Advertisement
E-Paper

দেশের অর্ধেক মেয়েই মনে করেন, গার্হস্থ্য হিংসা ‘স্বাভাবিক’

মেয়েরা নিজেরা গার্হস্থ্য হিংসাকে কেমন ভাবে দেখেন? এই লেখায় আমরা সেটাই বোঝার ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। প্রশ্নটা স্বভাবতই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নারী যদি মনে করেন যে তাঁর স্বামীর অধিকার আছে তাঁকে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করার অথবা তথাকথিত সাংসারিক ভুলভ্রান্তির জন্য শাস্তি প্রদান করার, তা হলে তাঁর গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা, যাঁরা এমনটা মনে করেন না তাঁদের তুলনায় অনেক বেশি।

পুনরজিৎ রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০০:০০

রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে (‘গ্লোবাল স্টাডি অন হোমিসাইড’) দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে যতগুলি নারী-হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে গার্হস্থ্য হিংসার কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে গড়ে প্রতি তিন জন নারীর মধ্যে এক জন গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। আমাদের দেশে, কিছু বছর আগে করা একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি করে গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা সরকারি ভাবে নথিভুক্ত হয়। প্রকৃত সংখ্যাটা এর থেকে অনেকটাই বেশি হওয়ার সম্ভাবনা, কেননা গার্হস্থ্য হিংসার বহু ঘটনাই এ দেশে থানা বা মহিলা কমিশন অবধি পৌঁছয় না।

মেয়েরা নিজেরা গার্হস্থ্য হিংসাকে কেমন ভাবে দেখেন? এই লেখায় আমরা সেটাই বোঝার ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। প্রশ্নটা স্বভাবতই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নারী যদি মনে করেন যে তাঁর স্বামীর অধিকার আছে তাঁকে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করার অথবা তথাকথিত সাংসারিক ভুলভ্রান্তির জন্য শাস্তি প্রদান করার, তা হলে তাঁর গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা, যাঁরা এমনটা মনে করেন না তাঁদের তুলনায় অনেক বেশি। তার সহজ কারণ, যে নারীরা মনে করেন তাঁদের স্বামীদের তাঁদের নির্যাতন করার অধিকার আছে, তাঁদের স্বামীরা জানেন যে তাঁদের স্ত্রীদের নির্যাতন করাটা একেবারেই ‘নিরাপদ’! শুধু তা-ই নয়, যে নারীদের মনোভাব এই রকম, তাঁদের সংস্পর্শে এসে অন্য নারীরাও (পড়শি, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনরা) বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারেন যে গার্হস্থ্য হিংসা আদৌ কোনও অপরাধ নয়— তাঁদের স্বামীদের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাঁদের নির্যাতন করার। সুতরাং এক জন নারী যদি গার্হস্থ্য হিংসাকে অন্যায় বা অপরাধ মনে না করেন, তা যে কেবল তাঁর নিজের স্বামীর (বা শ্বশুরবাড়ির অন্যদের) হাতে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রভূত ভাবে বাড়িয়ে দেয় তা-ই নয়, এই সমস্যার সামাজিক প্রকোপও বাড়িয়ে দিতে পারে।

গার্হস্থ্য হিংসার প্রতি ভারতীয় নারীদের মনোভাব বোঝার অন্যতম বিশ্বস্ত সূত্র হল ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতর কর্তৃক পরিচালিত জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে)। এই সমীক্ষার সাম্প্রতিকতম রাউন্ডটি গোটা ভারত জুড়ে পরিচালিত হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এবং এই সমীক্ষায় অংশ নেন ছ’লক্ষেরও বেশি পরিবার। এই সমীক্ষাটির বিশেষত্ব হল এই যে, এটিই এ দেশের একমাত্র সমীক্ষা যেখানে ১,২২,৩৫১ বিবাহিত ভারতীয় নারীর (যাঁদের গড় বয়স ৩০ বছর এবং যাঁদের অধিকাংশই বিবাহিত) গার্হস্থ্য হিংসার প্রতি মনোভাব বোঝার জন্য সমীক্ষাটিতে একটি নির্দিষ্ট অংশ রাখা হয়েছে। এই অংশে সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক নারীর কাছে সাতটি কাল্পনিক পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয় এবং প্রত্যেকটি পরিস্থিতির ক্ষেত্রে জানতে চাওয়া হয় যে, যদি কোনও নারী সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন (বা সেই পরিস্থিতির জন্য ‘দায়ী’ হন) এবং তার ফলে তিনি গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হন, তা হলে কি সেটা যুক্তিযুক্ত? (অন্য ভাবে বললে, তা হলে কি স্বামীর হাতে শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতিত হওয়াটা তাঁর প্রাপ্য?) যে পরিস্থিতিগুলি সমীক্ষায় বর্ণিত হয়েছে সেগুলি হল:

(১) স্বামীকে না জানিয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখা

(২) সন্তানদের অবহেলা করা

(৩) স্বামীর কথার ওপর কথা বলা

(৪) স্বামীর সঙ্গে যৌন সংসর্গে সম্মত না হওয়া

(৫) ঠিকঠাক রান্না করতে না পারা

(৬) বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া

(৭) স্বামী/শ্বশুরবাড়ির অন্যদের শ্রদ্ধা না করা।

বর্ণিত সাতটি পরিস্থিতির একটিতেও এক জন নারীরও মনে হওয়া ‘উচিত’ নয় যে, গার্হস্থ্য হিংসা যুক্তিযুক্ত (কোনও পরিস্থিতিতেই গার্হস্থ্য হিংসা যুক্তিযুক্ত হওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না)। কিন্তু বাস্তবে কী দেখতে পাচ্ছি আমরা? সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রায় ২৪% মনে করেন, যদি কোনও নারী তাঁর স্বামীকে না জানিয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখেন তবে গার্হস্থ্য হিংসা যুক্তিযুক্ত; ২৯% মনে করেন সন্তানকে অবহেলার শাস্তি হিসেবে স্বামীর হাতে লাঞ্ছিত হওয়াটা যুক্তিযুক্ত; ২৭% মনে করেন স্বামীর মুখের ওপর কথা বলে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হলে বলার কিছু নেই; ১৩% মনে করেন যদি কোনও নারী স্বামীর সঙ্গে যৌন সংসর্গে সম্মত না হন এবং তার ফলে যদি তাঁর ওপর তাঁর স্বামী নির্যাতন চালান তা হলে তা যুক্তিযুক্ত; ১৮% মনে করেন খারাপ রান্নার জন্য নির্যাতন যুক্তিযুক্ত; ২৩% মনে করেন গার্হস্থ্য হিংসা যুক্তিযুক্ত যদি কোনও মহিলা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন; এবং ৩৫%-এরও কিছু বেশি নারী মনে করেন, এক জন নারী যদি তাঁর স্বামীকে বা তাঁর শ্বশুরবাড়ির অন্যদের শ্রদ্ধা না করেন, তা হলে তাঁর স্বামীর হাতে লাঞ্ছিত হওয়াই উচিত!

লক্ষণীয়, সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১,২২,৩৫১ নারীর মধ্যে প্রায় ৪৯% নারী বর্ণিত সাতটি পরিস্থিতির মধ্যে অন্তত একটি পরিস্থিতিতে গার্হস্থ্য হিংসা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন! অর্থাৎ, ভারতে প্রতি দ্বিতীয় নারী মনে করেন যে এক বা একাধিক কারণে গার্হস্থ্য হিংসা যুক্তিযুক্ত! এটি অবশ্যই অত্যন্ত শঙ্কিত হওয়ার মতো পরিসংখ্যান, যার আরও গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে নারীরা মনে করেন গার্হস্থ্য হিংসা এক বা একাধিক কারণে যুক্তিযুক্ত, তাঁরা ঠিক কারা? তাঁরা কি সবাই গ্রামগঞ্জে থাকেন এবং তাঁরা কি সবাই অশিক্ষিত অথবা অল্পশিক্ষিত?

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ইনদওর-এ অর্থনীতির শিক্ষক

Woman Domesteic Violence India
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy