প্রলম্বিত শীতের মতোই দীর্ঘায়িত হচ্ছে গ্রীষ্ম। বর্ষার দেখা নেই। আর গ্রীষ্ম নামক অতিথির দীর্ঘ উপস্থিতির অর্থ, গৃহস্থের সর্বনাশ। বিশেষত, পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার মতো স্বল্প বৃষ্টির টাঁড় মাটির এই জেলাগুলিতে।

গ্রীষ্ম প্রলম্বিত হওয়া মানে পুরুলিয়ায় রাস্তার পাশে জলের কলের সামনের জলের লাইন ক্রমশ দীর্ঘায়িত হওয়া। যেমনটা ঘটে থাকে আফগানিস্তানের মতো দেশে। পুরুলিয়ায় বাস করলে জলের মূল্য, গুরুত্ব এবং অবশ্যই জলের সঙ্কট বোঝা কোনও জটিল ব্যাপার নয়। এখানে বছরের পরে বছর সময় কেটে যায় কংসাবতী নদী থেকে নলবাহিত জল স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আনতে। বাধার সম্মুখীন হতে হয় দীর্ঘদিন ধরে জলসঙ্কটে ভোগা সাধারণ মানুষের। পুরুলিয়ার জল সঙ্কটের গভীরতা আরও বোঝা যায়, যখন দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপিকা মাঝরাতে জলের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। জলের জন্যই পুরুলিয়ায় মেসে থাকা ছাত্রছাত্রীদের অনেক সময় মেস মালিকের কটাক্ষ সহ্য করতে হয়। কেটে দেওয়া হয় ভাড়াটের জলের সংযোগ।

শুধু পুরুলিয়া, বাঁকুড়া বা আফগানিস্তান নয়, সারা বিশ্বই আজ জলসঙ্কটে। গবেষকেরা বলছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ জলের অভাবে ভুগবে। এখনই পৃথিবীর মাত্র ২.৫% জল পরিষ্কার এবং পানের যোগ্য। সমুদ্র বিজ্ঞানের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গবেষক নুজহাত খানও মনে করেন, আগামী ২০ বছরে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ জলের সঙ্কটের সম্মুখীন হবে। তাদের সামনের সারিতে থাকবে ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য পূর্বের দেশ সমূহ এবং পাকিস্তান। 

কিন্তু যেখানে পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, সেখানে কেন এত জলাভাব! তার কারণও কিন্তু মানুষই। গ্রীষ্মের তীব্র জল সঙ্কটের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ষা বা শীতের মরসুমে আমরা দিব্যি ভুলে যাই। জলের কল খুলে বালতি রেখে নির্দ্বিধায় বাড়ির অন্যত্র কাজে চলে যাই। বালতি 

উপচে জল বয়ে যায়। আমাদের ভ্রূক্ষেপ থাকে না। 

এ জন্যই জলের উপরে কর চাপানোর কথা বলেন কেউ কেউ। কেউ আবার ‘ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্ট’-এর মতো আইন চালুর কথাও বলেন। আবার যে সব বেসরকারি সংগঠন জল সঙ্কট নিরসনে কাজ করে চলেছে, তারা জলের উপরে কর চাপানোর বিরুদ্ধে। এ সব সংগঠনের বক্তব্য, ‘কমিউনিটি’-উদ্যোগে জল পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। ‘ওয়াটার ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ বলে খ্যাত, ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রাপ্ত রাজেন্দ্র সিংহ এই মতের প্রবক্তাদের মধ্যে অন্যতম। মনে করেন, জলকে নিয়ে রাজনীতি এবং মুনাফাবাজিও জলের ঘাটতির অন্যতম কারণ। 

আমরা কম জল ব্যবহার করে বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে কৃষকদের ততটা উৎসাহিত করতে পারি না। আমরা দেখি,  বিভিন্ন ‘কর্পোরেট’ সংস্থা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চাষিদের শস্য চাষে অনুৎসাহিত করে আখ চাষ করতে বলছে। কারণ, আখ চাষে তাদের লাভ বেশি। অথচ, এক একর আখ চাষে যেখানে বছরে ১৮০ লক্ষ লিটার জল লাগে, সেখানে বছরে এক একর জমিতে দানা শস্য চাষ করতে লাগে ১৮ লক্ষ লিটার জল।

শুধু তা-ই নয়, ভারতে এখন তিন ধরনের শিল্পেরই শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে। ‘বোরওয়েল ইন্ডাস্ট্রি’, ‘ওয়াটার ট্যাঙ্কার’ এবং ‘ক্যাশ ক্রপ ইন্ডাস্ট্রি’। আজ আমাদের দেশে বোতল বন্দি ‘মিনারেল ওয়াটার’-এর কারখানা বেড়ে চলেছে। এমনকি, তারা ঠান্ডা পানীয় শিল্পেও আর উৎসাহী নয়।  মার্কিন একটি ঠান্ডা পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থা তাদের ওই কারখানার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ভূগর্ভস্থ জল যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করছে বলে মাঝেমধ্যেই অভিযোগ ওঠে। 

মহারাষ্ট্রে এই ভাবে ব্যবসায়িক সংস্থাকে জল দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠলে সরকার বলল, জল নিলে কিনতে হবে। প্রতিবাদ কিছুটা শান্ত হলে সরকার মাত্র ২৫ পয়সা প্রতি লিটারে ওই সব সংস্থাকে জল বিক্রি করতে থাকল। অন্য দিকে, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার আবার ভূগর্ভস্থ জলকে ‘ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’-এ শোধন করে ওই সব সংস্থাকে বিক্রি করতে লাগল মাত্র ২৫ পয়সা প্রতি লিটারে। ওই জলের ৬৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয় ‘মিনারেল ওয়াটার’ তৈরির জন্য। বাকিটা নষ্ট হয় প্রক্রিয়াকরণের সময়।

অথচ, আমরা যখন বাজার থকে এক লিটার ‘মিনারেল ওয়াটার’-এর বোতল কিনি তখন তার মূল্য দিতে হয় কমপক্ষে ২০ টাকা। ভেবে দেখুন, কী বিশাল মুনাফা! ভারতে এ ধরনের লাইসেন্স প্রাপ্ত ‘ব্র্যান্ডেড’ বোতলজাত ‘মিনারেল ওয়াটার প্রস্তুতকারী সংস্থার সংখ্যা ৫,৭৩৫টি। অন্য দিকে, গুরুগ্রাম এবং দিল্লিতে এ ধরনের কিন্তু লাইসেন্সহীন কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৩,৫০০। বছরে ২০ শতাংশ হারে এ ধরনের কোম্পানিগুলি বেড়ে চলেছে। অন্য দিকে, সেচের জলের জন্য কৃষকদের দিতে হচ্ছে চড়া দাম। 

এ রকম পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকারভিত্তিক এবং প্রয়োজনভিত্তিক জল ব্যবহারের উপরে জোর দিতে হবে। সে জন্য সামাজিক উদ্যোগ জরুরি। 

লেখক গ্রন্থগারিক (সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থগারিকদের সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক)