাই। কারণ এ দেশে সাংসদ, বিধায়কদের এক বার ভোটে জিতিয়ে লোকসভা, বিধানসভায় পাঠানোর পরে পাঁচ বছরের মধ্যে আর তাঁদের সরানোর ক্ষমতা ভোটারদের হাতে নেই। কোনও লোকসভা বা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটাররা তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করে নিতে পারেন না। কোনও ভোটার বলতে পারেন না যে, ‘আমরা তো বিজেপির অমুক নেতাকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিয়েছিলাম। তিনি এখন বিধায়ক, মন্ত্রী হয়ে গিয়ে সেই তৃণমূলের নেতাদের বাড়িতে গিয়ে বৈঠক করছেন কেন!’ ভোটাররা দেখছেন, বিজেপির বিরোধিতা করার জন্য নির্বাচিত সাংসদ ডিগবাজি খেয়ে বিজেপিকেই সমর্থন করছেন। বা, তৃণমূলকে হটিয়ে যে বিজেপি বিধায়ককে জেতানো হল, তিনি সেই তৃণমূলের বিধায়কের সঙ্গেই হাত মেলাচ্ছেন। অথচ ভোটারদের রায় অস্বীকার করা নেতাদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার ভোটারদের নেই।

নেই ঠিকই, তবে ভোটারদের এই ‘জনপ্রতিনিধিদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার’ বা ‘রাইট টু রিকল’-এর দাবি বহু বার উঠেছে। আর তা রাজনীতিকদের মধ্যে থেকেই উঠেছে। সাংসদ, বিধায়কদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা না থাকলেও হিন্দি বলয়ের বহু রাজ্যে পঞ্চায়েত বা পুরসভার সদস্যদের ক্ষেত্রে ভোটারদের এই অধিকার রয়েছে। সেখানে ভোটাররা যদি মনে করেন, অমুক পুরপিতা বা পঞ্চায়েত প্রধান ঠিকমতো কাজ করছেন না, তা হলে তাঁদের প্রতি অনাস্থা জানাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এ নিয়ে ভোটাভুটি হতে পারে। মধ্যপ্রদেশে ২০০০ সালেই আইন করে পুর-প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার ভোটারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি মাসেই মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার দেওড়ি পুরসভার চেয়ারপার্সনকে প্রত্যাহার নিয়ে গণভোট হয়েছে।দেশের সংবিধান পরিষদে সাংসদ, বিধায়কদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভোটারদের অধিকারের দাবি তুলেছিলেন ওড়িশার কংগ্রেস নেতা লোকনাথ মিশ্র। তাঁর বক্তব্য ছিল, জনগণের প্রতিনিধিরা যদি মানুষের সেবা ঠিকমতো না করেন, তা হলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকা উচিত। এর সঙ্গে গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। যদিও সেই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়।

জয়প্রকাশ নারায়ণ ওরফে জেপি তাঁর ইন্দিরা গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় এই ‘রাইট টু রিকল’-এর দাবি তুলেছিলেন। সেই সময়ই ১৯৭৪ সালে সিপিআই নেতা সি কে চন্দ্রপ্পন সংসদে ভোটারদের এই অধিকারের দাবিতে বিল আনেন। তাতে সমর্থন জানিয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। কিন্তু সেই বিলও খারিজ হয়ে যায়। মনমোহন সিংহ সরকারের শেষ পর্বে ২০১১ সালে অণ্ণা হজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন থেকে ফের এই দাবি ওঠে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জমানাতেও এই দাবি উঠেছে। ২০১৭ সালে বিজেপির সাংসদ বরুণ গান্ধী ভোটারদের এই অধিকারের দাবিতে জন প্রতিনিধিত্ব আইনে সংশোধন চেয়ে বেসরকারি বিল পেশ করেছিলেন।খুব সম্প্রতি গত ফেব্রুয়ারিতে রাজ্যসভায় এই দাবি তুলেছিলেন তরুণ সাংসদ রাঘব চড্ডা। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোটারদের যদি ‘রাইট টু ইলেক্ট’ বা নির্বাচিত করার বা অধিকার থাকে, তা হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে হটানোর ‘রাইট টু রিকল’ থাকা উচিত। পাঁচ বছর দীর্ঘ সময়। আর কোনও পেশায় এত দিন ঠিক মতো কাজ না করে নিজের পদে টিকে থাকা যায় না। সাংসদ, বিধায়কদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

রাঘব চড্ডা তখনও আম আদমি পার্টিতে ছিলেন। তার পরে তিনি ও তাঁর দলের সাত জন সাংসদ বিজেপিতে যোগ দেন। আম আদমি পার্টির রাজ্যসভার সংসদীয় দলটাই বিজেপিতে মিশে যায়। রাজনীতির এমনই পরিহাস, এর পরে আম আদমি পার্টির পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান ও তাঁর দলের বিধায়করা রাঘবদের রাজ্যসভা থেকে ফিরিয়ে নেওয়া বা ‘রিকল’-এর দাবি তুলেছিলেন। কারণ বিধায়করাই ভোট দিয়ে রাজ্যসভার সাংসদদের জিতিয়ে সংসদে পাঠান। আম আদমি পার্টির বিধায়কদের যুক্তি ছিল, তাঁরা রাঘবদের রাজ্যসভায় বিজেপির বিরোধিতা করতে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা উল্টে বিজেপিকেই সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিলে, তাঁদের সাংসদ পদ থেকে সরিয়ে নেওয়ার অধিকারও বিধায়কদের দিতে হবে।

এ দেশে ভোটাররা মূলত রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। প্রার্থীদের দেখে নয়। দল মত নির্বিশেষে এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। তাই এক দলের টিকিটে জিতে এসে অন্য দলে যোগ দেওয়াটা অনৈতিক। তা রুখতেই সংবিধান সংশোধন করে দশম তফসিলের মাধ্যমে দলত্যাগ বিরোধী ব্যবস্থা যোগ করা হয়েছিল। মুশকিল হল, সেই সংবিধানের ফাঁকফোকর খুঁজে দল ভাঙানোর কাজ চলছে। আসলে তা ‘পিপল’স ম্যানডেট’ বা মানুষের রায়কে বুড়ো আঙুল দেখানো।কোনও দল ভোটে জিতে রাজ্যে ক্ষমতায় আসতেই পারে। কিন্তু শাসক দলের মনে রাখা উচিত, মানুষ একদলীয় শাসনব্যবস্থার পক্ষে রায় দেয়নি। তাই রাজ্যের শাসক দল বলতে পারে না, ‘ওহে, সরকারটাও আমাদের, বিরোধীরাও আমাদের!’ সেটা ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা। একই ভাবে কেন্দ্রেও গত লোকসভা নির্বাচনে মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় আনলেও, তাদের ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধনের জন্য ‘চারশো পার’ বা লোকসভার দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিততে দেয়নি। অথচ বিজেপি শীর্ষনেতৃত্ব এখন লোকসভা, রাজ্যসভায় নিজেদের পছন্দমতো সংবিধান সংশোধনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন জোগাড়ে তৃণমূল-সহ অন্যান্য আঞ্চলিক দল ভাঙানোর খেলায় নেমেছে।

একে রাজনৈতিক কেরামতি বলা যায় না। এই রাজনৈতিক কৌশলের জনকদের ‘এ যুগের চাণক্য’ বলাটা চাণক্যের অপমান। নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা এবং মানুষের রায়কে অসম্মান ছাড়া এর অন্য কোনও সংজ্ঞা নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy