Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৭ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

সম্পাদকীয় ১

বহিরাগত হিন্দুত্ব

০৮ এপ্রিল ২০১৭ ০০:০০

কয়েক দিন যাবৎ ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গীয় নেতারা বিস্তর আত্মপ্রসাদে ভাসিতেছেন। রাজ্যে তাঁহাদের নবাবিষ্কৃত উৎসব রামনবমীর সশস্ত্র মিছিলের বহর দেখিয়া বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে সাড়া পড়িয়াছে। সাড়া যেমনই হউক, সদর্থক কিংবা নঞর্থক, বিজেপি নেতাদের উভয়তই লাভ। সদর্থক সাড়া, ‘আহা কী দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না’ জাতীয় প্রতিক্রিয়া তো সাফল্যপ্রতীক বটেই। এমনকী নঞর্থক সাড়া ‘ইহা ঘোর অন্যায়, এখনই থামাইতে হইবে’ জাতীয় প্রতিক্রিয়াও ব্যাখ্যাত হইতেছে সাফল্য হিসাবেই। তাঁহারা গুরুত্বপূর্ণ হইয়াছেন বলিয়াই না এত সমালোচনা: বক্তব্য ইহাই। যাহাকে বলে দুই দিকেই ‘বিজয়-বিজয়’ পরিস্থিতি! সুতরাং মহোৎসাহী নেতারা পথমানচিত্র ছকিতে ব্যস্ত, কোন মাসে কী উৎসব ও কী সমাবেশের মাধ্যমে ধুন্ধুমার বাধাইবেন। প্রসঙ্গত একটি কথা। তাঁহাদের দলীয় সংগঠনের শক্তি কিন্তু ইহাতে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয় নাই। যাহা প্রমাণিত হইল, তাহা একটি পুরাতন কথা: ধর্মের নামে জিগির লোক খেপাইতে ভারী কার্যকর, আর তাহা যদি অস্ত্রশস্ত্র সংবলিত কল্পিত শত্রু দমনের অভিযাত্রা হয়, তবে তো কথাই নাই। আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দুত্ব-সংগঠন এই কাজটি করিতেছে বলিয়া চটজলদি ফলও পাইতেছে— এইটুকুই প্রমাণিত। অতঃপর এমত কার্যক্রম আরও গৃহীত হইলে আবারও ফল মিলিবে: সংগঠনের উন্নতিও হইবে। যূথ-মানস একটি আশ্চর্য বস্তু: ‘আক্রান্ত’ মানসিকতা এবং সেই মানসিকতা হইতে স্ফুরিত আক্রমণপ্রবণতা যূথমানস প্রভাবিত করিবার একটি বহুপরীক্ষিত সফল ফর্মুলা।

বিজেপি নেতারাও তাহা দিব্য জানেন। সুতরাং সংগঠনে মন দিবার বদলে তাঁহারা যূথমানসের দিকেই বেশি মন দিতেছেন। তাঁহাদের দ্রুত হাতে-গরম ফল চাই, তবেই শক্তিবৃদ্ধি, সমর্থনবৃদ্ধি। তাই, যে বাংলায় কোনও দিন রামনবমী নামক উৎসবটির চল ছিল না, আজ রাতারাতি তাহার পালনার্থে তরবারিসজ্জিত বালকবালিকা, নারীপুরুষ হইহই রবে মাতিলেন। যে সময়টি বাংলার উৎসব তালিকায় কমনীয় বাসন্তী পূজার জন্য পরিচিত, সেই সময় রাম-স্লোগানে উজ্জীবন দেখা গেল। যে পূজার সহিত মিছিল কোনও অনুষঙ্গে জড়িত নয়, তাহাতে সশস্ত্র শৌর্যপ্রদর্শনের ঘটা হইল। ‘ধর্মোৎসব’ নামে বিজ্ঞাপিত এই ঘটনার মধ্যে ধর্ম-সংস্কৃতি দেখিতে পাওয়া একেবারে অসম্ভব। ইহাতে প্রকট কেবল রাজনীতি-সংস্কৃতি। রামনবমী, অন্তত পশ্চিমবাংলায়, একটি রাজনৈতিক উৎসব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিল। ধর্ম রহিল পাশে পড়িয়া— উপেক্ষিত, উৎপীড়িত, অসম্মানিত অবস্থায়।

এই ক্ষীণদৃষ্টি বিপজ্জনক সমাজ-বিভাজিকা ধর্ম-রাজনীতির মধ্যে যে ধর্মের অপেক্ষা কৌশল বেশি, হিন্দুত্ব-গোষ্ঠীগুলিও তাহা একবাক্যে স্বীকার করিবে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করিবার জন্যই কৌশল জরুরি। প্রশ্ন হইল, বাংলার হিন্দু সমাজ এই নূতন ধর্মরাজনীতিকে ধর্ম ভাবিয়া উৎফুল্ল যোগদান করিবেন কি? এখনও অবধি রাজ্যের প্রশাসন ও বিরোধী দলগুলির ভূমিকার প্রশংসা করিতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী নেতারা ধর্মের নামে এই রাজনীতিকৌশলের তীব্র সমালোচনা করিয়াছেন। হিন্দুধর্মের প্রথা ও সহনশীল ঐতিহ্যকে বাদ দিয়া সশস্ত্র পরধর্মবিরোধিতা রোপণের বিপদ বিষয়ে সরব হইয়াছেন। বাংলার সংস্কৃতি কিংবা ধর্মসমাজ, কিছুর সহিত যে এই অর্বাচীন উন্মার্গগামিতার সম্পর্ক নাই, মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন। ইহাকে নিছক প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্ববাদ ভাবিলে অন্যায় হইবে। বরং উত্তর ভারতের শৌর্যবীর্যময় আগ্রাসী হিন্দুত্বের অপেক্ষা বাংলার সমন্বয়ধর্মী হিন্দুত্বের ঐতিহ্যটিকে তুলিয়া ধরিবার প্রচেষ্টা সামাজিক ও প্রশাসনিক স্তরে অপ্রতিহত থাকুক, ইহাই কাম্য।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisement