‘ধর্মজালের ফাঁদ’ (১১-১২) সম্পাদকীয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং জনমানসে স্বচ্ছ চিন্তাধারা গঠনে সক্ষম। প্রসঙ্গত, সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের প্রেক্ষাপটে গান্ধীজি সর্দার বল্লভভাই পটেল এবং কানহাইয়া মানেকলাল মুনশি-কে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন যে, মন্দিরটি সরকারি অর্থে নয়, ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহ করে পুনর্নির্মাণ করা উচিত। বিভিন্ন চিঠিপত্র থেকে দেখা যায়, পণ্ডিত নেহরুর সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের বিষয়ে অনড় বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু মন্দির পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে লিখেছিলেন যে সোমনাথ মন্দিরটি সম্পূর্ণ রূপে ব্যক্তিগত চাঁদা দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এবং তিনি যদি এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন তবে তিনি অস্বাভাবিক কিছু করছেন না, কারণ তিনি নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী অন্য উপাসনালয়ও পরিদর্শন করেন। তা ছাড়া, তিনি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান ঠিক মনে করেননি কারণ সোমনাথ মন্দিরের বহুল ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে এবং আমন্ত্রণটি (সৌরাষ্ট্র) রাজ্যের রাজপ্রমুখের কাছ থেকে এসেছিল, যিনি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানও ছিলেন। রাজেন্দ্র প্রসাদকে নেহরুর প্রত্যুত্তর থেকে বোঝা যায় যে, সেই সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মতপার্থক্যগুলোতেও কী ভাবে অত্যন্ত সৌজন্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা হত। নেহরু বলেন, সোমনাথ মন্দিরে আপনার ভ্রমণের বিষয়ে ১০ মার্চের আপনার চিঠির উত্তর দিতে দেরি হওয়ার জন্য আমি দুঃখিত। আমি ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। তবে যদি আপনার মনে হয় যে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা আপনার পক্ষে ঠিক হবে না, তা হলে আমি আমার বক্তব্য আর জোর দিয়ে বলতে চাই না।
প্রসঙ্গত, ভাকরা-নাঙ্গাল বাঁধের নির্মাণকাজ শুরুর সময়ই ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’ শব্দটিকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এক অন্য তাৎপর্যে ব্যবহার করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ভারতের অগ্রগতির জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণকেই নেহরু ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন।
শুভাশিস মজুমদার, কলকাতা-৯৯
ইতিহাসে অজ্ঞ
‘ধর্মজালের ফাঁদ’ (১১-১২) শীর্ষক সম্পাদকীয়ের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক দু’-একটি কথা। দেশ আজ ধর্মজালের ফাঁদে নয়, আবদ্ধ এক গভীর ধর্মান্ধতার জালে। ফলে দেশে ধর্মব্যবসায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি হয়ে চলেছে। প্রশ্ন জাগে, এটাই কি সেই বাংলা, যেখানে রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের চিন্তা ও কর্মে ভারতীয় নবজাগরণের বিকাশ হয়েছিল? এটাই কি সেই বাংলা, যেখানে এক সময় কলকাতা ছিল ভারতের গর্বের রাজধানী? জাতীয়তাবাদী বাঙালিদের উত্থানে শঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছিল— সে ইতিহাস কি সকলে বিস্মৃত? “হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে, ইন্ডিয়া থিংকস টুমরো”— উক্তিটি মূল্য হারিয়েছে?
ব্রিটিশ শাসকদের ‘বিভেদমূলক শাসন’ নীতির অনুসরণে যারা আজ হিন্দু-মুসলমানে বিভেদ ঘটাতে চাইছে, তারা কি আদৌ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিষয়ে জানে? মনীষীদের লেখা থেকে জানা যায়, উচ্চ বর্গের হিন্দুদের নিপীড়নই বহু নিম্ন বর্গের হিন্দুকে মুসলিম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছিল। সুতরাং, কে ‘বিদেশি’? অথচ আজ উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণার মাধ্যমে সেই ইতিহাস বিকৃত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত।
জানতে ইচ্ছে করে, একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশে গণজীবনের প্রকৃত সমস্যার সমাধানে নির্লিপ্ত থেকে ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা ও অজ্ঞতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কেন?
তপন কুমার সামন্ত, কলকাতা-৯
প্রথম চিন্তক
সন্দীপন মিত্রের লেখা ‘ধর্ম বলতে বুঝতেন ধারণ’ (২৯-১১) শীর্ষক প্রবন্ধের প্রসঙ্গে কিছু বক্তব্য। ভারতের প্রথম ‘আধুনিক মানুষ’ রাজা রামমোহন রায় সেই প্রথম চিন্তক, যিনি ধর্ম ও সমাজের মতো আপাত-বিচ্ছিন্ন ধারণার মধ্যে সংযোগ সাধন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তাঁর জীবন ও সমগ্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে দু’টি বিষয় লক্ষ করা যায়। প্রথমটি ঐতিহ্যের প্রবহমানতা— যে ঐতিহ্য তার নিজস্ব সত্তাকে না হারিয়েও আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয়দের সহজাত ঔদার্য এবং বহুত্ববাদের ধারণা। ব্রাহ্মসমাজ তাঁর কাছে ছিল নানা সংস্কৃতির এক অকৃত্রিম মিলনক্ষেত্র।
রামমোহনের প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদ, পৌত্তলিকতা, নানা ধর্মীয় কুপ্রথা। তিনি ধর্মবিরোধী নন; তাঁর বিরোধিতা ছিল ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়াজালের সঙ্গে। নিদ্রিত জাতির জাগরণে, সমাজে নারীদের সম্মানজনক অবস্থানের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম চালিয়েছেন। সমাজে নারীর স্থান বিষয়ে যে প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেছিলেন, সেটি ইউরোপকেও ভাবিয়ে তুলেছিল। উনিশ শতকের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে যখন নারী এবং শূদ্রদের পবিত্র গ্রন্থাদি পাঠ করা নিষিদ্ধ ছিল, তখন সেই অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক, রক্ষণশীল মানসিকতার বিরুদ্ধে তিনি ছাপার অক্ষরে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের অংশবিশেষ প্রকাশের স্পর্ধা দেখান।
হয়তো, সেই মুহূর্তে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি রামমোহনের চিন্তায় মুখ্য ছিল না বলেই তাঁকে চিহ্নিত করা হচ্ছে ব্রিটিশের ‘চাটুকার’ রাজা হিসাবে; উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে ‘ভারতীয় রেনেসাঁসের জনক’ রাজা রামমোহন রায়ের চিন্তার বৌদ্ধিক বিষয়টি।
স্বাতী চট্টোপাধ্যায়, বহরমপুর
উপকারী শকুন
কিছু সংস্করণে প্রকাশিত ‘মানুষের হাতে পালিত শকুনরা কাজিরাঙায়’ (১০-১২) শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে এই পত্র। পরিবেশের পক্ষে এটি একটি মঙ্গলময় সিদ্ধান্ত। এই প্রসঙ্গে আমি কিছু তথ্যের উল্লেখ করতে চাই। শকুন ভাগাড়ে মৃত পশুর দেহ দ্রুত সাবাড় করে বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা প্রদান করে। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক সহযোগী অধ্যাপক জানিয়েছেন, একটি শকুন একটি গরুর মৃতদেহকে সম্পূর্ণ হাড়ে পরিণত করে মাত্র ৪৫ মিনিটে।
আমাদের অজানতেই আমাদের চার পাশ থেকে শকুনের মতো হারিয়ে যাচ্ছে অজস্র প্রাণী। আজকাল গ্রামে গেলেও শকুনের দেখা মেলে না। নতুন প্রজন্মের কাছে শকুন প্রায় দুর্লভ। অথচ পৃথিবীতে প্রায় ২৬ লক্ষ বছর ধরে শকুনের অস্তিত্ব রয়েছে। নব্বই দশকের পর দক্ষিণ এশিয়া থেকে নাটকীয় ভাবে শকুন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। সত্তর-আশির দশকে শকুনের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালে শকুনকে অনেক সময় উপদ্রব বলেও মনে করা হত। তবে মানুষের কাছে মোটের উপরে শকুন প্রিয় পাখি নয়। কেউ কেউ আবার শকুনকে অমঙ্গলের প্রতীক হিসাবেও দেখেন। পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, গবাদি পশুর ব্যথা কমানোর জন্য ব্যবহৃত একটি ওষুধের অতিরিক্ত প্রয়োগের ফলে মৃত পশুর দেহের মাধ্যমে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং তার ফলে বহু শকুনের মৃত্যু ঘটে। শকুনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাখিকে কার্যত শেষ করে দিয়েছে মানুষের আবিষ্কৃত এই ওষুধ। যদিও ভারতে এই ওষুধের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে।
মানবস্বাস্থ্যে শকুনের ভূমিকা অপরিসীম। ব্যাক্টিরিয়া ও রোগজীবাণু বহনকারী মৃত প্রাণী দ্রুত অপসারণ করে তারা পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখে। শকুনের বিলুপ্তিতে মৃত পশুর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং সেখান থেকে রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। এই নাটকীয় শকুন হ্রাসের প্রবণতা রোধ করে তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলা আজ আমাদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সুব্রত পাল, কলকাতা-৩৮
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)