মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন যখন কলকাতায় ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে নতুন দু’টি মামলা দায়ের হল সুপ্রিম কোর্টে। পশ্চিমবঙ্গের মোট আট জন তাঁদের নাম বাদ পড়েছে বলে সোমবার সকালেই এই দু’টি মামলা দায়ের করেছেন। নির্বাচন কমিশন ও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিলকিস তরফদার-সহ পাঁচ জন একটি মামলা দায়ের করেছেন। আর একটি মামলা দায়ের করেছেন ওম প্রকাশ শ’-সহ তিন জন।
তাঁদের হয়ে রাজ্যসভায় তৃণমূলের নতুন সদস্য, আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী আজ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে এই মামলার উল্লেখ করে বলেন, ‘‘মামলাকারীদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। তাঁদের নথি গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাঁরা আগের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। এখন তাঁদের নথি নেওয়া হচ্ছে না।’’
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ খসড়া তালিকা প্রকাশের পরেও যাঁদের তথ্যগত অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) কারণে নোটিস পাঠানো হয়েছে, তাঁদের নথি খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘‘আমরা কী ভাবে বিচারকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনব!” গুরুস্বামী বলেন, জন প্রতিনিধিত্ব আইনের ২৩ ও ২৪ নম্বর ধারায় আপিলের সুযোগ রয়েছে। তিনি অনুরোধ করেন, মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নিয়ে মামলাগুলির সঙ্গে যাতে এই শুনানিও হয়। প্রধান বিচারপতি তাতে সায় দিয়েছেন। যাঁরা সিএএ বা নয়া নাগরিকত্ব আইনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনও আবেদন অনুমোদিত হয়নি বলে ভোটার তালিকায় জায়গা পাচ্ছেন না—তাঁদের তরফে দায়ের করা একটি মামলারও উল্লেখ করেন এক আইনজীবী। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আমাদের কি আর কোনও কাজ নেই?”
আইনজীবীদের মতে, সুপ্রিম কোর্টে এই নতুন মামলা দায়েরের ফলে জটিলতা বাড়ল। এমনিতেই ৬০ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ মানুষের নথি খতিয়ে দেখতে বিচারকদের কত দিন সময় লাগবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানাতে পারে, এখনও পর্যন্ত কতটা কাজ এগিয়েছে, পুরো কাজ শেষ করতে কত দিন লাগবে। রাজনৈতিক দলগুলি দাবি তুলেছে, ওই ৬০ লক্ষ নাম নিয়ে ফয়সালা হওয়ার পরেই যেন পশ্চিমবঙ্গের ভোট হয়। এখন আবার যাঁদের নাম বাদ চলে যাচ্ছে, তাঁদের আপিলের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আইনজীবীদের ব্যাখ্যা, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, কারও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে তিনি ইআরও-র কাছে আবেদনের সুযোগ পান। ইআরও-র স্তরে নাম বাদ গেলে প্রথমে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক, তারপরে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। যদি তাঁদের আবেদনের সুযোগ না দিয়েই বিধানসভা নির্বাচন হয়ে যায়, তা হলে এঁরা পরে ভোটার তালিকায় ফিরে এলেও এ বার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না। আবার যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের সকলকে আবেদনের যাবতীয় সুযোগ দিয়ে চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করতে হলে, বিধানসভা নির্বাচন ঠিক সময়ে হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আগামী ৭ মে বিধানসভার মেয়াদ ফুরনোর আগে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করা না গেলে স্বাভাবিক নিয়মে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে। আইনজীবীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অসঙ্গতির-র নথি খতিয়ে দেখার জন্য বিচারক নিয়োগের সময়ই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রাজ্য সরকার ও অন্যান্য মামলাকারীদের সামনে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সময়ের মধ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ না হলে কী হবে! তৃণমূল শিবিরের বক্তব্য, যে এসআইআর করতে দু’বছর সময় দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্বাচন কমিশন তিন মাসের মধ্যে করতে চাইছে বলে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)