Advertisement
২৬ নভেম্বর ২০২২
সরসঙ্ঘচালক এক বার বিলকিস বানোর সঙ্গে দেখা করবেন কি
Mohan Bhagwat

ভাগবতদের ভারতদর্শন

দিল্লির রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি আরএসএসের হৃদয় পরিবর্তন হচ্ছে? কংগ্রেস এক কদম এগিয়ে দাবি করেছে, এ সব রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’-র প্রভাব।

মোহন ভাগবত।

মোহন ভাগবত।

প্রেমাংশু চৌধুরী
শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৫:৩৯
Share: Save:

বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে ছিল জানিয়েও সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেওয়ার পরে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বলেছিলেন, এই শেষ। আরএসএস আর কোনও মন্দির আন্দোলনে জড়াবে না। রামজন্মভূমি আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গিয়েছে। আর নয়।

Advertisement

প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা খরচ করে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির কাজ ২০২৩-এর ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মোহন ভাগবত নিজেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে মন্দিরের শিলান্যাসে যোগ দিয়েছিলেন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে জানুয়ারিতে মকর সংক্রান্তির সময় রামমন্দিরের গর্ভগৃহে রামলালার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ বার কাশীর জ্ঞানবাপী মসজিদে পুজোর দাবি উঠেছে। ফের মামলা-মকদ্দমার পাহাড় জমছে। জুন মাসের গোড়ায় আরএসএসের প্রশিক্ষণ শিবির ‘শিক্ষা বর্গ’-এর সমাপ্তি অনুষ্ঠানে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বলেছিলেন, সব মসজিদে গিয়ে শিবলিঙ্গ খোঁজার দরকার নেই। তবে জ্ঞানবাপী মসজিদে পুজোর দাবি জানাতে মানা করেননি। তাঁর মতে, জ্ঞানবাপী হিন্দুদের বিশেষ আবেগ, শ্রদ্ধার বিষয়। বহিরাগত হামলাকারীদের মাধ্যমে এ দেশে ইসলাম এসেছিল। দেবস্থান ভাঙা হয়েছিল। তাই হিন্দুরা মনে করেন, সে সবের পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। তা বলে একে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বলা যাবে না। মুসলমানদেরও মনে করা উচিত নয় যে, এ সব তাঁদের বিরুদ্ধে হচ্ছে। কারণ আজকের মুসলমানদের পূর্বপুরুষরাও হিন্দু ছিলেন।

মোদ্দা কথা হল, অযোধ্যা, কাশী, মথুরা—যেখানেই মসজিদ ভেঙে মন্দির তৈরির দাবি উঠুক না কেন, মুসলমানদের মেনে নিতে হবে যে, এর পিছনে তাঁদের কোণঠাসা করার কোনও উদ্দেশ্য নেই। সবটাই হিন্দুদের ইতিহাস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। মুসলমানরা চাইলে এতে আনন্দিত হতে পারেন। কারণ তাঁদের পূর্বপুরুষরাও আদতে হিন্দু ছিলেন।

Advertisement

সম্প্রতি মোহন ভাগবত দিল্লিতে মুসলিম সমাজের বাছাই করা বিশিষ্ট জনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ইমামদের সর্বভারতীয় সংগঠনের প্রধান উমর আহমেদ ইলিয়াসির সঙ্গে দেখা করতে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ইলিয়াসি তো ভাগবতকে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে একই আসনে বসিয়ে ‘রাষ্ট্রপিতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। তার পরে পুরনো দিল্লির একটি মাদ্রাসাতেও গিয়েছিলেন ভাগবত।

দিল্লির রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি আরএসএসের হৃদয় পরিবর্তন হচ্ছে? কংগ্রেস এক কদম এগিয়ে দাবি করেছে, এ সব রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’-র প্রভাব। রাহুল গান্ধী বিজেপি-আরএসএসকে একই বন্ধনীতে নিয়ে এসে তাদের ‘বিভাজন, বিদ্বেষ, বৈর’-র নীতিকে আক্রমণ করছেন বলেই খোদ সরসঙ্ঘচালক নিজেদের ভাবমূর্তি বদলাতে চাইছেন। কংগ্রেসের দাবিকে এখনই গুরুত্ব না দিলেও চলে। কিন্তু ভাগবতের এই সক্রিয়তা সত্যিই আরএসএসের হৃদয় পরিবর্তনের ফল কি না, তা ভাবা দরকার। কারণ আরএসএসের নীতিতে বদল এলে তার প্রভাব নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকারের নীতিতেও পড়বে।

এ বছর মার্চে যোগী আদিত্যনাথের দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার পরে বিজেপিতে যখন উৎসবের মরসুম চলছে, ঠিক সেই সময়ই আমদাবাদে আরএসএসের অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা বসেছিল। সেই সভায় বার্ষিক রিপোর্ট পেশ হয়। তাতে ‘ধর্মীয় মৌলবাদ’-কে ‘গুরুতর চ্যালেঞ্জ’ তকমা দিয়ে বলা হয়েছিল, “ধর্মীয় উন্মাদনা প্রকাশের কর্মকাণ্ড, জনসভা, বিক্ষোভ বাড়ছে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণ উস্কে দিয়ে হিংসার জন্য উত্তেজনা ছড়ানো, অবৈধ কাজকর্মে মদত দেওয়ার অপকর্ম বাড়ছে।”

বলা বাহুল্য, হরিদ্বারের ধর্ম সংসদ থেকে মুসলিমদের গণহত্যার ডাক দেওয়ার দিকে আঙুল তুলে আরএসএস এ সব কথা বলেনি। যদিও মোহন ভাগবত তার নিন্দা করেছিলেন। আরএসএসের রিপোর্টের তির ছিল নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দিকে। মুসলিমদের নাম না করা হলেও রিপোর্টে বলা হয়েছিল, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের “সরকারি শাসনযন্ত্রে প্রবেশ করার বড়সড় পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে। এর পিছনে একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।” সংগঠনকে এককাট্টা করে, সক্রিয় ভাবে এর মোকাবিলার ডাক দিয়েছিল আরএসএস।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মোহন ভাগবত মুসলিম সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের কী ভাবে চলতে হবে। জেহাদ-এর ভাবনা থেকে সরে আসতে হবে। হিন্দুদের কাফির বলা চলবে না। মুসলিমদের বুঝতে হবে যে, তাঁরা ভারতীয়। মুসলিমরা যতই বলুন যে, তাঁরা নিজেদের ভারতীয়ই মনে করেন— হিন্দুত্ববাদীরা মানতে চান না। মুসলিমরা বলেন, কিছু লোক সন্ত্রাসবাদকে জেহাদ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। আসলে জেহাদের অর্থ নিজের অন্তরের সংশোধন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সাম্প্রতিক অতীতে কোনও মুসলিম রাজনীতিক বা বিশিষ্ট জন হিন্দুদের প্রকাশ্যে ‘কাফির’ বলে আক্রমণ করেছেন, এমন উদাহরণ নেই। কিন্তু পান থেকে চুন খসলেই মুসলিমদের ‘পাকিস্তানি’, ‘দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। ধর্ম সংসদ ডেকে মুসলিমদের গণগত্যার ডাক দিলে বলা হয়, ও সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিছু প্রান্তিক সংগঠনের কাজ। কিন্তু মুসলিম মৌলবাদী বা কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জেহাদের নামে হামলা চালালে, তার দায় গোটা মুসলিম সমাজকে নিতে হয়।

মুসলিমদের সম্পর্কে হৃদয় পরিবর্তন দূরের কথা। তাঁদের সম্পর্কে আরএসএসের মনোভাব বা নীতি খুবই স্পষ্ট ও নথিবদ্ধ। মোহন ভাগবত থেকে রাম মাধবের মতো আরএসএস নেতারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই কথাটাই বলেন। তা হল, মুসলিমদের হিন্দুদের ‘কাফির’ মনে করার ভাবনা থেকে সরে আসতে হবে। ‘জেহাদ’ ছাড়তে হবে। ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের সমস্ত মুসলিম একটি জাতির অঙ্গ বলে ‘উষ্মা’-র ভাবনা ত্যাগ করতে হবে। মুসলিমদের মেনে নিতে হবে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম আসার আগে তাঁরা হিন্দু ছিলেন। মুসলিম আক্রমণকারীদের ভারতে হামলার নিন্দা করতে হবে। হিন্দুরাও তা হলে আর দেবস্থান ভাঙার কথা তুলবে না।

এ এক বিচিত্র ফাঁদ। মুসলিমদের হয়ে কারা নিজেদের ভারতীয় বলে দাবি করলে ভাগবতরা তা মেনে নেবেন, তা কোনও দিনই স্পষ্ট হয় না। আর মেনে নেওয়ার পরেও যদি কেউ নতুন করে মসজিদ ভাঙার দাবি তোলে, তা হলে ভাগবতরা বলবেন, ওটা হিন্দু ভাবাবেগের বিষয়। কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু সংগঠনের কাজ। আরএসএসের বার্ষিক রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট, ভাগবতরা মুসলিমদের সমস্যা হিসেবেই দেখছেন। হিন্দুদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে মুসলিমদের কী কী করতে হবে, তা-ও তাঁরাই ঠিক করে দিচ্ছেন। তাঁরা চান, মুসলিমরা বৃহত্তর হিন্দু পরিচিতি গ্রহণ করুন। তবেই তাঁদের ভারতীয় বলে মেনে নেওয়া হবে। কারণ আরএসএসের কাছে ‘যাহা হিন্দু, তাহাই ভারতীয়’। সব ভারতীয়ই আদতে হিন্দু। সবাইকে নিয়েই হিন্দুরাষ্ট্রের ভাবনা।

এই ভাবনা নিয়েই মোহন ভাগবত ইমামদের প্রধান, মুসলিম সমাজের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দেখা করেছেন। কারণ, পয়গম্বরকে নিয়ে নূপুর শর্মার মন্তব্যের পরে মোদী সরকারকে ইসলামিক রাষ্ট্রগুলির রোষের মুখে পড়তে হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বার বারই ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। রুটিরুজির সমস্যা, অর্থনীতির বেহাল দশা থেকে নজর ঘোরাতে মন্দির-মসজিদের জিগির তোলা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ভাগবত অবশ্য মুসলিম সমাজের বাছাই করা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেছেন— প্রাক্তন আমলা, শিক্ষাবিদ, মোদী জমানাতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ ইমাম। তিনি বৃহত্তর মুসলিম সমাজের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেননি। মুসলিমদের মনের কথা শুনতে সরসঙ্ঘচালক বিলকিস বানোর সঙ্গে দেখা করবেন কি?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.