আর করব না, ভুল হয়ে গিয়েছে। এ কথাটা নরেন্দ্র মোদী বলবেন, ভাবা যায়? যায় না, কারণ কখনও অনুতাপের আঁচ মেলেনি মোদীর কথায়। গুজরাত দাঙ্গার পরেও না, নোটবন্দি অশ্বডিম্ব প্রসবের পরেও নয়। ভোটের মুখে কিন্তু তা-ই ঘটল। দলের ইস্তাহারে লেখা হল, সব রকম কৃষিপণ্যের আমদানি কমানো হবে। আর প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় চাষি নাম লেখাবেন নিজের ইচ্ছায়। কৃষিঋণ নিলেই বিমা করাতে হবে, এই নিয়ম আর থাকবে না।

একেই বলে স্বীকারোক্তি। ভারতীয় জনতা পার্টি মানছে, চাষি যে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তার অন্যতম কারণ মোদী সরকারের বেআক্কেলে আমদানি নীতি। আরও মানছে, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় চাষি আগ্রহী নন (এক বছরে আশি লক্ষ চাষি বিমা ছেড়েছেন)। তাই ইস্তাহারে আবেদন, প্রিমিয়াম চাই না, ভোটটা দিন। এই হল রাজনীতি, যা ক্ষুদ্রের সামনে বলদর্পীকে নতজানু করে। 

চাষি বিমা চান না, কারণ ঠিক সময়ে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ মেলার ভরসা নেই। এটা অযথা সন্দেহ নয়। গত বছর অক্টোবর পর্যন্ত হিসেব, তিন হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের আবেদন পড়ে রয়েছে। সরকারি কর্তারাই বলছেন, ঐচ্ছিক করা হলে বড় জোর দশ শতাংশ চাষি বিমা কিনবেন। কারা করাবেন বিমা? যাঁদের চাষে ঝুঁকি বেশি। তা হলে বিমা কোম্পানির খরচ উঠবে কী করে? বিমাকে কৃষিঋণ থেকে বিযুক্ত করা মানে, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার মৃত্যুঘণ্টা। 

বিরোধীরা বলছেন, এ হল চৌকিদারের চুরির ফল। গত আর্থিক বছরে চাষি কপাল চাপড়েছেন, বেসরকারি বিমা কোম্পানিরা লাভ করেছে চার হাজার কোটি টাকা। তাই কংগ্রেস ইস্তাহারে লিখছে, তারা ‘লাভ নয়, লোকসানও নয়’ এই চুক্তিতে বিমা চায়। তাতে বেসরকারি সংস্থা পালাবে। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি বিমা নিগম কত চাষিকে আওতায় আনতে পারবে? কিন্তু কংগ্রেসের কাছে সে প্রশ্ন নগণ্য, তাদের তুরুপের তাস সব রাজ্যে কৃষিঋণ মাফ। উৎপাদনের খরচ কমিয়ে, ফসলের দাম বাড়িয়ে, মহাজনি ঋণ থেকে মুক্তি দিয়ে চাষির ‘কর্জ মুক্তি’ কংগ্রেসের লক্ষ্য।

এমন ‘হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা’ কি আদৌ আলোচনার যোগ্য? অনেক ফাঁপা কথা থাকে ইস্তাহারে। যেমন কংগ্রেস বলছে, আলাদা কিসান বাজেট পেশ করবে। কেন? কৃষির থেকে তো রাজস্ব আদায় হয় না, যে আলাদা আয়-ব্যয়ের খতিয়ান চাই? বিজেপি ফের বলেছে, চাষির রোজগার ডবল হবে তিন বছরে। এ যেন বিরাট কোহালি বলছেন, আগামী তিন বছর প্রতি ম্যাচে ভারতীয় দল ওভারে ছত্রিশ রান করবে। 

ঝুটা কসম বাদ দেওয়া গেল, কিন্তু সচ্চা চ্যালেঞ্জ? ‘কৃষির উন্নতি’ বলতে নেতারা বরাবর বুঝে এসেছেন, কৃষি উৎপাদনে উন্নতি। এই প্রথম একটি সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে, যেখানে বদলে গিয়েছে সংজ্ঞা। এখন চাষের উন্নতি মানে চাষির রোজগারে উন্নতি। কী ভাবে তা হবে, সে প্রশ্ন এড়াতে পারছে না কোনও দল। ভাসা-ভাসা, আধখেঁচড়া, যেমনই হোক, উত্তর দিতে হচ্ছে। তাদের ইস্তাহার পড়ে আন্দাজ হয়, এই সব সূত্রের চৌহদ্দির ভিতরেই ঘোরাফেরা করবে নির্বাচন-উত্তর কৃষিনীতি। তাই ইস্তাহারে কৃষির অংশকে গুরুত্ব না দিলেই নয়।

চাষির রোজগার বাড়ানোর প্রথম উপায়, উৎপাদনে সহায়তা। বিজেপি দু’হেক্টরের নীচে জমির মালিকদের বছরে ছ’হাজার টাকা দেবে। তৃণমূল দেবে পাঁচ হাজার। কংগ্রেস কোনও নির্দিষ্ট অঙ্ক বলেনি। কিন্তু সিপিআইএম ইস্তাহারে বলছে, ছোট চাষি কাজে লাগাতে পারবেন একশো দিনের কাজের শ্রমিককে। এমন প্রস্তাব এই প্রথম, যদিও এটা চাষির দীর্ঘ দিনের দাবি। মজুরি দ্রুত বাড়ছে, ফসলের দাম বাড়ছে না, তাই চাষ অলাভজনক হয়ে পড়ছে।  

একশো দিনের মজুর চাষের কাজে লাগলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটা গতি আসবে। বদলাতে পারে রাজনীতিও। মজুর নিয়োগের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পঞ্চায়েত ফের গুরুত্ব ফিরে পাবে গ্রামের জীবনে। আজ ঠিকাদারির পাঁকে আটকে আছে পঞ্চায়েত। গ্রামীণ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলে স্বশাসনে নতুন শক্তির সঞ্চার হতে পারে।

চাষির রোজগার বাড়ানোর দ্বিতীয় উপায় ফসলের ন্যায্য দাম। এর বাঁধা ফর্মুলা, সরকারি ক্রয়। কংগ্রেস বলছে, নতুন কমিশন তৈরি করে সরকারি দাম ঠিক করবে (চাষি এমন কমিশন ঢের দেখেছেন), বিজেপি ‘পিএম-আশা’ প্রকল্পে ফসলের বাজারদরের সঙ্গে সরকারি দরের পার্থক্যের টাকা পাঠাবে চাষির অ্যাকাউন্টে (মধ্যপ্রদেশে এর পাইলট প্রকল্প ফ্লপ), তৃণমূল সরষে-ডাল প্রভৃতি ফসল কেনার আলাদা তহবিল করেছে (কিন্তু ক্রয়-মজুত-বিক্রির পরিকাঠামো নেই)।

আরও বড় প্রশ্ন হল, কত দিন এ ভাবে সরকার চাষির মুখ চেয়ে গাদা গাদা ডাল-সরষে-তুলো-সয়াবিন কিনে ফেলে রাখবে? ঠ্যাং ভেঙে ক্রাচ দান, এই কি সরকারি নীতি? এক দিকে গুদামে গম-চাল নষ্ট হয়, অন্য দিকে নষ্ট হয় বাজারের ভারসাম্য। কিছু চাষি (তাঁরা সবাই গরিব নন) হাতে সরকারি দাক্ষিণ্যের ক’টা টাকা পান ঠিকই, কিন্তু চাষ লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা অঙ্কুরে নষ্ট হয়। কেন বাংলার চাষিরা আড়াই-তিন দশক লাল স্বর্ণ ধান চাষ করে চলেছেন, অনেক উন্নত প্রজাতি আসা সত্ত্বেও? কারণ, সরকারকে ধান বেচার নিশ্চয়তা। এ ভাবে চাষির বাজার ধরার ক্ষমতাকেই নষ্ট করছে সরকার।

এ নিয়ে একটা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক দিকে যোগেন্দ্র যাদবের মতো কৃষি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতারা সওয়াল করেন, সরকার কর্পোরেট সংস্থাকে বিপুল ভর্তুকি দিতে পারে, আর চাষিকে ন্যায্য মূল্য দিতে পারে না? আরও বেশি ধরনের ফসল আরও বেশি পরিমাণে কিনুক সরকার। অন্য দিকে অশোক গুলাটির মতো কৃষি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার চাষিকে আরও টাকা দিক, কিন্তু অনুদান হিসেবে। ফসল বিক্রি হোক বাজারের নিয়ম মেনে। যার প্রধান শর্ত, বাজারে কোনও ফসলের দাম একটু বাড়লেই ভিন দেশে, ভিন রাজ্যে তা পাঠানো বন্ধ করা চলবে না। 

অশোক গুলাটি দেখাচ্ছেন, জোর করে দাম কম রাখলে চাষির যা ক্ষতি হয়, তার অঙ্ক যাবতীয় ভর্তুকির যোগফলকে ছাড়িয়ে যায়। পেঁয়াজ-আলু, চিনি-ডালের দাম বাড়লে নেতারা হয় রফতানি আটকে (২০১৪ সালে তৃণমূল যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গের আলু রফতানি বন্ধ করেছিল), নইলে আমদানি বাড়িয়ে (আফ্রিকা থেকে মোদী বিপুল ডাল আমদানি করেন ২০১৭-১৮ সালে) দাম কমিয়ে রাখেন। ফলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি কমে, কিন্তু পথে বসে চাষি। খাদ্যের দাম কম রাখতে কার্যত চাষির উপর কর বসাচ্ছে সরকার।

অনেক বাদানুবাদের পর এই যুক্তি কিছুটা দাগ কেটেছে। বিজেপি ইস্তাহার বলছে, আগাম-নির্ধারিত আমদানি-রফতানি নীতি তৈরি করব। মানে, হঠাৎ রফতানি বন্ধ করব না। কংগ্রেস আরও একটু এগিয়েছে। বলছে, চুঙ্গি কর তুলে দেব, যাতে অন্য রাজ্যে, অন্য দেশে অবাধে কৃষিপণ্য যায়। অত্যাবশ্যক পণ্য আইনও (১৯৫৫) তুলে দেব। এমন আইন আনব, যাতে কেবল আপৎকালে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

ভোট দিয়ে চাষি কী পাবেন, সে পরের কথা। ভোটের আগেই তাঁরা রাজনীতির মুখ ঘুরিয়েছেন, ক্রেতা থেকে উৎপাদকের দিকে। প্রধান দলগুলোর থেকে এই স্বীকৃতি আদায় করেছেন যে, ভুল নীতির জন্যই চাষির এই দুর্দশা। নতুন নীতি, নতুন আইন চাই। ক্ষমতায় যে দলই আসুক, চাষের নীতি থেকে আর বাদ দিতে পারবে না চাষিকে। 

ঋণ মাফ আর আগাম অনুদানের বিস্কুট-লজেন্সে না ভুলে কৃষক আন্দোলন যদি চাপ বজায় রেখে যেতে পারে, যেমন রেখেছে গত তিন বছর, তবে এ বার থেকে চাষের ইস্তাহার চাষিই লিখবে।