‘পটেল, নেতাজি’ (২৪-১১) শীর্ষক পত্রে লেখা হয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জওহরলালের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের ব্যাপক মতবিরোধ ঘটেছিল, নেতাজির প্রতি নেহরুর ব্যক্তিগত অপছন্দ ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ‘যুদ্ধাপরাধী’দের বিচারের জন্য জার্মানির নুরেমবার্গ ও জাপানের টোকিয়োতে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৬-৪৮ সাল নাগাদ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চলা এই বিচারপর্বে অনেক ক্ষেত্রে বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে, রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্য দিয়ে অক্ষশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান ও সেনানায়কদের নানা অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যার তত্ত্ব বিশ্বময় তুলে ধরা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই একতরফা প্রচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ড. রাধাবিনোদ পাল, খোদ টোকিয়োতেই। তিনি ছিলেন উক্ত সামরিক ট্রাইবুনালের অন্যতম বিচারক। 

তিনি খুব জোরালো ভাষায় নেতাজির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আজ়াদ হিন্দ সরকার ও আজ়াদ হিন্দ ফৌজের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার লড়াইকে এবং জাপানের সহযোগিতাকে শ্রদ্ধা, প্রশংসা জ্ঞাপন করেছিলেন। ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করার জন্য প্রকৃত প্রস্তাবে তাদেরই যুদ্ধাপরাধী বলা উচিত, এ কথা বলতে তিনি দ্বিধা করেননি। তিনি তাঁর ভিন্ন মতের ডিসেন্টিং রিপোর্ট পেশ করেন। 

স্বাধীনচেতা এই বঙ্গতনয়কে জওহরলাল সহ্য করতে পারেননি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন মিটে যাওয়ার পর নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব ড. রাধাবিনোদ পালকেই দেওয়ার জন্য বেসরকারি কমিশন গঠনের ভাবনাও শুরু হয়েছিল। কিন্তু নেহরু তাঁকে ব্রাত্য করে দিয়ে শাহনওয়াজ় খানকে মন্ত্রিসভায় আনেন এবং তিন সদস্যের নেতাজি তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্যও করে দেন।

নেতাজির সেজদাদা সুরেশচন্দ্র বসু, সুভাষচন্দ্রকে যুদ্ধাপরাধী বলা যায় কি না জানতে চেয়ে, নেহরুর কাছ থেকে কোনও সদুত্তর পাননি। প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও, তাঁর স্টেনোগ্রাফার শ্যামলাল জৈন নেতাজি তদন্তে নিযুক্ত খোসলা কমিশনে শপথ নিয়ে জানিয়েছিলেন, নেহরু ১৯৪৫-এর ডিসেম্বরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলিকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন, চিঠির বয়ান তিনি মুখে বলেন। চিঠিটিতে নেহরুর স্বরূপ সহজেই ধরা পড়ে। তাতে ছিল, ‘‘... অত্যন্ত বিশ্বস্তসূত্রে আমি জানতে পেরেছি যে আপনাদের যুদ্ধাপরাধী সুভাষচন্দ্র বসুকে স্ট্যালিন রাশিয়াতে ঢুকতে দিয়েছেন। এটি রাশিয়ানদের পক্ষে পরিষ্কার বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।...’’

উজ্জ্বল কুমার মণ্ডল, শেওড়াফুলি, হুগলি

অর্ধসত্য

‘পটেল, নেতাজি’ পত্রটির অন্যতম বক্তব্য— ১৯৩৯ সালে ‘‘ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশ সদস্য পদত্যাগ করলেও করেননি দু’জন সদস্য— তাঁদের এক জন সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎচন্দ্র, কিন্তু আর এক জন... জওহরলাল নেহরু”— তা অর্ধসত্য মাত্র। ওই সময়ে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার অনুরোধ করে নেহরু এক বার গাঁধীকে চিঠি লিখেছিলেন, এ কথা সত্যি হলেও, তাঁর এই সদিচ্ছার আয়ু খুব বেশি দিন ছিল না। 

সভাপতি নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের কাছে নিজের মনোনীত প্রার্থীর পরাজয়ের পর গাঁধী বিবৃতি দিয়েছিলেন, নির্বাচিত সভাপতির সঙ্গে যাঁরা একমত নন, সেই সব সদস্য ওয়ার্কিং কমিটি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন। তাঁর এই ইচ্ছা বা নির্দেশকে অনুসরণ করেই ১২ জন কমিটি-সদস্য যুক্ত-বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। নেহরু তখনই ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেননি, কিন্তু অচিরেই তিনি আলাদা ভাবে বিবৃতি দিয়ে ওই একই কাজ করেন ও সুভাষচন্দ্রকে নানা ভাবে অভিযুক্ত করেন। অর্থাৎ গাঁধী ও তাঁর অনুগামীদের চাপ বা অভিমত অগ্রাহ্য করে বেশি ক্ষণ সুভাষচন্দ্রের প্রতি সদিচ্ছা দেখানো নেহরুর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

১২ জন সদস্যের একযোগে আর নেহরুর আলাদা ভাবে পদত্যাগের ব্যাপারটি যে সাজানো ছিল ও গাঁধীর নির্দেশেই হয়েছিল তার প্রমাণ নেহরুকে লেখা পটেলের চিঠির এই কথাগুলো: “আমাদের যুক্ত বিবৃতিতে সই দেওয়ার জন্যে অথবা পৃথক বিবৃতি প্রচার করতে অনুরোধ করে যে চিঠি তোমাকে লিখেছিলাম, তার উত্তর বরদৌলিতে পেয়েছি। বাপুই এ ভাবে তোমাকে লিখতে বলছিলেন। ...যুক্ত বিবৃতি তাঁর আদেশেই প্রচারিত হয়েছে’’ (৮-১০-১৯৩৯)। 

যদি সত্যিই নেহরু শেষ পর্যন্ত সুভাষ-সঙ্গ চাইতেন, তা হলে তাঁর ক্রমাগত সুভাষবিরোধী বিবৃতি ও বক্তৃতাতে ক্ষুব্ধ সুভাষচন্দ্র স্বয়ং তাঁকে লিখতেন না, “১২ জন ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য একযোগে আমার বিরুদ্ধাচরণ করে আমাকে হতমান করতে যতটা সমর্থ হয়েছিলেন, তুমি একা করেছ তার চাইতে অনেক বেশি’’ (২৮ মার্চ, ১৯৩৯)।

বৈনতেয় বর্মন, হৃদয়পুর, বারাসত

কষ্টকল্পনা

শান্তনু রায় নেতাজি সংক্রান্ত দু’টি চিঠিতে লিখেছেন নেতাজিকে ‘‘মিত্রশক্তি ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে গণ্য করত’’ (‘নেতাজি রহস্য’, ৭-১১) এবং ‘ক্লিমেন্ট অ্যাটলিকে পত্রে নেতাজিকে 'your war criminal' বলে উল্লেখ’’ করেছিলেন নেহরু (‘নেহরু ও সুভাষ’, ৮-১২)। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, ১৯৪৫-এর ২৩ অগস্ট ব্রিটিশ ভারতের ‘হোম মেম্বার’ স্যর আর এফ মুডি, ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়াভেলের ব্যক্তিগত সচিব স্যর ই এম জেনকিন্সকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রপুঞ্জের ঘোষিত সংজ্ঞানুযায়ী সুভাষচন্দ্র বসুর ক্ষেত্রে ‘যুদ্ধাপরাধী’ তকমা কোনও ভাবেই প্রযোজ্য নয়। এই একই কথা ১৯৬১ সালে বিবৃতি আকারে প্রকাশ করেছিল নয়াদিল্লির ব্রিটিশ হাই কমিশন অফিস।

নেতাজির নাম যে কোনও দিনই কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা, সংগঠন বা ট্রাইবুনালের ‘যুদ্ধাপরাধী’ তালিকায় ছিল না, তা ভারতীয় দূতাবাস বা ভারতীয় হাই কমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারকে জানিয়েছে—

১) ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’ যা ‘টোকিয়ো ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইবুনাল’ নামেই বেশি পরিচিত (৫ মে ১৯৬৭-তে)।

২) ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’, হেগ (৮ মে ১৯৬৭)।

৩) জাপানের বিদেশ দফতর (২০ ডিসেম্বর ১৯৬৭)।

৪) ‘ইম্পিরিয়াল ওয়ার মিউজ়িয়াম’, লন্ডন, ব্রিটিশ বিদেশ দফতর (২৫ নভেম্বর ১৯৯৮)।

৫) ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দফতর (ডিসেম্বর ১৯৯৮)।

৬) ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার (ডিসেম্বর ১৯৯৮)।

৭) ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুনাল’, নুরেমবার্গ (১৯৯৯)।

৮) ‘ইউ এন ওয়ার ক্রাইম কমিশন’ ও ‘সেন্ট্রাল রেজিস্ট্রি অব ওয়ার ক্রিমিনালস অ্যান্ড সিকিয়োরিটি সাসপেক্টস’ নামের সংস্থা দু’টির ‘যুদ্ধাপরাধী’ তালিকায় নেতাজির নাম না থাকার তথ্য ভারতের বিদেশ দফতরকে জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী কমিশন, নিউ ইয়র্ক, ৬ এপ্রিল ১৯৯৯-এ। 

নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে প্রমাণ করতে পত্রলেখক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলিকে ১৯৪৫-এর ২৬ ডিসেম্বর লেখা নেহরুর একটি সইহীন ও আর্কাইভ ছাপহীন জাল চিঠির অংশ 'your war criminal' তুলে ধরেছেন। নেহরু তখন ভারত সরকারের কোনও পদাধিকারী নন, কংগ্রেসের এক জন নেতামাত্র। চিঠিটিতে ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ব্রিটেনের নন, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর অফিস ১০ ডাউনিং স্ট্রিট নয়, ১০ ডাউন স্ট্রিট। বানান-সহ প্রচুর ভুলে ভরা চিঠিটির লেখক নেহরু বলে ভাবাটা নিতান্তই কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কী হতে পারে!

পীযূষ রায়, বেহালা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।