ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ পেরিয়ে জাগে যে শ্রদ্ধা
শুভাশিস চক্রবর্তী বলেছেন, ‘যে বিদ্যাসাগরকে তিনি (মাইকেল মধুসূদন) টুলো পণ্ডিত বলে ব্যঙ্গ করতেন সেই বিদ্যাসাগরই তাঁর পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন’। (‘দত্তকুলোদ্ভব’, পত্রিকা, ১-১০) মন্তব্যটি যথার্থ। তবে মাইকেলকে ব্যঙ্গ করার ব্যাপারে বিদ্যাসাগরও কিন্তু কম ছিলেন না। মাইকেলের অমিতাক্ষরছন্দ ছিল তাঁর একেবারে না-পছন্দ ও ‘অসহ্য’। বিদ্যাসাগরের কাছে এমন ছন্দে লেখা কবিতা ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ ছাড়া কিছু নয়। তাই তিনি নির্দ্বিধায় ক্যারিকেচার করতেন, ‘তিলোত্তমা বলে ওহে শুন দেবরাজ,/তোমার সঙ্গেতে আমি কোথায় যাইব?’
শুধু বিদ্যাসাগর নন, সে সময় অনেকেই মাইকেলের লেখা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপের অস্ত্রে নির্মম শান দিতেন। তা না হলে ‘ছুচ্ছুন্দরীবধ কাব্য’ রচিত হবে কেন? ২২ ফাল্গুন ১৩২২ প্রসিদ্ধ নাট্যশিল্পী রসরাজ অমৃতলাল বসু জানিয়েছেন, প্যারীমোহন বসু নামে তাঁর এক দূরসম্পর্কীয় কাকা মাইকেলের লেখা নিয়ে রীতিমতো প্যারডি করতেন। আর প্রচারের উদ্দেশ্যে সেই সব রচনা ছাপানো হত ‘ভাস্কর’ নামে এক পত্রিকায়। মাইকেল লিখেছিলেন, ‘শৈবালের দলে শোভে যেই রত্নরাজি’, আর প্যারীমোহনের লেখনী থেকে বেরিয়ে এল, ‘বৃষভের ল্যাজে শোভে যেই পুচ্ছরাজি...’। তিনি মাইকেলকে অনুকরণ করে লিখেছিলেন, ‘আমি হনু, এ বিপুল বিশ্বে কে না ডরে/দেখি মোর লাফ!...।’ এ ভাবেই ওপরতলা থেকে শুরু করে প্রায় অনেকের কাছেই মাইকেলকে বিদ্ধ হতে হয়েছে। আসল কথা, প্রতিভাধর মাইকেলের যে, ‘ফেক্সিবিলিটি অব ইন্টেলেক্ট’ ছিল, সে সময়কার অনেক খ্যাতকীর্তি ব্যক্তির মধ্যে তা ছিল অনুপস্থিত। সে কারণে অনেক জহুরিই জহর চিনতে পারেননি। এ রকম হীন কটাক্ষের প্রসঙ্গ তুললেও মাইকেলের দুরন্ত প্রতিভায় চমৎকৃত হওয়ার বিষয়টি কিন্তু অমৃতলাল কোনও ভাবে গোপন করেননি। ‘যাঁহার (মাইকেলের) জীবনের গতি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলিয়াছিল, তিনি যে কেমন করিয়া সংস্কৃত ভাষার শব্দসিন্ধু মন্থন করিয়া কাব্যরত্ন বঙ্গসাহিত্যকে উপহার দিতে পারিলেন তাহা চিন্তা করিলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না’। (পুরাতন প্রসঙ্গ ও বিচিত্র প্রসঙ্গ, বিপিনবিহারী গুপ্ত, সম্পাদক: প্রসাদ সেনগুপ্ত)।
রচনারীতি নিয়ে মাইকেলকে বিদ্যাসাগর উপহাস করলেও সে সময়কার নাটকের পৃষ্ঠপোষকরা কিন্তু দু’জনকেই সমান মর্যাদার চোখে দেখতেন। ঠাকুরবাড়িতে থিয়েটারের জন্য ‘কার্যনির্বাহক সমিতি’ গঠিত হলে অনেকের সঙ্গে এই দুই প্রতিভাধর ব্যক্তিকেও সভ্য করা হয়। বিধবা বিবাহ আন্দোলনের সময় পাইকপাড়ার রাজারা সব দিক থেকে বিদ্যাসাগরের পাশে ছিলেন, কিন্তু সাহিত্যের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন মাইকেলেরই প্রথম ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এ ব্যাপারে তাঁদের দূরদর্শিতার তারিফ করতে হয়। কারণ, ‘কৃষ্ণকুমারী’ রচনা করে মাইকেলই প্রথম দেখিয়ে দিলেন বাংলাতেও উৎকৃষ্ট ট্র্যাজিক নাটক সম্ভব। আর তা সম্ভব হয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে মাইকেলের নিবিড় পরিচয় তথা অদ্ভুত প্রতিভার জোরে। সংস্কৃত সাহিত্যে বিয়োগান্ত নাটক নেই। অলঙ্কারশাস্ত্রের কঠোর নির্দেশ মানতে গিয়ে শূদ্রক ‘মৃচ্ছকটিক’কে ট্র্যাজিক করতে পারেননি। ভবভূতির হাতেও ‘উত্তররামচরিত’ কষ্টকল্পনার পথ ধরে নিশ্চিত মিলনের পথে এগিয়ে গেছে। ফলে, মূলত সংস্কৃতের অনুসরণে সে সময় বহু বাংলা নাটক লেখা হলেও একটিও কিন্তু বিয়োগান্ত হয়ে ওঠেনি।
‘কৃষ্ণকুমারী’ রচনা করে মাইকেলই নতুন পথের দিশারী হলেন, অথচ বিদ্যাসাগর কিন্তু তাঁর প্রশংসায় অকৃপণ ছিলেন না। এটাই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। সময় বিশেষে ‘টুলো পণ্ডিত’ বলে ব্যঙ্গ করলেও মাইকেল তাঁর ‘বন্ধু-ত্রাতা’ বিদ্যাসাগরের প্রতি ছিলেন পরম শ্রদ্ধাশীল। ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ ও ‘পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ নামে দুটি কবিতায় তিনি অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন।
বাণীবরণ সেনগুপ্ত।
শ্যামনগর, উত্তর চব্বিশ পরগনা
মানতে পারলাম না
‘স্বাদ বদলাতেই কি বাংলা ছবিতে গোয়েন্দা মরসুম’ (৩০-৯) প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘অপরাধ ও রহস্য কাহিনির এমন ঘনঘটা বাংলা ছবি আগে দেখেনি।... এতগুলো করে থ্রিলার মুক্তি পেয়েছে, এমনটা মনে করা মুশকিল’। এই কথাগুলো একেবারেই মেনে নিতে পারছি না। বাংলা ছবির ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে গত শতকের চল্লিশ দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে গোটা পঞ্চাশের দশক জুড়ে একের পর এক রহস্যকাহিনি চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। বেশ কিছু ছবির তো হিন্দি রিমেকও হয়েছিল সে সময়।
বিচ্ছিন্ন ভাবে, ১৯৩৫ সালে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘কণ্ঠহার’ (প্রথম সবাক রহস্য চিত্র) ছবিটিকে বাদ দিলে প্রথমেই মনে পড়ে সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাহিনি ও পরিচালনায় তৈরি ছবি ‘কালোছায়া’ (১৯৪৮)-র কথা। খুব জনপ্রিয় হয় ছবিটি। এর পরের বছরেই প্রেমেন্দ্র মিত্র করেন আর একটি রহস্য ছবি ‘কুয়াশা’। এর পর প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন পরিচালকদের পরিচালনায় একে একে এই ধারার ‘নিশির ডাক’ (১৯৪৯) ‘কঙ্কাল’ (১৯৫০), ‘জিঘাংসা’ (১৯৫১), ‘কালসাপ’ (১৯৫১), ‘নিয়তি’ (১৯৫১), ‘সে নিল বিদায়’ (১৯৫১), ‘সংকেত’ (১৯৫১), ‘ভৈরবমন্ত্র’ (১৯৫১), ‘হানাবাড়ি’ (১৯৫২), ‘কুহেলিকা’ (১৯৫২), ‘মাকড়সার জাল’ (১৯৫৩), ‘জালিয়াৎ’ (১৯৫৩), ‘মরণের পরে’ (১৯৫৪), ‘অপরাধী’ (১৯৫৫), ‘সবার উপরে’ (১৯৫৫), ‘দস্যু মোহন’ (১৯৫৫), ‘ডাকিনীর চর’ (১৯৫৫), ‘রাত একটা’ (১৯৫৭), ‘ধূমকেতু’ (১৯৫৮), ‘সোনার হরিণ’ (১৯৫৯), ‘রাতের অন্ধকারে’ (১৯৫৯), ‘চুপি চুপি আসে’ (১৯৬০), ‘অপরাধ’ (১৯৬০), ‘ভয়’ (১৯৬০) ইত্যাদি ছবিগুলি মুক্তি পায়। সব ছবিই যে বিরাট বাণিজ্যসফল হয়েছিল এমনটা নয়। এর মধ্যে বহু ছবির প্রিন্ট আজ আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু রহস্য ছবির একটা চাহিদা দর্শকদের মধ্যে বরাবরই ছিল এবং সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ছবিগুলি দর্শকদের ভালই মনোরঞ্জন করেছিল।
শুভায়ু সাহা। খাগড়া, মুর্শিদাবাদ