‘সিঙ্গুরে চাষযোগ্য হয়েছে জমি: মন্ত্রী’ (২৭-১১) পড়ে জানা গেল, ন্যানো কারখানার জমির প্রায় একশো শতাংশই চাষযোগ্য হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী বিধানসভায় আরও জানিয়েছেন, ওই জমিতে আলু, ধান, আনাজ, ডাল ও অন্যান্য ফসলের চাষ হচ্ছে। তা হলে কি অচিরেই ‘সিঙ্গুর প্যাকেজ’ পাওয়া চাষিদের মাসিক ভাতা ও চালের বরাদ্দ বন্ধ হতে চলেছে? মন্ত্রী অবশ্য এমন কোনও ইঙ্গিত দেননি। সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে, জমি চাষযোগ্য হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার উর্বরতার মাত্রা, আলের গঠন অধিগ্রহণ-পূর্ববর্তী অবস্থায় পৌঁছতে দেরি আছে। রাজ্য সরকার ন্যানোর জমিকে এই আধাখেঁচড়া চাষযোগ্য করতে পারাটাকে নিজেদের সাফল্য হিসাবে প্রচার করছে। বিপুল টাকা খরচ করে এই জমিকে চাষের জমি হিসাবে রাখাটা কি রাজ্যের স্বার্থে সত্যিই বিচক্ষণতার পরিচায়ক? এখানে কি চাষির স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে গাড়ি-কারখানার তুলনায় অধিক কর্মসংস্থানকারী, বিপুল সম্ভাবনাময় কোনও আধুনিক শিল্পকেন্দ্র তৈরি করা যায় না? পাঁচটি কারণে এই প্রশ্ন একান্তই প্রাসঙ্গিক।

এক, মূলত জমি সমস্যায় রাজ্যে নতুন বড় শিল্প আসায় খরা চলছে। দুই, জনসংখ্যা ও বেকার সমস্যার রেখচিত্র ঊর্ধ্বমুখী। তিন, রাজ্য সরকারের ভাঁড়ে মা ভবানী। চার, চাষ থেকে চাষির লাভ তলানিতে এসে ঠেকেছে; উপরন্তু চাষির বাড়ির শিক্ষিত ছেলেপুলেরা চাষ করতে চাইছেন না, তাঁরাও চাকরির দাবিদার। পাঁচ, কলকাতা মহানগর ও বিমানবন্দরের সঙ্গে স্বল্প দূরত্বের উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে দেশ তো বটেই, বিদেশ থেকেও সহজে সিঙ্গুরে পৌঁছানো যায়; বিশেষত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি থেকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এখানে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্সের এক বড় শিল্পতালুক গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানে দেশে ইলেকট্রনিক শিল্পের দ্রুত বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাই কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার এই শিল্পের জন্য তালুক গড়ার চিন্তা ভাবনা করছে। চন্দ্রবাবু নাইডুর রাজ্য চাইছে দ্রুত এই শিল্পে দু’লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান করতে (সূত্র: "Can India Turn into Electronics Giant?"/The Hindu Businessline 10/7/2018)। এই অবস্থায় আমরা কি রাজ্যের বেকারদের পুজো, খেলা, মেলা, আর রাজনৈতিক তরজায় বুঁদ করে রাখব?

পশ্চিমবঙ্গকে যাঁরা শিল্পোন্নত করার স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের ভেবে দেখা উচিত, সিঙ্গুরকে কেন্দ্র করে চিনের ‘সিলিকন ভ্যালি’ শেনঝেন শহরের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি করা যায় কি না। হংকং ও গুয়াংঝৌ থেকে মোটামুটি ২৫ ও ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই শেনঝেন শহর ৪০ বছর আগেও ছিল সাদামাটা এক গ্রামীণ অঞ্চল। আজ ইলেকট্রনিক নির্মাণ শিল্পের কল্যাণে সেখানে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস। বিশ্বে এ শহরের আর্থিক গুরুত্ব বোঝাতে একটিমাত্র পরিসংখ্যানই যথেষ্ট: ২০১৮ সালের গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল সেন্টার্স ইনডেক্স অনুযায়ী এ শহরের অবস্থান দ্বাদশ স্থানে। একই বছর ওই ইনডেক্সে নতুন দিল্লি ও মুম্বইয়ের স্থান যথাক্রমে ৮২ এবং ৯২।

আপাত দৃষ্টিতে সিঙ্গুরকে মিনি শেনঝেন হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্নকে তিনটি কারণে অবান্তর মনে হতে পারে। এক, বর্তমান রাজ্য সরকার এমন প্রচেষ্টায় আগ্রহী হবে না। কারণ, ন্যানোর জমিতে শিল্প গড়লে সিপিএমের কাছে তৃণমূলের নৈতিক পরাজয় সূচিত হবে। দুই, সিঙ্গুরের চাষিদের একটা বড় অংশ জমি ছাড়তে অনিচ্ছুক। তিন, যে রাজনৈতিক দলের সরকার চাষিদের জমি নেওয়ার চেষ্টা করবে তার পায়ের তলার রাজনৈতিক মাটি আলগা হয়ে যাবে। এই তিন ধারণাই কিন্তু ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হবে, যদি এককালীন টাকার বিনিময়ে জমি অধিগ্রহণের চিরাচরিত পদ্ধতিটা পাল্টে ফেলা হয়। বামফ্রন্ট সরকার ওই সনাতন পদ্ধতিতে অধিগ্রহণ করতে গিয়ে বহু জমিহারা গরিব চাষির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে অবজ্ঞা করেছিল। এক, দারিদ্র ও স্বল্প শিক্ষার কারণে চাষির হাতে আসা টাকা ধরে রাখার সমস্যা। দুই, অধিগৃহীত জমির ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির সুফল থেকে তাঁর বঞ্চিত হওয়া। তিন, মেয়ের বিয়ে বা ছেলের ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজনে জমি বিক্রি বা বন্ধক দেওয়ার সুযোগ হারানো। বামফ্রন্টের উল্টো পথে হেঁটে যদি তৃণমূল সরকার যথার্থ কৃষক-দরদি হয়ে, এককালীন টাকার পরিবর্তে সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ল্যান্ডবন্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ করে, তা হলে চাষির ওই তিন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে এবং তৃণমূলের নৈতিক পরাজয় ঘটবে না। উপরন্তু, চাষির সমর্থনপুষ্ট শিল্পায়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলে এই সরকারের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাবে।

ল্যান্ডবন্ডের নিয়মাবলি সহজ এবং চাষির বোধগম্য। জমির বিনিময়ে প্রাপ্ত বন্ডের মালিকানা ধরে রাখলে চাষি চাষ থেকে নিয়মিত আয় হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসাবে পাবেন ডিভিডেন্ড। তা ছাড়া জমির স্থানীয় মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাষির বন্ডের দাম সমান হারে বাড়তে থাকবে। ভবিষ্যতে চাষির ইচ্ছামাফিক যে কোনও সময় চাষি তাঁর বন্ড সরকারকে বিক্রি করে বা ব্যাঙ্কে বন্ধক দিয়ে টাকার সংস্থান করবেন। ল্যান্ডবন্ড ব্যবস্থায় চাষিকে যে হেতু এখনই জমির দাম দিতে হচ্ছে না, সে হেতু সরকারের শীর্ণ ভাঁড়ারে তেমন চাপ পড়ছে না। বন্ডের মেয়াদ ৩০ বা ৪০ বছর হলে শিল্পায়নের বলে বর্ধিত বলীয়ান সরকার এই দীর্ঘ সময় ধরে চাষিদের বন্ডের বর্ধিত দাম ধীরে ধীরে মেটানোর সুযোগ পাবে।

তৃণমূল সরকার যদি সিঙ্গুরকে কৃষি আন্দোলনের ‘তীর্থস্থান’ হিসাবে সংরক্ষিত রাখতে এখানে শিল্পের প্রবেশকে কার্যত নিষিদ্ধ করে, তবে তা হবে চরম হঠকারী পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের মতো, সিঙ্গুরেও চাষ থেকে চাষির তেমন লাভ হয় না। লাভের গুড় আসলে যায় সার, বীজ, কীটনাশক, সেচের জল ইত্যাদির ব্যবসায়ী, চাষের ট্র্যাক্টর-মালিক, ফসলের আড়তদার, এবং চাষিকে ঋণ দেওয়া মহাজনের পেটে। আরও মনে রাখতে হবে, সম্ভাবনাময় শিল্প গড়ার জন্য কিছু পরিমাণ তিন ফসলি জমি ধ্বংস হলে ক্ষতি নেই, কারণ সফল শিল্পায়নের ফলে রাজ্যের হাতে আসা অতিরিক্ত রাজস্বের একটা অংশ দিয়ে দু’ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে আর এক ফসলি জমিকে দু’ফসলিতে রূপান্তরিত করার এক প্রকল্প চালু করা যায়।

মানসেন্দু কুণ্ডু

সান্টা বারবারা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ভয়াবহ

আমি ৬৫ বছরের বৃদ্ধ। গত ৫-১১-১৮ তারিখে ৭:৩০ মিনিটের ট্রেনে বিধাননগর স্টেশনে নামি। স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে একটি ‘বার’-এর সামনে চায়ের দোকানে চা খেতে দাঁড়াই। কিন্তু ওই বার-এর সিকিয়োরিটি গার্ড বাধা দিয়ে বলে, বারের সামনে দাঁড়ানো যাবে না। যদিও সেটা ফুটপাত। যত দূর জানি, সরকারি ফুটপাত জনসাধারণের দাঁড়ানো বা হাঁটার জন্য। সেই সময় বেশ কিছু যুবতী বার-এ প্রবেশ করছিলেন। তাঁদের কোনও অসুবিধা না হওয়া সত্ত্বেও, গার্ড আমাকে অপমান করে গালিগালাজ শুরু করলে, আমার দুই সন্তান ও স্ত্রী প্রতিবাদ করেন। তখন ওই সিকিয়োরিটি গার্ড সাত-আট জন বাউন্সারকে বারের ভিতর থেকে ডেকে, আমার দুই সন্তান ও আমাকে নির্দয় ভাবে প্রহার করে। আমার দুই সন্তানকে ফুটপাতের রাস্তায় ফেলে কিল, চড়, ঘুষি, লাথি মারতে থাকে। রাস্তার অসংখ্য জনগণ অবশ্য নির্বাক দর্শক ছিলেন।

ইতিমধ্যে আমার ভাইপো পুলিশে খবর দিলে, পুলিশ ভ্যান উপস্থিত হওয়ার আওয়াজে আক্রমণকারী বাউন্সাররা পিছু হটে। এর পর, উল্টোডাঙা পুলিশ স্টেশনে এফআইআর করেও, আমার সন্তানদের অনুরোধে ব্যাপারটা ‘মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এ মিটিয়ে নিই। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করি। এবং তরুণ এসআই-এর সৌজন্যমূলক ব্যবহার আমদের মুগ্ধ করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল: ফুটপাত জনসাধারণের না বার মালিকের? বার-এর বাউন্সারদের বার মালিকরা পোষে কি সাধারণ মানুষকে নির্দয় ভাবে পেটানোর জন্য?

এস কে চট্টোপাধ্যায়

কাছাড়ি রোড, কাটোয়া

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,
কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।