পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মরসুম এলেই একটি প্রশ্ন বার বার ওঠে— এ রাজ্যে ভোট জেতায় কোন প্রশ্ন? অর্থনীতির হাল, উন্নয়নের গতি, না কি অন্য কিছু? এক সময় এই রাজ্যে শ্রেণি ও বামপন্থী রাজনীতি ভোটের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করত। সাড়ে তিন দশকের বাম শাসনে ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও শ্রেণিভিত্তিক সংগঠনই ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকে সেই ছবি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে।
বিদ্যার্থ নটরাজন ও সোহম সাহুর সঙ্গে একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই পরিবর্তনের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য নিয়ে ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয়টি নির্বাচন— তিনটি বিধানসভা ও তিনটি লোকসভা— বিশ্লেষণ করেছি। যা পেয়েছি, তা একাধারে গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক। উল্লেখ্য যে, আমাদের বিশ্লেষণ কেন্দ্রভিত্তিক— ব্যক্তি স্তরে কে কোথায় ভোট দিলেন, তা আমরা জানি না। কোনও ভোটার ঠিক কোন কারণে কোন দলকে ভোট দিলেন, তার সরাসরি তথ্যও এই গবেষণায় নেই। তাই এই লেখায় যা বলছি, তা একটি সামগ্রিক প্রবণতা, ব্যক্তির মনোবৃত্তির কথা নয়। তবে, এই কেন্দ্রভিত্তিক বিশ্লেষণ নিজেই যথেষ্ট স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
২০১১-য় যখন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল, তখন বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত এবং দলের ভোটের মধ্যে তেমন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু ২০১৬-র পর থেকে ছবিটা পাল্টেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে আমাদের তথ্য বলছে, যে কেন্দ্রে মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত বেশি, সেখানে তৃণমূলের ভোট এবং জয়ের সম্ভাবনা উভয়ই উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। একই ভাবে, সেই কেন্দ্রগুলিতে বিজেপির ভোট ও জয়ের সম্ভাবনা কমেছে।
এই বিভাজন কিন্তু ২০১১-১৬ পর্বে তেমন ছিল না— অর্থাৎ এটি কোনও স্থায়ী বৈশিষ্ট্য নয়, বরং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক প্রবণতা। আমাদের হিসাবে, মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত তুলনামূলক ভাবে বেশি, এমন বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১৯ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট প্রায় ৬-৭ শতাংশ-বিন্দু বেশি হতে দেখা যায়। রাজ্যে তৃণমূলের গড় ভোট প্রায় ৪৪%— সেই হিসাবে ৬-৭ শতাংশ-বিন্দুর পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু মুর্শিদাবাদ, মালদহ বা উত্তর দিনাজপুরের মতো সর্বোচ্চ মুসলমান-অধ্যুষিত কেন্দ্রেই নয়, মধ্যম মাত্রার মুসলমান জনসংখ্যার কেন্দ্রেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তা হলে কি তৃণমূল শুধুমাত্র মুসলমান-ভোটের জোরেই জিতছে? পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে অনেকগুলিই মূলত হিন্দু-অধ্যুষিত। ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭১% হিন্দু এবং ২৭% মুসলমান। অর্থাৎ, যে সব কেন্দ্রে মুসলমান ভোটার সংখ্যালঘু, সেখানে শুধু মুসলমান-ভোটের উপর ভর করে তৃণমূল জিততে পারত না। হিন্দু-প্রধান কেন্দ্রে তৃণমূল জিতছে কী ভাবে? গবেষণায় দেখা গেছে, হিন্দু-প্রধান কেন্দ্রেও একটি স্পষ্ট অর্থনৈতিক বিভাজন কাজ করছে। যে কেন্দ্রে প্রান্তিক কৃষি শ্রমিকের অনুপাত বেশি— অর্থাৎ, যাঁরা বছরে ১৮০ দিনের কম কাজ পান, এবং অর্থনৈতিক ভাবে সবচেয়ে বিপন্ন— সেখানে তৃণমূল তুলনামূলক ভাবে ভাল ফল করছে। অপর দিকে, যে কেন্দ্রে মূল কৃষি শ্রমিকের (যাঁরা বছরে ১৮০ দিনের বেশি কাজ পান) অনুপাত বেশি, সেখানে বিজেপি বেশি শক্তিশালী। অর্থাৎ, জনসংখ্যায় হিন্দু-মুসলমান অনুপাত প্রায় সমান, এমন দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রের একটিতে যদি বেশি গরিব ও অনিয়মিত মজুর থাকেন, আর অন্যটিতে স্থিতিশীল কৃষিজীবী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী পরিবার বেশি থাকে, তা হলে প্রথমটিতে তৃণমূল এগিয়ে, দ্বিতীয়টিতে বিজেপি।
অর্থাৎ, হিন্দু ভোটারদের মধ্যে অর্থনৈতিক ভিত্তিতে বিভাজনটি স্পষ্ট— দরিদ্র হিন্দু ভোটার তৃণমূলের দিকে, অপেক্ষাকৃত সচ্ছল হিন্দু ভোটার বিজেপির দিকে। জাতি ও শিক্ষার ভিত্তিতে এই বিভাজন স্পষ্ট নয়, কিন্তু অর্থনৈতিক দুর্বলতার সূচকে তা স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। বলা চলে যে, পশ্চিমবঙ্গে একটি সম্পূর্ণ ও একজোট ‘হিন্দু ভোট’ এখনও গড়ে ওঠেনি। হিন্দু ভোটারদের মধ্যে শ্রেণিগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এখনও একটি ভূমিকা পালন করছে।
এক দিকে মুসলমান ভোটের একত্রীকরণ, এবং অন্য দিকে দরিদ্র হিন্দু ভোট ধরে রাখা— তৃণমূল কংগ্রেসের এই দু’টি ‘সাফল্য’ থেকে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। রাজ্য সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী-র মতো প্রকল্পগুলি মূলত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। এই সুবিধাভোগীদের মধ্যে বহু প্রান্তিক কৃষিশ্রমিক পরিবার রয়েছে। কেন্দ্রীয় শাসনের পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে এই মানুষগুলির কাছে রাজ্য সরকারের কল্যাণ যোজনার নিশ্চয়তা অনেক বড় বিষয়— ভোটের বাক্সে তারই প্রতিফলন ঘটছে। আবার, কেন্দ্রীয় সরকারের স্পষ্টত মুসলমানবিরোধী নীতি, সিএএ-এনআরসি’র মতো রাজনৈতিক পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমান ভোটারদের কাছে তৃণমূলের প্রতি সমর্থনই যেন ‘বাঁচার রাজনীতি’ হয়ে উঠেছে। এই একত্রীকরণ নিছক পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে নয়, বরং বৈষম্য ও আতঙ্কের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অন্য দিকে, বাংলার হিন্দু পরিচয়ের মধ্যেও একটি আঞ্চলিকতার টান আছে— হিন্দি-হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক অস্মিতার পক্ষে একটি ঝোঁক। এই জটিল মিশ্রণেই টিএমসি-র রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি।
এই রাজনৈতিক প্রবণতা যদি সত্য হয়, তবে তা পশ্চিমবঙ্গকে কোন পথে নিয়ে যেতে পারে? প্রথমত, যদি ধর্মীয় পরিচয় ক্রমশ ভোটের প্রধান নির্ধারক হয়ে ওঠে, তা হলে দলগুলো সমাজের মধ্যে বিভেদ আরও গভীর করার প্রণোদনা পাবে। রাজনৈতিক মঞ্চে ধর্মীয় উৎসবের রাজনীতিকরণ, সাম্প্রদায়িক টানাপড়েন এবং পরিচয়কেন্দ্রিক বাগাড়ম্বর বাড়তে পারে। শাসনের মান, দুর্নীতির প্রশ্ন, কর্মসংস্থান— এই বিষয়গুলো পরিচয়ের আবেগের তলায় চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়ত, যখন পরিচয়ের রাজনীতি প্রবল হয়, তখন মানুষ অনেক সময় নিজের বস্তুগত স্বার্থের বিরুদ্ধেও ভোট দেন। গরিব মানুষ যদি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এমন দলকে সমর্থন করেন, যে দল তাঁর অর্থনৈতিক সুবিধার কথা ভাবে না— তা হলে প্রকৃত জবাবদিহিতা কমে যায়। ক্ষমতাসীন দল যদি জানে যে, ভোটাররা অন্য কোথাও যাবেন না, তাতে শাসনের মান হ্রাস পেতে পারে।
তবে পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটি একমাত্রিক নয়। ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাম দলের ভোট যে ভাবে ধুয়ে গেছে— রাজ্যে তাদের গড় ভোট ৪০ শতাংশের উপর থেকে কার্যত এক অঙ্কে নেমে এসেছে— তা দেখায় যে, পুরনো শ্রেণিভিত্তিক জোটবদ্ধতা ভেঙে গেছে। কিন্তু মুসলমান ঐক্য এবং দরিদ্র হিন্দুর অর্থনৈতিক স্বার্থের মেলবন্ধন এখনও পুরোপুরি একটি সমান্তরাল হিন্দু ভোটে পরিণত হয়নি। এটা একটু স্বস্তির, কিন্তু এই ভারসাম্য কতটা স্থায়ী তা এই নির্বাচনেও পরীক্ষিত হবে।
নির্বাচন শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, সমাজের গভীরতম উদ্বেগ ও প্রত্যাশার প্রকাশ। পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা প্রতিটি নির্বাচনে জানাচ্ছেন, তাঁরা কোন ভবিষ্যৎ চান। আমাদের গবেষণা বলছে, সেই ভবিষ্যতের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে— কিন্তু দারিদ্র ও অর্থনৈতিক সুরক্ষাহীনতা এখনও খুব বড় প্রশ্ন। এক দিকে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, আর অন্য দিকে অর্থনৈতিক প্রশ্ন— এই দু’টি শক্তি কী ভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশছে, সেটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সবচেয়ে জটিল ও আকর্ষণীয় প্রশ্ন। আমাদের দায়িত্ব, সেই সঙ্কেত মনোযোগ দিয়ে পড়া— এবং সতর্ক থাকা, যাতে পরিচয়ের রাজনীতি গণতন্ত্রের প্রকৃত জবাবদিহিতাকে গ্রাস না করে।
অর্থনীতি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)