লন্ডনে ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষকদের সাফল্য সাধুবাদের যোগ্য। এডস রোগাক্রান্ত এক জন মানুষকে তাঁহারা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত হইতে ফিরাইয়া আনিয়াছেন। যে ব্যক্তির চিকিৎসা হইয়াছে, তিনি এডসের ফলে রক্তের ক্যানসারে ভুগিতেছিলেন। ইহার প্রকোপে তাঁহার আশু মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। এমন বিপদের কবল হইতে উদ্ধার যে কী কঠিন কাজ, তাহা না বলিলেও চলে। তাঁহাদের উদ্ভাবিত চিকিৎসায় লন্ডনের গবেষকগণ শুধু যে রোগীকে রক্তের ক্যানসার হইতে মুক্ত করিয়াছেন তাহাই নহে, তাঁহার দেহ হইতে এডস ব্যাধিটি নির্মূল করিতেও সক্ষম হইয়াছেন। এই রকম সাফল্যের ঘটনা ইহাই প্রথম নহে। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন শহরের এক রোগীও এডস-মুক্ত হইয়াছিলেন। প্রভেদ দুই রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার পদ্ধতিতে। প্রথম ক্ষেত্রে হতভাগ্য মানুষটির দেহে তেজস্ক্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করিতে হইয়াছিল, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তাহা প্রয়োজন হয় নাই। রশ্মি প্রয়োগে দেহে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, সুতরাং এই নূতন পদ্ধতিতে চিকিৎসায় ফল মিলায় গবেষকরা আশান্বিত। অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকি লইবার পরেও যে দ্বিতীয় রোগী বাঁচিয়া আছেন, তাহা চিকিৎসাবিদ্যায় অগ্রগতির প্রমাণ।

এডস নিরাময়ে দুই ক্ষেত্রেই যে পদ্ধতি অনুসরণ করিয়াছিলেন দুই গবেষক দল, তাহা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন। সুস্থ মানুষের অস্থিমজ্জা রোগীর দেহে চালান। তাহার পূর্বে রোগীর অস্থিমজ্জা নিষ্কাশন। প্রক্রিয়াটির নেতৃত্বে ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী রবীন্দ্র গুপ্ত। তাঁহার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে অভিনব। প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার জন্য তিনি খুঁজিয়াছেন এমন মানুষদের, যাঁহাদের দেহকোষে সিসিআরফাইভ জিনটি কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত অবস্থায় দুই রূপে বিদ্যমান। এডস রোগের ক্ষেত্রে ওই জিন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এডস ভাইরাস যখন কোনও কোষকে নিশানা বানায়, তখন সেই কোষের গায়ে ভাইরাসটি আঁটোসাঁটো ভাবে বসে। সিসিআরফাইভ জিন অটুট থাকিলে ওই বসিবার কাজটি সহজ হয়। সিসিআরফাইভে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন ঘটিলে এডস ভাইরাস নিশানা কোষের গায়ে বসিতে পারে না। ইউরোপের ১ শতাংশ মানুষের দেহে সিসিআরফাইভ জিন পরিবর্তিত রূপে বিরাজমান। ওই সব মানুষ কখনও এডস ব্যাধির কবলে পড়েন না। এই কারণে রবীন্দ্র ও তাঁহার সহযোগী গবেষকরা পরিবর্তিত সিসিআরফাইভ জিন সংবলিত মানুষদের অস্থিমজ্জাই এডস রোগীদের অস্থিতে চালান করিয়া ছিলেন। মোট ৩৮ জন রোগীর মধ্যে এক জনের ক্ষেত্রে সাড়া আশাব্যাঞ্জক। অন্যদের অগ্রগতি কী রূপ, গবেষকরা জানান নাই।

রবীন্দ্র এবং তাঁহার সহযোগী গবেষকদের মত এই যে, অতীতে বার্লিন এবং সম্প্রতি লন্ডনের রোগীর ক্ষেত্রে সাফল্যকে এডস ব্যাধির সহিত সংগ্রামের জয় বলিয়া ভাবা ভুল। ক্যানসারের ন্যায় এডসও একটি জটিল ব্যাধি। ইহা মানবদেহে নানা ভাবে থাবা বসায়। বিজ্ঞানীদের বহু কালের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ক্যানসার যে এখনও অজেয় রহিয়াছে, কেননা গবেষকরা বুঝিয়াছেন ক্যানসার মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গে বিভিন্ন ভাবে ছড়ায়। এমনকি ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রেও ব্যাধিটির ধরন ভিন্ন হইয়া থাকে। এডসও সেই রূপ বিভিন্নতা দোষে দুষ্ট। এই রোগের চিকিৎসা সহজে মিলিবে না। তবু গবেষকরা ব্যাধিটিকে পরাস্ত করার চেষ্টায় রত।