সোমা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘সব থাকা সত্ত্বেও নিঃস্ব’ (১০-৩) প্রবন্ধ পড়েই এই চিঠি লেখার প্রয়াস। রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই স্বাস্থ্যের খোলনলচে কিছুটা পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, জনসাধারণের কাছেও তেমনই বার্তা গিয়েছিল। সময়-অসময়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হঠাৎ করে ঢুকে পড়া এবং সেখানকার হালচাল বোঝার একটি প্রয়াস তাঁর ছিল, সন্দেহ নেই। আউটডোর ঠিক সময়ে খোলা, ডাক্তারদের সময়মতো হাসপাতালে হাজিরা— এ সবই মানুষ দেখেছিল। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির যে বিরাট হেরফের হয়ে যাবে— অচিরেই মানুষের সেই ভুল ভাঙতে শুরু করে।
একটির পর একটি জেলায় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হলেও পরিষেবা দেওয়ার মতো পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে কি? আগে জেলায় যাঁদের পোস্টিং ছিল, তাঁরা কলকাতার বাসিন্দা হলেও সপ্তাহে অন্তত তিন-চার দিন জেলায় তাঁদের দেখা যেত। এখন ওই সব জায়গায় তাঁদের হাজিরা শুধু কাগজে-কলমে। জেলা হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি কেনা হলেও সেগুলি চালানোর লোক নেই; ফলে অপব্যবহারে সেগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আসলে হাসপাতাল যদি কোটি কোটি টাকা উপার্জনের আস্তানা হয়ে ওঠে এবং প্রশাসন নিস্পন্দ থাকে, তবে স্বাস্থ্য পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়বেই। আর জি করের ঘটনার নিষ্পত্তি হল না এখনও। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড গরিব মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সদর্থক পদক্ষেপ, এ কথা মানতেই হবে। এর ফলে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের দরজাও গরিব মানুষের জন্য খুলেছে। কিন্তু এই স্বাস্থ্যসাথীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন দুর্নীতির চক্র। যে অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে সম্ভব, তার জন্যও রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। জেলায় জেলায় ছোট ছোট নার্সিংহোম গজিয়ে উঠেছে মূলত স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের উপর নির্ভর করে।
যে পরিমাণ অর্থ গরিব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে খরচ হচ্ছে, সেই অর্থ দিয়ে যদি সরকারি হাসপাতালগুলির প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা যেত, সেটাই হত অধিকতর যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত। আসলে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণ যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন তা হয়ে ওঠে সর্বগ্রাসী। এই চক্র এক বার শুরু হলে তাকে বাগে আনা সহজ নয়। আর জি কর আন্দোলনের সময় হয়তো এই দুর্নীতির লাগাম সাময়িক ভাবে টানা গিয়েছিল, কিন্তু তা থামেনি। শিক্ষার পর স্বাস্থ্যে যে সীমাহীন দুর্নীতির কবলে আজ এই রাজ্য, তার থেকে পরিত্রাণের পথ সহজ হবে বলে মনে হয় না।
দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
শেষ হবে?
সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘সব থাকা সত্ত্বেও নিঃস্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার খুঁটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে পাঠকের দরবারে। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে যেমন পূর্ববর্তী সরকার কফিনে ভরেছিল, তেমনই বর্তমান প্রশাসন সেই কফিনে পেরেক পুঁতে চলেছে— এমনই ইঙ্গিত মেলে লেখাটিতে। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও লেখকের মূল্যায়ন যথার্থ। ৩৪ বছরের বাম শাসনের শেষের দিকে অন্যান্য দফতরের মতোই কার্যত থমকে গিয়েছিল স্বাস্থ্য পরিষেবা। বেহাল পরিকাঠামো, অজস্র প্রকল্পের মাঝপথে আটকে থাকা, দুর্নীতি, দালালরাজ ও স্বজনপোষণ— সব মিলিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছিল।
উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পরিচিত যে সকল দুর্নীতির চিত্র, তা এখন এই রাজ্যেও শিকড় পুঁতেছে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা রোগীকে সেখান থেকে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা করছেন— এমন বহু দৃষ্টান্ত। এই দুর্নীতির শেষ কোথায়, তার উত্তরই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রসন্নকুমার কোলে, শ্রীরামপুর, হুগলি
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত
স্কুল, সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছ’টি স্তবক গাওয়ার নির্দেশ এসেছে। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের কৌশলে দেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক যখন ক্রমশ বিষিয়ে উঠছিল, তখন ‘বন্দে মাতরম্’-এর সম্পূর্ণ অংশের কথাগুলি এই বিভাজনের অন্যতম পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় এ বিষয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বের সংযমী সিদ্ধান্তগ্রহণ নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ও বাস্তবোচিত মীমাংসা ছিল।
স্বাধীনতার অমৃতকাল পেরিয়ে এসে রাজনৈতিক সুবিধালাভের উদ্দেশ্যে হিন্দুত্ববাদী দল এই বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করছে— এমনই অভিমত বিরোধী নেতাদের। ইতিহাসের ঠান্ডা ঘর থেকে ‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্ককে তুলে এনে শাসক দল যে অভীষ্টগুলি পূরণ করতে চাইছে, তা হল— প্রথমত, বিভাজনের পালে হাওয়া দেওয়া; দ্বিতীয়ত, মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া; তৃতীয়ত, বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় কংগ্রেসকে সংখ্যালঘু-তোষণকারী বলে চিহ্নিত করা; এবং চতুর্থত, পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘বন্দে মাতরম্’ ও বঙ্কিমচন্দ্রকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে বাঙালি অস্মিতায় উস্কানি দেওয়া।
“মারাঠী নেতারা মাঝে মাঝে প্রমাণ করিতে বসিতেন যে, যেহেতু বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’ গানে সপ্তকোটি কণ্ঠের কথা আছে, ত্রিশ কোটি কণ্ঠের কথা নাই, এবং যেহেতু বাঙালি কবি লিখিয়াছেন ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’, সেই হেতু বাঙালীর জাতীয়তাবোধ অতি সঙ্কীর্ণ। একজন পাঞ্জাবী আর্যসমাজী নেতা তাঁহার বাঙালি-বিদ্বেষ প্রচার করিবার আর কোনও রাস্তা না পাইয়া একদিন বলিয়াছিলেন যে, যেহেতু রামমোহন রায় এদেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রচলন করিবার জন্য ইংরেজ গভর্নমেন্টকে পরামর্শ দিয়াছিলেন, সেহেতু তিনি দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক।”— উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাসিতের আত্মকথায় লিখেছিলেন।
অর্থাৎ, সে যুগে ‘বন্দে মাতরম্’ ঘিরে বিতর্ক প্রাদেশিক বিরোধের কেন্দ্রে ছিল। আজ ছ’স্তবকে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার নির্দেশিকা জারি আদতে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’ আধিপত্যবাদের পটভূমিকায় এক ফলিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলেই মনে হয়।
সরিৎশেখর দাস, কলকাতা-১২২
বিকল্পের সন্ধান
যুদ্ধে ভারত সরাসরি যোগ না দিলেও তার আঁচ একেবারে রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। দেশের প্রয়োজনের সিংহভাগ গ্যাস পশ্চিম এশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। পেট্রলিয়ামও আমদানি করতে হয়, অথবা আমদানিকৃত তেল পশ্চিম এশিয়ার পথেই পরিবাহিত হয়। ফলে এই যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ভারতে তীব্র জ্বালানি-সঙ্কটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই যুদ্ধ না ঘটলেও অদূর ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি দেখা দিত— তার কারণ তেল ও গ্যাসের ভান্ডার কিন্তু অফুরন্ত নয়।
প্রশ্ন হল, বিকল্প জ্বালানির জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? এই বিষয়ে আমাদের বিগত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলিতে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে? সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির উপর এখনই বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে বিদ্যুৎচালিত রান্নার সরঞ্জামের প্রচলন বাড়ানো এবং সুলভ মূল্যে সেগুলির জোগান নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার ও দেশ জুড়ে চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহস্থালির বিদ্যুতের দাম কমানো গেলে তবেই কিন্তু সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎচালিত রান্নার সরঞ্জাম ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন। বৈদ্যুতিক হিটার, মাইক্রোওয়েভ, ইন্ডাকশন চুল্লি, গিজ়ার, মিক্সার— এই সব যন্ত্রের উপর শুল্ক কমানো খুবই প্রয়োজন। সর্বোপরি, এই পরিবর্তনের জন্য দরকার সুসংহত ও সুস্পষ্ট সরকারি নীতি। এখনই যদি বিকল্প জ্বালানির পথে প্রস্তুতি না নেওয়া যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশ জুড়ে এক ভয়াবহ অচলাবস্থা অনিবার্য।
সৌগত মাইতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)