মাঠে গ্রীষ্মের ধান পোঁতা শুরু হয়েছে। অনেক জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের আগমন ঘটেছে কাজের সূত্রে। স্কুল থেকে ফেরার পথে এমনই এক মহিলাকে বলতে শুনলাম, “আমরা কাজ করি বলেই বাবুরা টাকা দেয়। ডাকার সময় ভাল কিছু বলতে পারে। ‘মেঝেন’ বা ‘মাঝি মুনিশ’ বলে কেন!” সত্যিই তো! কাজ করে পয়সা পায়, দয়া বা দানের বিনিময়ে পায় না। এ-সব ভাষা শুনবে কেন।
শুরুটা এই জনজাতিভুক্ত মানুষের পরিচয় দিয়ে করা হোক। বাড়ি ঝাড়খণ্ড, প্রতি বছর চাষের সময় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আগমন ঘটে তাঁদের, কাজ শেষ হলে ফিরে যান। শুধু পুরুষ ও মহিলারা আসেন না, সঙ্গে ছেলেপুলেরাও থাকে। ধান পোঁতা এবং কাটার সময় স্থানীয় লোকের অভাবের জন্য ডাক পড়ে। তা ছাড়া খুব সস্তায় পাওয়া যায়। এখন ধান কাটার মেশিন আসার জন্য, ধান কাটার মরসুমে কাজের চাহিদা কিছুটা কমেছে। তবে ধান পোঁতার কাজে আজও তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম। মোটামুটি ধান কাটার সময় ফসল কাটা, ঝাড়াই করা, পালুই তৈরি এবং ধান পোঁতার সময় বীজ মারা, বপন করা— শেষ অবধি থাকতে হয়। বাবুদের বাড়ির আশপাশে বা মাঠের ধারে বাঁশ, কঞ্চি, খড় দিয়ে তাঁবুর মতো তৈরি করে বাস করেন তাঁরা। সাপ, পোকামাকড়, মশা দৈনন্দিন সঙ্গী হয়ে ওঠে। থাকার জায়গা মানুষের বসবাসযোগ্য না, তা সত্ত্বেও কোনও রকমে ওই সময়টুকু কাটিয়ে দেন। সেখানেই রান্না, স্নান, মলমূত্র ত্যাগ, সবই।
বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন মহিলা এবং শিশুরা। মহিলাদের ফাঁকা স্থানে স্নান, মলমূত্র ত্যাগ সবই করতে হয়। ছেলেপুলেদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়, খাবারও ঠিকমতো জোটে না। শরীরের হাল দেখলেই বোঝা যায় কতটা অপুষ্টিতে ভোগে। কাজের সময় দিনে দু’বার ভাত জোটে, অন্য কিছু জোটেও না। মাঝেমধ্যে মুড়ি, চপ খায়। বাচ্চারা মাসের পর মাস স্কুল যেতে পারে না। বাড়িতে বড় ছেলেমেয়েদের রেখে আসেন, তারাও কাজের ওই ক’দিন স্কুলে যেতে পারে না। কাজের সময় খুব ছোট শিশুদের মাঠের আলে গামছা পেতে শুইয়ে দেন। একদা এক শিশুকে শিয়ালে টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মহিলাদের শারীরিক হেনস্থার শিকারও হতে হয়। বাবুরা কাজ বোঝেন, এঁদের অসুবিধার দিকে কোনও দিন নজর দেন না।
এ-সব সত্ত্বেও কাজে বাবুদের নিরাশ করেন না তাঁরা। যা কাজ বলেন, করে দেন। ভোরে ওঠে রান্না করে, ভাত-তরকারি নিয়ে মাঠে হাজির হন। জমির আলে বসে খাবার খাওয়া, বিশ্রাম, সব করেন। কাজে কোনও কমতি নেই। এই হচ্ছে দৈনন্দিন সূচি। বছরের পর বছর প্রত্যেক মরসুমে এই কাজ। বংশপরম্পরায় কাজ করতেও দেখা যায় অনেক মানুষকে। এক সময় যে ছেলেপুলেরা বাবা-মায়েদের সঙ্গে ছোটবেলায় আসত, তারা বড় হয়ে সেই গ্রামেই কাজে আসে।
বর্তমানে কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে, দালালদের আগমন বেশি ঘটছে। কাজের সূত্রে পুরুষেরা অন্যান্য রাজ্যে যাওয়ার ফলে, এ রাজ্যে কাজের সময় মহিলাদের আগমন ঘটে বেশি। কাজের দরুন টাকার পরিবর্তে খাদ্যশস্য নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বাড়িতে পুরুষেরা না-থাকার জন্য প্রায়ই খাবারের অভাব দেখা যায়, সেই অভাব মেটানোর কাজে টাকার চেয়ে খাদ্যশস্যের প্রয়োজন বেশি হয়। এক মরসুমে আয় যা হয়, তাতে বেশি দিন চলে না। তাঁরা জানেন, চাল-আলু একটু থাকলে ফুটিয়ে খেতে পারবেন। দালাল-চক্র এক দিকে বোকা বানায়, অন্য দিকে বাবুরাও ঠকিয়ে নিতে পিছপা হন না। মদের লোভ দেখিয়ে অনেকে বিনামূল্যেও কাজ করিয়ে নেন।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, এঁদের কি এই দীর্ঘ পরম্পরা থেকে বেরোনোর রাস্তা ছিল না? তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা এবং জমি, দুটোই নেই। ২০১১-র জনগণনা অনুসারে ঝাড়খণ্ডের জনজাতিভুক্তদের শিক্ষার হার ৫৭.১ শতাংশ, যা ভারতের জনজাতিভুক্তদের (৫৯ শতাংশ) তুলনায় কম। বর্তমানে খুব বেশি বেড়েছে বলে মনে হয় না। উচ্চশিক্ষার অবস্থাও খুব ভাল নয়। কাজের সুযোগও নিজ রাজ্যে খুব বেশি নেই বলে, বর্তমানে পুরুষরা অন্যান্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। পড়াশোনার অবস্থা ভাল না হওয়ার জন্য তাঁদের অন্যান্য কাজেও নেওয়া হয় না।
সব অপমান সহ্য করেও বাবুদের মুনাফা বাড়িয়ে তুলছেন তাঁরা, একটু ভাল সম্বোধন শুনতে পাওয়ার উপযুক্ত বলে কি ওঁদের মনে হয় না? এ-সব বললেই বাবুরা বলে ওঠেন, ওরা তো ‘তুই’ ডাকটাই পছন্দ করে। আবার যদি বলা হয়, তাঁদের কি কখনও এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে? উত্তরে বলে থাকেন, আমার বাপ-ঠাকুরদারা এই বলেই দীর্ঘদিন ডেকে আসছেন, কোনও দিন এই নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। আসলে সব কিছু উপর থেকে চাপিয়ে দিলে যা হয়। দীর্ঘদিনের পরম্পরাকেই বাবুরা মান্যতা দিতে চান, সে সমাজ যতই এগিয়ে যাক। মানুষ আজকাল লিখতে-পড়তে শিখেছে, কিন্তু সম্মানের জায়গায় পিছিয়ে আছে। এখনকার শিশুরাও বড়দের মুখে শুনে শুনে ‘মাঝি মুনিশ’, ‘মাঝি’ বা ‘মেঝেন’ বলতে শিখে গিয়েছে। বড়রা এই নিয়ে কোনও দিন প্রতিবাদও করেন না। প্রতি বছর এ-সব শুনে ঝাড়খণ্ড ফিরে যান, পরের বার কাজের মরসুমে সেই গ্রামেই হাজির হন। পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার সংক্রান্ত অনেক খবর বর্তমানে মিডিয়া বা সমাজমাধ্যমে দেখা যায়, কিন্তু এই জনজাতিভুক্ত মানুষদের নিয়ে কেউ মুখ খোলে না।
এই সমস্যা ঝাড়খণ্ডের জনজাতিভুক্ত মানুষের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের জনজাতিভুক্ত মানুষকেও সহ্য করতে হয়। দলিত সম্প্রদায়ের লোকজনও পিছিয়ে নেই। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু আদিবাসী ও তফসিলি জাতির লোকজনকে ‘ছোটলোক’ বলে সম্বোধন করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। নাম বা পদবি ধরে ডাকার প্রবণতা বেশি। বয়সে ছোটদের নাম ধরে বা ‘তুই’ বলে তবু যদি ডাকা চলে, বড় বা প্রবীণদের নাম ধরে ডাকাটা যুক্তিযুক্ত নয়। ডোম, বাগদি, হাড়ি, বাউরি জাতির লোকজনকে ডাকার সময় বেশির ভাগই নাম ধরে ডাকে, সে বয়সে বড় হোক বা ছোট। এই ভাবে ডাকার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। ইতিহাস খুঁজলেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হুগলি জেলার তারকেশ্বরের কাছাকাছি এক গ্রামে বাগদিদের ‘তুই’ সম্বোধন করে বর্ণহিন্দুরা ক্ষমতা প্রদর্শন করত। দলিত ও জনজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যাঁরা চাকরিজীবী, তাঁদের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যায়। তাঁদের বাবু না বললেও, সম্বোধনে একটু-আধটু সম্মান দেওয়া হয়।
অন্য দিকে, বর্ণহিন্দুদের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র। বাবুদের ডাকা হয় মালিক, মনিব, বাবু ইত্যাদি সম্বোধন করে। নামের পাশে ‘বাবু’ উল্লেখ করে বা দাদা, দিদি, কাকা, কাকিমা, জেঠা, জেঠিমা বলে সম্বোধন করে। এই ডাক বাবুদের বেশ গৌরবোজ্জ্বল করে তুলেছে, শুনতেও বেশ ভাল লাগে। বংশপরম্পরায় এই নিয়ম চলে আসায়, তাঁদের মনে আসে না— বাদবাকিদের কী বলে সম্বোধন করা উচিত। জনজাতিভুক্ত বা দলিত মানুষেরা মনে মনে চরম দুঃখ পান, কিন্তু কোনও দিন প্রতিবাদ করেননি। ভয় একটাই, কাজ থেকে তাড়িয়ে না দেয়। পেটের জ্বালায় প্রতিবাদ শব্দটাই মনে আসে না।
ভারতে ‘দ্য শিডিউলড কাস্টস অ্যান্ড দ্য শিডিউলড ট্রাইবস (প্রিভেনশন অব অ্যাট্রোসিটিজ়) অ্যাক্ট, ১৯৮৯’ অনুযায়ী কোনও ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে তাঁর জাতি বা বর্ণ ব্যবহার করে অপমান বা সম্বোধন করা একটি গুরুতর অপরাধ। এই আইনের ক্ষমতার কথা জনজাতিভুক্ত বা দলিত মানুষদের ক’জনই বা জানেন, প্রয়োগ তো দূরের কথা। শিক্ষিত ভদ্রলোকরা এ কথা জানলেও, বাকিদের জানানোর প্রয়োজন বলে মনে করা দূরের বিষয়, তাঁরা নিজেরাও মানেন না। এ সবের মধ্যেও ভাল মানুষের উপস্থিতিও আছে, যাঁরা তাঁদের যথাযথ সম্মান জানিয়ে সম্বোধন করেন। তবে সংখ্যাটা খুবই কম।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)