এক কালে নির্মাতারা মনে করতেন, বাণিজ্যিক সিনেমায় আদ্যোপান্ত হাসির ছবি তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে, কমেডিকে সাবপ্লট হিসাবে ব্যবহারই ছিল বেশি প্রচলিত। গল্পের নাট্যময়তা পরিবেশকে ভারী করলে গতি আর প্রাণ ফেরাত ‘কমিক রিলিফ’, নাট্যশাস্ত্র চর্চিত পথে। উদাহরণ, খোদ শোলে। শক্তিশালী অভিনয়, চরম আবেগ, দুর্দান্ত অ্যাকশন, ঝাঁ-চকচকে সিনেমাটোগ্রাফি— এই রেওয়াজি আয়োজনেই স্বাদ বাড়িয়েছিল রগুড়ে দু’টি চরিত্র। জয়, বীরু, বসন্তী, গব্বর যেমন অমর, ছোট্ট পরিসরে ‘অংরেজ়োকে জ়মানেকে জেলর’ আর ‘সুর্মা ভোপালি’-ও ভোলার নয়। হিটলারের ভঙ্গি, উদ্দীপক বাচনরীতির সঙ্গে জ্যাক লেমন অভিনীত ‘প্রফেসর ফেট’-এর হাসি জুড়ে জেলর-কে যে ভাবে গড়েছিলেন আসরানী, তার পর মজার চরিত্রের ফাঁদে বন্দি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিশেষত তখনই, ওই সত্তরের মাঝামাঝি থেকে বলিউডে আস্তে আস্তে কমেডি-ছবির আলাদা ধারাও প্রবল হয়ে উঠছিল। কিন্তু, আসরানীর মূল কৃতিত্ব এখানেই, তিনি এতই পরিপূর্ণ অভিনেতা যে পরিচালকরা তাঁর জন্য গল্পে বরাবর আলাদা জায়গা রাখতেন। সেই চরিত্রকে পুরোদস্তুর কৌতুকশিল্পীর ছকে ফেলা যায় না। ছোটি সি বাত-এর নাগেশ গতানুগতিক ভিলেন নয়, অভিমান-এর চন্দরও নায়কের বশংবদ শাগরেদ নয়, খুন পসিনায় তো রীতিমতো আদর্শবান ‘সিরিয়াস’ চরিত্র। রাগনির্ভর ছবি আলাপ-এ গণেশি-র ভূমিকায় দুটো গানও গেয়েছেন এবং অভিব্যক্তির চমকপ্রদ প্রদর্শনীতে প্রমাণ করেছেন তিনি আসলে কে। ‘অভিনয়ের গুরুদেব’ ছিলেন গোবর্ধন আসরানী। জয়া বচ্চন, শাবানা আজ়মি, শত্রুঘ্ন সিন্হা তাঁর ছাত্র-ছাত্রী, নিজের শিক্ষাকেন্দ্র পুণের ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এফটিআইআই)’-র প্রধানও হয়েছেন। অমিতাভ-জয়া তাঁকে ‘স্যর’ ডাকতেন।
তাঁর আগের প্রজন্মের কৌতুকশিল্পীদের নামেই কিছু ‘ম্যানারিজ়ম’ মনে পড়ে। আসরানীর মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্যটি অমিল প্রশিক্ষণের গুণেই। এফটিআইআই-এর গোড়ার দিকের ছাত্র; ঋত্বিক ঘটক, মণি কউলের সঙ্গ করা আসরানী বলেছিলেন, “সকলে হাসতেন— অভিনেতা জন্মায়। অভিনয় কি শেখা যায়?” কিন্তু অতিথি-অধ্যাপক মোতিলাল তাঁদের বলেন, “এই কথাটা চলছে বলেই লোকে দিলীপকুমার, দেব আনন্দ, রাজ কপূরের অনুকরণকেই অভিনয় ভাবছে। নিজেদের গুণাগুণ আবিষ্কার করতে হবে।” ইনস্টিটিউটে সিনেমাশিল্পের খুঁটিনাটি তো বটেই ধ্যান, সাঁতার, কত্থক, গাড়ি চালানোর কোর্স পর্যন্ত করানো হত। হয়তো সে কারণে আসরানী যে কোনও চরিত্রে প্রায় গিরগিটির মতো নিজেকে বদলে ফেলতে পারতেন। অনেকেই বলেন, মেহমুদের পূর্ণ মূল্যায়ন ভারত করতে পারেনি। তাতেও মেহমুদকে নায়করা ভয় পেতেন, কারণ তিনি নাকি তাঁদের ম্লান করে দিতেন। আসরানী-র বিশেষত্ব প্রতিক্রিয়ায়। তিনি সহ-অভিনেতাকে যথেষ্ট পরিসর দেন, পরিস্থিতি হৃদয়ঙ্গম করেন, তার পর ম্যাজিক আনেন চোখে, বেতারের তালিম মেনে স্বরের ওঠানামায়, শরীরী ভাষ্যে। সত্যকাম-এ যেমন, পিটারের মুখে ছবির বিষয়বস্তু সংস্কারমুক্তির সংলাপ কত অনায়াস! গুড্ডিতে চরিত্রের পটপরিবর্তন আর সে বছরই গুলজ়ার-এর মেরে অপনে-তে তাঁর ঝাঁঝ অবাক করেছিল। সংযত ভাবেই, চরিত্রে সুন্দর তাল-ছন্দ-বর্ণের সৃষ্টি করে ফেলতেন। চোখ ধাঁধায় না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি স্ক্রিন ও মনের নজর কেড়ে নেয়। এফটিআইআই-এর অন্য প্রাক্তনী সদ্যপ্রয়াত সতীশ শাহ-ও একই ধাঁচের অবিশ্বাস্য ‘টাইমিং’ ও ‘ন্যাচারাল এনার্জি’-তে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে ওস্তাদ ছিলেন, এঁদের আগমনমাত্র মনে প্রশান্তি আর আনন্দ ভরে যেত। কারণ, কৌতুকের উৎস ছিল সারল্য।
হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায় ও বাসু চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও আর এক বাঙালির কাছে ঋণী গুজরাতের সুপারস্টার আসরানী। তাঁর পরিচালিত চলা মুরারী হিরো বননের গল্প লিখতে সাহায্য করেছিলেন তরুণ মজুমদার। ছবিটি অভিনেতার আত্মকথা-সম। শীর্ষে পৌঁছনোর পর যে বিষাদ, বিচ্ছিন্নতা, দ্বন্দ্ব দেখিয়েছিলেন, নিজেও তাতে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। একই ধরনের চরিত্রের প্রস্তাব, তায় একাধিক তারকার ছবির যুগ, নায়করাও কমেডিতে চলে আসছেন। কিছুটা দমে গিয়েছিলেন। কিন্তু, হিন্দি সিনেমার তাঁকে দরকার ছিল প্রবল দুঃসময়ে, আশির দশকে। বিশেষত দক্ষিণ-প্রযোজিত ছবিতে মেহমুদ, ধুমল, শোভা খোটে-র আদলেই গড়ে উঠেছিল নতুন ত্রয়ী— কাদের খান, আসরানী, অরুণা ইরানি। তামাশা শালীনতা ভঙ্গ করছিল, তবে আসরানী তা এড়াতে চেষ্টা করতেন। উদ্ভটতম কাণ্ডকারখানাতেও দর্শকের মন জয়ের আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁদের।
নব্বইয়ে তাঁকে স্বমহিমায় ফেরায় তকদিরওয়ালা। ইনস্পেক্টর অজগর সিংহ, প্রৌঢ়া বোনের বিয়ে দিতে উদ্গ্রীব যমনাদাস, ধামাল-এ বমনের পাপ্পা, ভুলভুলাইয়ার মুরারি কাকা, খট্টা মিঠায় ফোন ধরতে আর সাহায্যপ্রার্থীদের কথা শুনতে নাজেহাল শেঠজি— তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি এতই আরামদায়ক ছিল যে লক্ষ করা হয়নি প্রায় ছয় দশক ধরে বলিউডের কৌতুকক্ষেত্রে কী ভাবে পালাবদলের শরিক থেকেছেন। মেহমুদের উঁচু তারে বাঁধা রংতামাশা আর পরেশ রাওয়ালের বাস্তবমুখী রসিকতা— দুই যুগের মধ্যে আসরানী-র চরিত্রেরা সূক্ষ্ম কারুকার্যে ভরা সুসংহত সেতু। শর্মিলা ঠাকুর, ধর্মেন্দ্র, অমিতাভ বচ্চন ছাড়া, এত দিন সক্রিয় আর প্রাসঙ্গিক-ই বা কে? দীর্ঘ কেরিয়ারে অবিরাম নির্মল বিনোদন জুগিয়ে কালোত্তীর্ণ তিনি, কারণ তাঁকে নিয়ে নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম হেসেছে তাঁর সঙ্গে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)