E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: দ্বারে বসন্তদূত

কলকাতার বসন্ত শহুরে। এখানে পলাশ-শিমুলের বিস্তার কম, কিন্তু আছে কলেজ ক্যাম্পাসের হলুদ শাড়ি, বইমেলার আবহ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা। শহর তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বসন্তকে গ্রহণ করে। কংক্রিটের দেওয়ালের মাঝেও মানুষ রং খুঁজে নেয়।

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:২১

বসন্ত কেবল একটি ঋতুর নাম নয়। এটি পরিবর্তনের দ্যোতক। বাংলা সংস্কৃতিতে বসন্তের উপস্থিতি গভীর ও বহুমাত্রিক। কবিতা, গান, চিত্রকলা— সর্বত্রই এই ঋতুর ছাপ স্পষ্ট। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিতে বসন্ত এক অনন্য রূপ লাভ করেছে। তাঁর বসন্ত-সঙ্গীতে যেমন আছে প্রকৃতির উচ্ছ্বাস, তেমনই রয়েছে অন্তর্লৌকিক জাগরণ। তাঁর কাছে বসন্ত মানে কেবল ফুল ফোটা নয়; এটি আত্মার পুনর্জন্ম। তিনি যে বসন্ত উৎসবের সূচনা করেছিলেন, তা নিছক রঙের উৎসব ছিল না, ছিল মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সংলাপের এক অভিনব প্রয়াস।

কলকাতার বসন্ত শহুরে। এখানে পলাশ-শিমুলের বিস্তার কম, কিন্তু আছে কলেজ ক্যাম্পাসের হলুদ শাড়ি, বইমেলার আবহ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা। শহর তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বসন্তকে গ্রহণ করে। কংক্রিটের দেওয়ালের মাঝেও মানুষ রং খুঁজে নেয়। দোলযাত্রা বা হোলি বসন্তের সামাজিক মাত্রাকে সামনে আনে। রঙের এই উৎসব মানুষের ভেদরেখা মুছে দেওয়ার এক প্রতীকী প্রয়াস। আবিরে রাঙা মুখে মানুষ কিছু ক্ষণের জন্য হলেও নিজেদের পরিচয় ভুলে যায়। সমাজের কঠোর কাঠামোর ভিতরে এই সাময়িক মুক্তি হয়তো স্থায়ী পরিবর্তন আনে না, তবু মানুষের অন্তরে সমতার স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলে।

গ্রামবাংলায় বসন্তের তাৎপর্য আরও বাস্তব। কৃষকের কাছে এটি নতুন চাষের প্রস্তুতির সময়, নতুন ফসলের আশা। মাঠে মাঠে বীজ বোনার পরিকল্পনা, আকাশের দিকে তাকিয়ে আবহাওয়ার হিসাব— এ সবও বসন্তেরই অংশ। আধুনিক সময় বসন্তের চেহারা কিছুটা বদলে দিয়েছে। এখন বসন্ত মানে সমাজমাধ্যমে দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন জাগে, প্রকৃতির সঙ্গে যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এক সময় মানুষের ছিল, তা কি আজও অটুট?

ব্যক্তিগত জীবনেও বসন্তের আগমন ঘটে অন্তরের স্তরে। দীর্ঘ হতাশার পর যখন কেউ আবার স্বপ্ন দেখতে শেখে, সেটাই তার বসন্ত। বসন্তের বৈশিষ্ট্য তার অস্থায়িত্বে। শেষ পর্যন্ত বসন্ত শেখায়, স্থিতি নয়, পরিবর্তনই সত্য। অন্ধকারের পর আলো আসে, ক্ষয়ের পর সৃষ্টি। সে মনে করিয়ে দেয়, আমরা প্রত্যেকেই পুনর্জন্মের সম্ভাবনা বহন করি। তাই বসন্ত কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় চিহ্নিত একটি ঋতু নয়; এটি সময়ের অন্তর্লিখন— যেখানে রং, বেদনা, প্রেম, বিদ্রোহ ও আশার সুর এক সঙ্গে বেজে ওঠে।

শ্রেষ্ঠা সাহা, কলকাতা-৭৫

শান্তির পথে

আমেরিকার খবর এখন কেবলই ভয়-ধরানো, উদ্বেগ-জাগানো। তারই মধ্যে ওয়াশিংটন ডিসিতে সে দিন এক বিরল দৃশ্য দেখা গেল। রাজধানী মহানগরে গেরুয়া পোশাকে, খালি পায়ে, এক দল বৌদ্ধ ভিক্ষু হেঁটে চলেছেন কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউ ধরে, আর অগণিত মানুষ তাঁদের পিছনে। নিঃশব্দে, হাসিমুখে, হাত জোড় করে। ‘ওয়াক ফর পিস’-এর পদযাত্রা এগোচ্ছে ‘ইউনাইটেড স্টেটস ক্যাপিটল’-এর দিকে, আমেরিকার শাসনকেন্দ্রের সেই প্রাসাদোপম স্থাপত্যের অভিমুখে। ১০৯ দিনে ২৩০০ মাইল পথ অতিক্রম করে টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে পৌঁছেছেন এই ভিক্ষুরা— শান্তি, সৌহার্দ ও সচেতনতার বার্তা নিয়ে।

ভার্জিনিয়ার ডামফ্রিজ় শহরের মধ্যে দিয়ে সন্ন্যাসীদের এই পদযাত্রা দেখব বলে যখন পৌঁছলাম, বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শয়ে শয়ে মানুষ রাস্তার দু’ধারে অপেক্ষা করছেন। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ লেখা পোস্টার। কম্বলে মুড়ে স্ট্রোলারে বসিয়ে শিশুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা-বাবারা। কেউ চেয়ার নিয়ে এসেছেন, কেউ বা হুইলচেয়ারে বসে অপেক্ষা করছেন। একগুচ্ছ চন্দ্রমল্লিকা হাতে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলার সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তিনি মেরিল্যান্ড থেকে দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এসেছেন। নাম আইলিন। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। কেন? হেসে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ বলব বলে।” একটু থেমে আবার যোগ করলেন, “এই মুহূর্তে শান্তির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, বন্ধুত্বের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, একে অপরের পাশে থাকার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ওঁরা সেটা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।”

এই ভিক্ষুদের চলার পথে নেই কোনও স্লোগান, গান, বাজনা বা আড়ম্বর। নেই খাওয়া-দাওয়ার প্রদর্শনী। তবু তাঁদের দেখতে ফোর্ট ওয়র্থ, টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত পথের ধারে কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় করেছেন। রাস্তার ধার ঘেঁষে এক সারিতে নীরবে হেঁটে চলা এই মানুষগুলি কোনও কথা না বলেও গভীর ভাবে ছুঁয়ে গিয়েছেন ছোট-বড় সকলকে। আর তাঁদের সঙ্গেই চলেছে ‘অলোকা’— কলকাতার এক পথকুকুর, যে এখন সমাজমাধ্যমে ‘অলোকা দ্য পিস ডগ’ নামে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে।

যখন পৃথিবী জুড়ে কেবল যুদ্ধের খবর, তখন এই ভিক্ষুরা শিখিয়ে দিচ্ছেন, “টুডে উইল বি মাই পিসফুল ডে।” সবাইকে কয়েক মিনিট নীরবে বসে ধ্যান করতে অনুরোধ করছেন। চলার পথে তাঁদের মুখে কেবল এক শব্দ— “সাধু, সাধু।” যাঁরা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, তাঁরাও হাত জোড় করে সেই শব্দই ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

ডামফ্রিজ়-এও অন্যান্য শহরের মতো জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন। দমকা হাওয়ায় কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরছেন, যেন ঠান্ডার কামড় কিছুটা কমে। ঠান্ডা যখন প্রায় অসহ্য, তখন হঠাৎ কেউ বলে উঠলেন, “ওই যে আসছেন!” দূরে সারি দিয়ে সন্ন্যাসীরা এগিয়ে আসছেন। সবার সামনে ভিক্ষু পান্নাকারা— মুখে হাসি, হাতে লাঠি, গায়ে গেরুয়া আংরাখা, কাঁধে ঝোলা। নিঃশব্দে এগিয়ে এসে কারও হাত থেকে ফল নিচ্ছেন, কারও হাত থেকে ফুল। সবাই জোড়হাতে দাঁড়িয়ে। কোনও কথা না বলেও যেন সকলের কথা শুনছেন তাঁরা। এক বিদ্যুতায়িত মুহূর্ত, ভাষায় ধরা কঠিন। অনেকের চোখে জল, আইলিনেরও। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “কিছু একটা যেন ছুঁয়ে গেল।”

খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে এক দল বৌদ্ধ ভিক্ষুর নীরব পদযাত্রা যদি এত মানুষকে একত্র করতে পারে, তবে তার শক্তি কত গভীর, তা অনুমান করা কঠিন নয়। টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসি— ২৩০০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসেছেন তাঁরা। পথে পথে মানুষ তাঁদের থাকার জায়গা দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, প্রয়োজনে ‘অলোকা’-কে চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। নানা শহরের নানা মানুষকে এক অদৃশ্য ঐক্যের সূত্রে বেঁধেছেন এই ভিক্ষুরা।

১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় এই পদযাত্রা শেষ হল লিঙ্কন মেমোরিয়ালে, যেখানে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর ঐতিহাসিক ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন সমতার কথা; আর এই ভিক্ষুরা বলছেন শান্তির কথা। সকাল থেকেই ওয়াশিংটন ডিসিতে মানুষের ঢল নেমেছে, দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বেড়েছে। নেই কোনও স্লোগান, নেই উচ্চকিত আহ্বান। কেবল পদশব্দ, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে ধন্যবাদের নম্র ধ্বনি।

নানা বয়সের, নানান ধর্মের, নানান বর্ণের মানুষ এক সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটছেন। দেখে মনে হল, শুধু শান্তির বার্তা নয়, শুধু সমতার বার্তা নয়, এই নীরব পদযাত্রা যেন সবাইকে নতুন করে মনুষ্যত্বের কথাও মনে করিয়ে দিল।

চন্দ্রাণী রায় সরকার, মেরিল্যান্ড, আমেরিকা

পুলিশ চাই

বাগবাজারের বৃন্দাবন পাল লেনে চোরের উৎপাত বেড়েছে। এখানে পুরনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা অনেকেই কর্মসূত্রে শহরছাড়া, আমাদের মতো বহু বয়স্ক মানুষ একা থাকেন। সন্ধ্যা থাকতেই নেশাগ্রস্তরা এই গলিকে বিশ্রামস্থল হিসাবে বেছে নেয়। রাত বাড়লে শুরু হয় ছিঁচকে চুরি, এসি-র আউটডোর ইউনিট খুলে তার চুরি, গ্রিল কেটে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা। উপরের তলগুলিতে পর্যন্ত ওঠার চেষ্টা হচ্ছে। বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগে এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রশাসনের নজরদারি ও পুলিশি টহল বাড়ানোর আবেদন জানাই।

বিকাশ মিত্র, কলকাতা-৩

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

spring Bengali Culture

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy