E-Paper

মহুয়া ফুলে নতুন দিগন্ত

মহুয়ার ফুল থেকে তৈরি হয় মহুয়া মদ। এর বিশেষত্ব হল, মহুয়া ফুলকে দেশীয় উপায়ে গেঁজিয়ে বা ফারমেন্টেশন-এর সাহায্যে মদ তৈরি করা হয়। তাই এই পানীয়ের স্বাদ অনন্য।

দেবাশিস মিথিয়া

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৫ ০৫:৫৩

আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল,/ নামুক মহুয়ার গন্ধ”— সমর সেনের কবিতার এই পঙ্‌ক্তিটি যেন জনজাতি জীবনের সঙ্গে মহুয়ার গভীর সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। ভোরের অন্ধকারে মহুয়া গাছের নীচে ঝরে পড়া ফুল কুড়োতে কুড়োতে নিশা বেলে ভাবে, এই ফুলই তার সংসারের আলো, তার সন্তানের ভবিষ্যৎ। মিষ্টি গন্ধের মহুয়া ফুল মাটিতে পড়লে মানুষের মুখে হাসি ফোটে। এই ফুল জনজাতি সমাজের আয়ের প্রধান উৎস।

মহুয়ার ফুল থেকে তৈরি হয় মহুয়া মদ। এর বিশেষত্ব হল, মহুয়া ফুলকে দেশীয় উপায়ে গেঁজিয়ে বা ফারমেন্টেশন-এর সাহায্যে মদ তৈরি করা হয়। তাই এই পানীয়ের স্বাদ অনন্য। নতুন ধরনের পানীয় হিসেবে মহুয়া সম্প্রতি বনভূমির গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের ওয়াইন অনুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যার উদাহরণ ইন্দো-ফরাসি সহযোগিতায় তৈরি ‘এমএএইচ স্পিরিট’। আন্তর্জাতিক বাজারে মহুয়ার এই কদর দেখে শিল্পপতিরা মনে করছেন, মহুয়া বিশ্ব বাজারে নিজের আলাদা জায়গা করে নিতে পারবে।

মহুয়া গাছের ফুলে ৬৮% থেকে ৭২% শর্করা থাকে, যা মহুয়া মদের মূল ভিত্তি। এ ছাড়াও এই গাছের বীজ থেকে পাওয়া যায় রান্নার জন্য মূল্যবান তেল এবং বায়োডিজ়েল। ফল থেকে মেলে আঠা, বাকল থেকে তৈরি হয় দড়ি ও মাদুর। আর পাতা দিয়ে তৈরি হয় পরিবেশবান্ধব থালা, বাটি। ব্যবহারিক দিক ছাড়াও মহুয়া গাছের ভেষজ গুণও অনস্বীকার্য। ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়ার মতো রোগের চিকিৎসায় একে ব্যবহার করা হয়। এটি ভারতের একটি কার্যকর ও মূল্যবান উদ্ভিদ।

ব্রিটিশ আমলে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে মহুয়া মদের জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন রাজ্য সরকারগুলি এটিকে ‘হেরিটেজ লিকার’-এর স্বীকৃতি দিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ছত্তীসগঢ় সরকার ২০২২ সালে মহুয়া মদ বিক্রির লাইসেন্স অনুমোদন করেছে। সরকারের অনুমান, এর ফলে রাজ্যের কোষাগারে প্রতি বছর বাড়তি ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব জমা হবে। মধ্যপ্রদেশ সরকারও এটিকে ‘হেরিটেজ লিকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে সেখানে মহুয়া মদের পেটেন্ট নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ মহুয়া মদকে ‘ফারমেন্টেড হেরিটেজ ড্রিঙ্ক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন স্টার্টআপ কোম্পানি মহুয়াকে প্রিমিয়াম লিকার হিসেবে বাজারজাত করছে। ‘মহুয়া-নিউট্রি-বেভারেজ’-এর মতো নতুন পানীয় বাজারে এসেছে। জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইটগুলিতে মহুয়া-জাত পণ্য কেনাবেচা চলছে। এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভলপমেন্ট অথরিটি-র মাধ্যমে মহুয়া ফুল বিদেশের বাজারে রফতানি হচ্ছে। পৌঁছে যাচ্ছে ছত্তীসগঢ় থেকে প্যারিস কিংবা মধ্যপ্রদেশ থেকে লন্ডনে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জনজাতি সম্প্রদায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে। ইন্ডিয়া বিজ়নেস অ্যান্ড ট্রেড-এর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, হয়তো অচিরেই ‘ভারতের জাতীয় পানীয়’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে মহুয়া মদ।

২০১৯ সালের মুম্বই স্কুল অব ইকনমিক্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি-র সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু পূর্ব বিদর্ভেই ১.১৫ লক্ষ মেট্রিক টন মহুয়া সংগৃহীত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। মধ্যপ্রদেশের রাতামাটি গ্রামের জনজাতিভুক্ত বহু মানুষ এপ্রিল মাস জুড়ে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মহুয়া ফুল সংগ্রহ করেন। এক কেজি ফুল সংগ্রহ করতে এক ঘণ্টা খাটতে হয়। দিনে ৫-৬ কেজি ফুল সংগ্রহ করে তাঁরা ১৫০-৩০০ টাকা আয় করেন। এই আয় তাঁদের সংসারের প্রধান অবলম্বন, যদিও পরিশ্রমের নিরিখে তা নেহাতই সামান্য। ফুল ছাড়াও মহুয়ার ফল, বীজ, পাতা ও বাকল বিক্রি করেও কিছু রোজগার হয়। মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র সরকার মহুয়া ফুল থেকে মদ তৈরি এবং তার বিক্রিতে আইনি সিলমোহর দেওয়ায় এখানকার জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ এখন নিশ্চিন্তে এই পানীয় বেচে অর্থ উপার্জন করতে পারছেন। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় সরকার মহুয়া ফুলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য করেছে, যা সেখানকার জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। মধ্যপ্রদেশে মহুয়া মদের কারখানা তৈরির উদ্যোগ চলছে।

তবে, বেশ কিছু সমস্যাও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ফুলের উৎপাদন কমছে। ফড়েদের দাপটে জনজাতি গোষ্ঠীরা কম দামে ফুল বেচতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাঁদের নেই, আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিও তাঁদের অজানা— সব মিলিয়ে মহুয়ার পুরো সুবিধা ঘরে তুলতে তাঁরা ব্যর্থ। আছে কর্পোরেট আগ্রাসনও। মহুয়া লিকারের বিশ্বায়নের নামে বহুজাতিক সংস্থার প্রবেশে পিছিয়ে-পড়া জনজাতিরা কিছুটা বিপন্ন, তবে সমবায় সমিতি গঠন, মহুয়ার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ ও প্রয়োগ, এবং আধুনিক বিপণন পদ্ধতি তাঁদের সঙ্কট কাটাতে পারে।

মহুয়াকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে জিআই ট্যাগ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এই ট্যাগ মহুয়ার উৎপাদন ও গুণমান ঠিক রেখে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়িয়ে জনজাতিদের বাড়তি আয় সুনিশ্চিত করতে পারে। দার্জিলিং চা বা তুলাইপাঞ্জি চালের মতো জিআই ট্যাগ মহুয়ার ঐতিহ্য রক্ষা করে বিপণনের নতুন দরজা খুলে দেবে, আশা থাকুক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Medical Science Liquor GI Tag

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy