শিশির রায় স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বহুমুখী প্রতিভা ও কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত আলোচনা করলেও (‘‘বাইরে যতটা ‘রয়্যাল’, ভিতরে ততটাই ‘বেঙ্গল’’’, পত্রিকা, ২-৩), আশুতোষের একটি স্মরণীয় কৃতিত্বের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। তা হল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পকলা শিক্ষা বিষয়ে তাঁর অবদান। 

১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি অধ্যাপক পদের সৃষ্টি হয় তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। তার মধ্যে অন্যতম, ভারতীয় শিল্পকলা বিষয়ে অধ্যাপনার জন্য রানি বাগেশ্বরী অধ্যাপক। স্যর আশুতোষ শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ওই পদের প্রথম অধ্যাপক হিসাবে আমন্ত্রণ জানান। শিল্পানুরাগী আশুতোষ শিল্পজগতের সব খবরাখবর রাখতেন। 

তাই অবনীন্দ্রনাথই যে এই শিল্পশিক্ষা তথা শিল্পতত্ত্ব ব্যাখ্যার যোগ্যতম রসজ্ঞ পণ্ডিত, তা বুঝতে তাঁর এতটুকু দেরি হয়নি।

অবনীন্দ্রনাথ অবশ্য প্রথমে ওই পদ নিতে রাজি হননি, প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সরকারি নিয়মকানুন, বাঁধা সময়, ক্লাস— এ সব তাঁর পছন্দ ছিল না। শেষে আশুতোষ নিজে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এসে বুঝিয়ে তাঁকে রাজি করান। মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘‘দাদামশাইও চাকরির বাঁধনে ধরা দেবেন না, আশুতোষও ছাড়বেন না। ...আশুতোষের সঙ্গে কথায় অবনীন্দ্রনাথ পারেননি; আশুতোষের ব্যক্তিত্বের মাধুর্যে, সরলতায়, অকপটতায় তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর আর ‘না’ বলবার উপায় ছিল না।’’ (‘শিল্পায়নের গোড়ার কথা’)।

১৯২১ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অবনীন্দ্রনাথ শিল্প বিষয়ে ২৯টি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যা ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’ নামে বিখ্যাত। এই বক্তৃতামালাকে নন্দলাল বসু রূপকলার আলোচনার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী গ্রন্থ এবং এ যুগে আমাদের মধ্যে রসবোধের উন্মেষসাধনে অতুলনীয় বলে অভিহিত করেছেন। 

এই অমূল্য রত্ন যে আশুতোষের শিল্পবোধ এবং উদ্যোগের ফসল, এ কথা মনে রাখা দরকার। এই শিল্পচেতনায় ১৯২১ সালেই তিনি বুঝেছিলেন, শিল্পশিক্ষা সামগ্রিক শিক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

তা ছাড়া শিক্ষা অসম্পূর্ণ। দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার এই খামতির দিকটা স্যর আশুতোষ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য, শিল্প বিষয়ে এই বক্তৃতা বাংলায় দেওয়ার জন্যও অবনীন্দ্রনাথকে তিনি উৎসাহিত করেন। অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘‘লেকচারের পর 

তিনি আমায় ডেকে বললেন, তুমি বাংলায় বলে ভালই করেছ, আমি 

চাই এখানের সবকটা লেকচার বাংলায় হয়।’’ (‘আশুতোষ’)। এই ভাবে মাতৃভাষায় শিল্পশিক্ষারও প্রচলন আশুতোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে করলেন।

চঞ্চল বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা-৩০

নিরুপমা

‘যে জন রয়ে গিয়েছেন অন্তরালে’ (পত্রিকা, ২৩-২) শীর্ষক নিবন্ধে কিছু সংযোজন করতে চাই। নিরুপমার পিতা নফরচন্দ্র ভট্ট ছিলেন ভাগলপুরের সাব জজ। বিধবা বিবাহের সমর্থক না হলেও তিনি ‘গোঁড়া রক্ষণশীল’ ছিলেন না। তেমনটি হলে শরৎচন্দ্রের মতো ছন্নছাড়া ভবঘুরে চরিত্রের এক অনাত্মীয় তরুণের কাছে তাঁর বাড়ি কি কখনও অবারিতদ্বার হয়ে উঠত? 

দাবা খেলার সূত্র ধরেই সে বাড়িতে তাঁর নিত্য আনাগোনা। তা ছাড়া খেলার সময় ‘চা-পান-তামাক’এর যথেচ্ছ ব্যবহারও তাঁর তীব্র আকর্ষণের অন্যতম কারণ ছিল। সাহিত্যের সঙ্গে গানের নিবিড় চর্চাও চলত সেখানে। তখনকার দিনে ভাগলপুরের মতো জায়গায় এই দুইয়ের অবাধ চর্চা গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হলেও, তোয়াক্কা না করেই ভট্টবাড়ির ছেলেদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রও এ সব নিয়ে মশগুল থাকতেন। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা তাঁর গান শুনে নিরুপমাও মুগ্ধ হতেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত উদারপন্থী এই ভট্টবাড়ির সবার কাছে শরৎচন্দ্র অল্প ক’দিনেই ‘আত্মজন’ হয়ে ওঠেন। 

মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে বিধবা নিরুপমা যখন স্বামীর শ্রাদ্ধের কাজে ব্যস্ত, শরৎচন্দ্র তখন এক ফাঁকে তাঁর জন্য পাড়ওয়ালা শাড়ি আর তাঁরই খুলে রাখা গয়না এনে হাজির, যাতে কাজের শেষে নিরুপমা বিধবার বেশ ছেড়ে এগুলি পরেন। এ হেন দরদি মন ক্রমে দুর্বলতায় ভরে গেলেও,  সামাজিক কারণে সে ভালবাসা পরিণতি পায়নি। কাশীর বন্ধু কবিরাজ হরিদাস শাস্ত্রীর কাছে শরৎচন্দ্র নিজেই কবুল করেছেন, ‘‘প্রথম যৌবনে আমি একটি মেয়েকে ভালবেসেছিলাম। কিন্তু ভালবাসা নিষ্ফল হল...’’ 

শরৎচন্দ্র জীবনভর এই ব্যর্থতার দুঃসহ বেদনা বয়ে বেড়িয়েছেন। আর এই বেদনার আর্তিই প্রকাশ পেয়েছে লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায়কে (কানপুর প্রবাসী মহিলা সাহিত্যিক) লেখা এক চিঠিতে, ‘‘ভীষ্ম যে এক দিন স্তব্ধ হইয়া শরবর্ষণ সহ্য করিয়াছিলেন, সে কথাটা চিরদিনের জন্য মহাভারতে লেখা হইয়া গেল। কিন্তু কত অলিখিত মহাভারতে যে এমন কত শরশয্যা নিত্যকাল ধরিয়া নিঃশব্দে রচিত হইয়া আসিতেছে, তাহার একটি ছত্রও কোথাও বিদ্যমান নাই। এমনি করিয়াই সংসার চলিতেছে।’’

শরৎচন্দ্রের গভীর প্রেমের টান হৃদয় দিয়ে অনুভব করলেও নিরুপমা কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন, ঘুণাক্ষরেও কাউকে তা জানতে দেননি। শরৎচন্দ্রও নারীমনের এ হেন দুর্জ্ঞেয় রহস্য ভেদ করতে পারেননি কোনও দিন। রাধারাণী দেবীকে লেখা এক চিঠিতে এমনই ব্যর্থতার গ্লানি যেন সরব হয়ে ফুটে উঠেছে, ‘‘তোমরা— এই মেয়েরা— তোমাদের আজও ঠিক চিনে উঠতে পারলুম না। নিজের জীবনের অতি কঠিন ও গভীর বেদনায় এই অভিজ্ঞতাই মাত্র সঞ্চয় করতে পেরেছি রাধু।’’ 

নিজের জীবনে যে সাফল্য আসেনি, তাকে তিনি তাঁর সাহিত্যে কখনওই মূর্ত করে তুলে ধরতে পারেননি। তাই পূর্বসূরি বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র এমনকি নাট্যকার গিরিশচন্দ্র তাঁদের রচনায় বিধবার বিয়ে দিলেও, শরৎচন্দ্র কিন্তু পুরোপুরি অসফল। ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের রমা-রমেশ তাই মিলিত হতে পারেননি। অথচ ‘এত বড় দু’টি মহাপ্রাণ নরনারী’ এ জীবনে যে বিফল, ব্যর্থ, পঙ্গু হয়ে গেল— সে কথাও লেখক শরৎচন্দ্র অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন।

নিরুপমাকে না পাওয়ার বেদনা এবং আনুষঙ্গিক ঘটনা শরৎচন্দ্র রাধারাণী দেবীকে জানিয়ে গিয়েছেন। চিঠিতে কিছুটা ‘প্রচ্ছন্ন’ হলেও সাক্ষাতে সব খোলাখুলি ভাবেই ব্যক্ত করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে অবশ্য শপথও করিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে কোনও দিন কেউ এ সব জানতে না পারেন। শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর অনেক পরে রাধারাণী দেবী এক বড় কাজ করলেন, শপথ ভেঙে প্রকাশ করে দিলেন তাঁর সেই সব গোপন কথা। অপরাজেয় কথাসাহিত্যিকের অনেক না জানা কথা এমনই ভাবে প্রকাশ্যে এসে পড়ে। এ প্রসঙ্গে রাধারাণী দেবীর উক্তিটিও মহার্ঘ, ‘‘আজ দূর লোকবাসী শরৎচন্দ্রের কাছে শপথ ভঙ্গ করে, তাঁর মুখ থেকে পাওয়া দু’চারটি কথা আমার দেশের বর্তমান ও অনাগত কালের মানুষদের সামনে প্রকাশ্যে রেখে যাচ্ছি’’ (দেশ, ২৭ ভাদ্র ১৩৮২)। 

শরৎচন্দ্রের থেকে দূরে সরে থাকলেও নিরুপমা কি খুব শান্তিতে জীবন কাটিয়েছেন? মনে হয়, না। অন্তর্বেদনায় তিনিও দগ্ধ হননি কম। কমললতা-র (শ্রীকান্ত, চতুর্থ পর্ব) মতো তিনিও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন, শেষ জীবন কাটান বৃন্দাবনে। আর এখানেও শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর ন’বছর পরে নরেন দেব-রাধারাণীর সঙ্গে তাঁর দেখা। রাধারাণীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘তোমরা আমার কত আদরের জিনিষ। তোমরা শরৎদার রাধু-নরেন।’’ আর এ-ও স্বীকার করেছিলেন, ‘‘শরৎদার যে বাউন্ডুলে দশা হয়েছিল, সে শুধু আমারই জন্য।’’ বুঝতে অসুবিধে হয় না, চোখের জলে ভেজা এই সব কথায় মনের অতলে লুকিয়ে থাকা গোপন, প্রেমেরই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বঙ্কিম বলেছিলেন, স্ত্রীকে বাদ দিয়ে তাঁর নিজের জীবনী লেখা হলে তা হবে অসম্পূর্ণ। স্মরণে, মননে, চিন্তনে যাঁর উপস্থিতি অব্যাহত ছিল, সেই নিরুপমাকে দূরে সরিয়ে রাখলে আলোচনার দিক থেকে শরৎচন্দ্রকেও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

বাণীবরণ সেনগুপ্ত

শ্যামনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।