সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রাজ্যের পরিকল্পনায় হাতির পথ বদল, সমাধান সুদূরে

হাতি কেন লোকালয়ে? বন দফতরকে প্রশ্ন করেন বাসিন্দারা। ধমক দেন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। কর্মীদের কি গাফিলতি সত্যিই গাফিলতি থাকে? উত্তর খুঁজলেন সমীর মজুমদার

elephant
দিশেহারা: লোকালয়ে হাতি। নয়াগ্রামের খড়িকামাথানিতে। নিজস্ব চিত্র

গত প্রায় ছাব্বিশ-সাতাশ বছর দলমার বুনো হাতি পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া জেলায় আসছে। গড়ে প্রায় চার মাস দাপিয়ে আবার দলমায় ফিরে যাচ্ছে। এই বুনো হাতিদের নিয়ন্ত্রণ করতে বন দফতর কার্যত দিশাহীন, আতঙ্কিত এবং ব্যর্থ। বন দফতরের আধিকারিকেরা প্রকাশ্যে বার বার মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক সভায় বুনো হাতি নিয়ে ধমক খাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী বন দফতরের আধিকারিকেরা কিছু কাজ করেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তিনি চাইছেন আধিকারিকেরা বুনো হাতি জঙ্গলে আটকে রাখুন। বুনো হাতি কোনও ভাবেই লোকালয়ে এসে ফসল এবং মানুষের ক্ষতি না করে। মানুষ হাতির আক্রমণে নিহত বা আহত না হয়। মুখ্যমন্ত্রীর মতোই বন দফতরের আধিকারিকেরাও চান না হাতি লোকালয়ে আসুক। কারও ক্ষতি করুক।

তবু প্রায় তিন দশক ধরে দক্ষিণবঙ্গে হাতি আসছে লোকালয়ে। আনাজ, ধান, আখ, ফলমূলের ক্ষতি ক্ষতি হচ্ছে। প্রাণহানিও হচ্ছে। প্রশ্ন একাধিক। কেন হাতির পাল আসছে? কেন বন দফতর হাতিকে বনে আটকে রাখতে পারছে না? কেন তাদের কর্মচারীরা ঠিক মতো কাজ করছে না?

তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে কয়েকটি কথা বলে নেওয়া ভাল। বন দফতরের বয়স দেড়শো বছর পার করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বন দফতরের নিচুতলার আধিকারিকেরা দেড়শো বছর ধরে বনের প্রান্তে প্রান্তে সব জায়গায় ৩-৪ জন কর্মচারী নিয়ে কয়েকশো হেক্টর বনভূমি এবং বনজ সম্পদ রক্ষায় নিজের জীবন বিপন্ন করে নীরবে কাজ করছেন। এই দফতরের কর্মীরা যে সব জায়গায় কাজ করেন সেইসব জায়গায় অন্য কোনও দফতরের কর্মীরা কাজ করার কথা ভাবতেই পারেন না। এমন শৃঙ্খলাপরায়ণ, দায়িত্বপরায়ণ একটি দফতরকে বারবার অন্য দফতর ঈর্ষার চোখে দেখে আসছে। আর এই কারণেই নানান ভাবে নানান যুক্তিতে বন দফতরের বহু ক্ষমতা কেড়ে তাকে অন্য দফতরের মতো করে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে ২০০৯-২০১০ সাল বা তার আগে থেকে।

মনে রাখতে হবে, বন দফতরের কাজ অন্য দফতরের মতো নয়। তাঁদের বনে টহল দিতে হয়, কাঠ বাজেয়াপ্ত করতে হয়, কাঠের নিলামের লট বানাতে হয়, গাছ কাটার তদারকি করতে হয়, বনভূমি রক্ষা করতে হয়, চারা বাগান তৈরি করতে হয়, হাতি তাড়াতে হয়, গ্রামের মানুষদের নিয়ে সভা করতে হয়, তাঁদের দাবিদাওয়া মতো কোথাও বাঁধ, কোথাও পুকুর-সহ নানান উন্নয়নমূলক কাজ করতে হয়। তাঁরা প্রচারের আড়ালে প্রত্যন্ত প্রান্তে এই সব কাজ নীরবে করে থাকেন। দিনক্ষণ নিয়ম মেনে চোরেরা গাছ চুরি করে না। বনভূমি থেকে অবৈধ পাথর বা বনজ সম্পদ চুরি করে না, চোরাশিকারিরা বন্যপ্রাণী হত্যা করে না। সেই সঙ্গে হাতি বা বন্যপ্রাণী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিচরণ করে না। আবার বনসৃজন করতে হলে তার প্রস্তুতি জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করতে হয়। চলতে থাকে সারা বছর। এই কারণেই বন কর্মচারীদের কাজের কোনও রুটিন নেই। নেই তাঁদের জীবনযাত্রার নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম। ১৫০ বছর ধরে কাঁকড়াঝোড়, আমতলিয়া, কেন্দুগাড়ি, হাতিবাড়ি, রায়ডাক, সরস্বতীপুর, ললিতাশোল, ফাড়াবাড়ী, বক্সা-সহ সুন্দরবনের বিভিন্ন কয়েকশো দুর্গম জায়গায় বনকর্মীরা কাজ করছেন। অনিশ্চিত সব কাজের কথা ভেবেই বন দফতরের আধিকারিকদের হাতে দেড়শো বছর ধরে ছিল বিশেষ ক্ষমতা। যাঁরা সেদিন এই ক্ষমতা দিয়েছিলেন তাঁরা বাস্তবজ্ঞান বর্জিত ছিলেন এটা ভাবা অবিচকের কাজ হবে। কিন্তু বর্তমানে ধীরে ধীরে ক্ষমতা হ্রাস করে দেওয়ার ফলে বন দফতর তাদের কাজ তাদের মতো করে করতে পারছে না। দফতরের বিশেষ ক্ষমতা কেন তুলে দেওয়া হচ্ছে তার সঠিক উত্তর জানা নেই। যাঁরা করছেন তাঁরা হয় ভেবেছেন আগের দেওয়া এইসব ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে, না হয় ভেবেছেন সব দফতরকে এক ছাতায় আনবেন। হয়তো অন্য কোনও উদ্দেশ্যও রয়েছে। যার ফলে কর্মীরা ধীরে ধীরে নিধিরাম সর্দারে পরিণত হচ্ছেন।

এবার আসা যাক কেন হাতির পাল লোকালয়ে আসছে? বছর তিরিশ বছর আগে বুনোহাতি দক্ষিণবঙ্গের বনভূমিতে আসেনি। তাদের দৈনিক গড়ে দরকার ১০০ কিলোগ্রাম খাবার, ২০০ লিটার জল এবং আস্তানা। কিন্তু ঝাড়খণ্ডের দলমার বিস্তীর্ণ বনে ক্রমাগত বনজ সম্পদ লুঠ, পাথর তোলার জন্য মাফিয়াদের প্রতিনিয়ত ডিনামাইটের বিস্ফোরণ, বনভূমি দখল, অবৈজ্ঞানিক ভাবে সুবর্ণরেখা ক্যানেল-সহ নানান ক্যানেল খনন, বনের মধ্যে পাকা রাস্তা তৈরি-সহ নানান অ-বনায়ন কাজ বুনো হাতিদের বাস্তুচ্যুত করেছে।

এর জন্য মূলত দায়ী প্রায় সব রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রশাসক। একা বন দফতর নয়। রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রশাসনের মদতেই বনভূমি দখল হচ্ছে, বন সম্পদ লুট হচ্ছে। পাথর-সহ মূল্যবান আকরিক মাফিয়ারা মোটা টাকার বিনিময়ে তুলে নিচ্ছে এবং হাতির প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে হাতিরা বেঁচে থাকার জন্য ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। চলে আসছে লোকালয়ে। পরিবর্তিত হচ্ছে তার আচার-আচরণ এবং খাদ্যাভাস। তারা কিছুতেই ফিরতে চাইছে না দলমার বিপন্ন পরিবেশে। এর দায় কার? শুধু কি বন দফতরের? নিশ্চয়ই নয়। এর দায় প্রশাসনের, রাজনৈতিক দলের, জঙ্গল সংলগ্ন সাধারণ মানুষের এবং বন দফতরের। পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডের প্রায় একশো কিলোমিটারের বেশি এই দুর্গম সীমানা বরাবর অবাধ হাতির গতি। ওরা কোনও রাজ্যের সীমানা মানে না। বিপুল ওদের খিদে। ওদের বাঁচিয়ে রাখতে আর লোকালয়ে আসা রুখতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের। এ এক জাতীয় সমস্যা। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে নানান প্রকল্প করে হাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে এবং হচ্ছেও। কিন্তু নানান কারণে সবই প্রায় ব্যর্থ। না হলে ভবিষ্যতেও হবে। যদি না জাতীয় স্তরে এই সমস্যা সমাধানে প্রকল্প না হয়।

একটা বিষয় জেনে রাখা ভাল। হাতি গরু-ছাগলের পাল নয়। বিশালদেহী প্রাণী। যদি বুনো হাতিকে বাঁচাতে হয় তবে লোকালয়ে আসা বন্ধ করতে হবে। তার জন্য দরকার জাতীয় স্তরের সঠিক পরিকল্পনা এবং তার রূপায়ণ। আলাদা-আলাদা রাজ্য ভিত্তিক কোনও পরিকল্পনা করলে তাতে শুধু হাতির গতিপথ বদলাবে। কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হবে না।

 

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সহকারী বিভাগীয় বন আধিকারিক

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন