বাংলার রাজনীতিতে দুয়ারে নির্বাচন এলেই উন্নয়ন তরজা শুরু হয়ে যায়। সম্প্রতি সুন্দরবনের উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের রাজ্যকে খোঁচা দেওয়া মন্তব্য থেকে এমনই এক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মন্ত্রীমশাই তাঁর পাঁচ বছরের মন্ত্রিত্বকালে এই প্রথম বার সুন্দরবনে আসার সময় পেলেন। কেন এত দিনে তাঁর পৃথিবীবিখ্যাত বনাঞ্চলে আসার সময় হল, সে এক অন্য প্রশ্ন। তবে এসেই তিনি বুঝে ফেলেছেন ও সাংবাদিকদের বলেছেন যে, রাজ্যের ক্ষমতাসীন সরকার সুন্দরবনের সঠিক ভাবে উন্নয়ন করেনি, ফলে তা শ্লথ হয়েছে। স্বভাবতই রাজ্যের তৃণমূল সরকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মন্তব্যের বিরোধিতা করে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে সুন্দরবনের উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছাকে ঘিরে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রীকে কাছ থেকে বেশ কয়েক বছর দেখার অভিজ্ঞতা বলে যে, সাংবাদিক সম্মেলনে হঠাৎ করে কোনও কথা বলে ফেলার লোক উনি নন। অর্থাৎ সুন্দরবনে বাঘ এবং হাতি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্তরের মিটিং করার পাশাপাশি যে উনি এখানকার উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন যে তুলবেন, সেটা আগেই ঠিক করা ছিল। এটা ওঁর আত্মোপলব্ধির খতিয়ান নয়, নবলব্ধ জ্ঞানের প্রকাশ নয়, নির্বাচনী বাজারের কুশলী চাল। ভূপেন্দ্র যাদব কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি বাংলার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য বিজেপিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে এও মনে রাখতে হবে, প্রায় গোটা সুন্দরবন তৃণমূলের গড় হিসাবে পরিচিত, যেখানে বিজেপি ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এই তথ্যগুলি মনে রাখলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পিছনের অঙ্কটা বেশ দুয়ে দুয়ে চার হয়ে স্পষ্টতা পায়।
তবে রাজনীতির কূটতর্কে আসল বিষয়টার গুরুত্ব চাপা পড়ে যায় না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মন্তব্যের পিছনে কারণ যা-ই হোক না কেন, এ নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ থাকেন যে সুন্দরবনে, সেখানকার উন্নয়ন এখনও অবধি অনেকটাই পিছনের সারিতে। কিছুটা বাম আমলে, ও পরবর্তী কালে বর্তমান তৃণমূল সরকারের সময়ে নিশ্চিত ভাবেই সুন্দরবনে ইট, কাঠ, পাথরের পরিকাঠামো উন্নয়ন বেশ খানিকটা হয়েছে। বেশ কিছু ব্রিজ হয়েছে, রাস্তা আগের তুলনায় সাধারণ ভাবে অনেকটাই ভাল। বিদ্যুতের লাইন এসেছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সামাজিক উন্নয়নে এখনও পিছিয়ে।
তথ্য বলছে, সুন্দরবন শিক্ষায় রাজ্যের অনেক অঞ্চল থেকে এগিয়ে থাকলেও জীবিকার ক্ষেত্রে অনেক পিছনে। তার পর পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কারণে এখানকার গোটা অঞ্চল জুড়ে নিয়ম করে সাইক্লোন ঝাঁপিয়ে পড়ে— দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সঙ্গে আকাশভাঙা বৃষ্টি আর বাঁধভাঙা বন্যা তো আছেই। অনেক ক্ষেত্রেই তার সঙ্গে উত্তুঙ্গ জোয়ারের যুগলবন্দি। কাছাকাছি থাকা বঙ্গোপসাগরের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে ক্রমেই জমিক্ষয় বাড়ছে। গত ছয় দশকে গোটা সুন্দরবন অঞ্চলে প্রায় ২১০ বর্গকিলোমিটার জলের তলায় গেছে; যা কিনা কলকাতা শহরের থেকেও বড় অঞ্চল!
সুন্দরবনে যে কোনও চায়ের দোকানে দশ মিনিট আড্ডা দিলেই আপনি অন্তত এমন একটি পরিবার পাবেন, যারা গত কুড়ি বছরে অন্তত চার বার বাড়ি পাল্টাতে বাধ্য হয়েছে। জীবিকার সঙ্কটের কারণে প্রতি দশটি পরিবারের সাতটিতে এক বা একাধিক পুরুষ, কখনও বা মহিলারাও, সুন্দরবনের বাইরে, বহু ক্ষেত্রে রাজ্যের বাইরে। অধিকাংশ বাড়িতে পড়ে রয়েছেন সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধবৃদ্ধা, মহিলা ও শিশুরা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যে গোটা একটা প্রজন্ম, আজ যাদের বয়স ১২ থেকে ১৬, তারা বেড়ে উঠছে কখন পরের ঝড় আসবে সেই ভীতি নিত্যসঙ্গী করে। রবীন্দ্রনাথ এদের দেখলে হয়তো লিখতেন ‘চিত্ত যেথা ভয়পূর্ণ’! ফলে সুন্দরবনের উন্নয়ন, এবং তাতে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে ম্যানগ্রোভ লাগানোর নামে। প্রশ্ন তোলা যায়, যেখানে ম্যানগ্রোভ এমনি এমনি হওয়াটাই দস্তুর, কিছু সরকারি দফতর ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে না দিয়ে কি প্রকৃত টেকসই উন্নয়নে সে টাকা খরচ করা যেত না? ভাবা যেত না কি স্বাস্থ্যসাথীর মডেলে ওখানকার মানুষের জন্য জলবায়ু সাথী বিমা বা ওড়িশার মতো বাড়ি প্রতি অন্তত একটা বিপর্যয় প্রতিরোধী ঘর তৈরি করার? ভাবা কি যেত না, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুঝতে পারে এমন জীবিকায় উৎসাহ দেওয়ার? বা, গোসাবা বা মৌসুনির মতো সুন্দরবনের নানান অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ কাটার ব্যবসা কড়া হাতে বন্ধ করা?
তবে কিনা, এ সব দায়িত্বের একটা ভাগ কেন্দ্রীয় সরকারের উপরেও বর্তায় বইকি। সারা পৃথিবীর কাছে বিখ্যাত এই বনাঞ্চলকে বাঁচানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার যে তেমন কিছুই করেনি— এ তথ্য তো অজানা নয়। সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ, তবুও কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যের তালিকায় তৃতীয় স্থানে সুন্দরবন, আর প্রথম স্থানে অনেক পিছিয়ে থাকা গুজরাত! প্রশ্ন কি তোলা যায় না সেটা নিয়েও?
বাঘের সংরক্ষণের আর্থিক সাহায্যের ক্ষেত্রেও অবস্থা তথৈবচ। বস্তুত সুন্দরবনের বিপর্যয় প্রতিরোধ, জীবিকার উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য বিশ্ব ব্যাঙ্কের সঙ্গে ৭০-৩০ শতাংশ ভাগাভাগির হিসাবে একটি ৪১০০ কোটি টাকার প্রকল্প রাজ্য ক্যাবিনেটে প্রায় দেড় বছর আগে পাশ হয়েছে, কিন্তু কেন্দ্রের দফতরগুলিতে আবশ্যিক অনুমতির জন্য তা ঘুরপাক খাচ্ছে বহু দিন, এখনও।
উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুন্দরবনের পর্যটন প্রসঙ্গ তুলেছেন। মন্ত্রীর প্রশ্ন রণথম্ভোরের জঙ্গলে প্রায় উনিশ লক্ষ পর্যটক গেলেও সুন্দরবনে সে সংখ্যা নয় লক্ষ ছাড়ায় না কেন? সুন্দরবনে পর্যটন বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না, সেটা একটা জরুরি প্রশ্ন। কিন্তু যদি মনে করা যায় যে তার প্রয়োজন আছে, এবং তার সঙ্গে অঞ্চলের উন্নয়নের যোগ আছে— সে ক্ষেত্রেও মনে রাখতে হবে— অন্তত দেশের পরিবেশমন্ত্রীকে মনে রাখতেই হবে যে, দেশের অন্য কোনও জঙ্গলের সঙ্গে সুন্দরবনকে এক করা যায় না। এই জঙ্গলের চরিত্র একেবারে আলাদা। এখানে মূলত নদীকেন্দ্রিক পর্যটন হয় এবং স্বভাবতই অন্য জঙ্গলের তুলনায় বাঘের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই বাঘ দেখার জন্য পর্যটক কম আসাটাই স্বাভাবিক। মনে রাখতে হবে চলাচলের জন্য কতখানি অসুবিধাজনক এখানকার পরিবেশ। ইতিমধ্যেই যথেচ্ছ নিয়মভাঙা পর্যটনের কারণে সুন্দরবন বিপন্ন, নানা দূষণে জর্জরিত, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে। জানা প্রয়োজন, সুন্দরবনের জঙ্গল কত পর্যটকের জন্য উপযুক্ত, কেমন ধরনের পর্যটন এই বনাঞ্চলের জন্য সঠিক। পাশাপাশি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন পর্যটন বাড়াতে গিয়ে সুন্দরবনের ‘ইকোসিস্টেম’ বা প্রকৃতিপ্রদত্ত সুবিধায় কোনও খামতি না হয়। নতুবা ক্রমশ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নই আক্রান্ত হবে!
আর এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন অনেকে। আন্দামান নিকোবর, আরাবল্লীর পর কি এ বার সুন্দরবনের উপর উন্নয়নের খাঁড়া নামতে চলেছে পর্যটনের হাত ধরে? বাম আমলে বুদ্ধদেববাবুর সময় সুন্দরবনে এক মেগা পর্যটনের পরিকল্পনা করেছিল একটি ব্যবসায়িক কোম্পানি। কিন্তু নানা বিরোধিতা এবং শেষে রাজনৈতিক অঙ্ক না মেলায় তা বাতিল হয়। আবার কি এমন কিছুর পরিকল্পনা হচ্ছে বৃহৎ পুঁজির হাত ধরে? রাজনীতির অঙ্কের পাশাপাশি কি তারই সঙ্কেত দিয়ে গেলেন কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী?
ভবিষ্যৎ তা বলবে। ইতিমধ্যে উন্নয়ন নিয়ে ‘আমরা-ওরা’ লড়াই থাকুক, হাজার হোক ভোটের জন্য এই সব লড়াই-ই তো মোক্ষ। কিন্তু সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের ভবিষ্যৎকে শিকেয় তোলা চলবে না— এই সার কথাটা কেন্দ্র-রাজ্য দুই পক্ষকেই মানতে হবে। উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতির লড়াই হোক, কিন্তু রাজনীতির জন্য উন্নয়নের লোকদেখানো লড়াই অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)