আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার দিন থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নীতি হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সবার আগে। তাঁর কথায়, ‘ইউনাইটেড স্টেটস ফার্স্ট’। এর সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতি রেখে ‘আমেরিকার অর্থনীতির পক্ষে বেঠিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’, এমন অভিযোগ তুলে ২০১৬-র ৩ এপ্রিল তিনি দাবি করেছিলেন, ওই চুক্তি থেকে চিন ও ভারত লাভবান হওয়া সত্ত্বেও প্যারিস চুক্তিতে সই করে নিজের খরচ বৃদ্ধি করেছে তাঁর দেশ।
স্মর্তব্য, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ২৬-২৮% হ্রাস করার অঙ্গীকার করেছিল আমেরিকা। একই সঙ্গে শপথ নিয়েছিল তাপবিদ্যুতে রাশ টানার। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিদ্যুৎক্ষেত্রে ওই নিয়ন্ত্রণ তিন বছর আগেই বাতিল করে দিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে উষ্ণায়নকে কর্পোরেট লবির প্রচার এবং চিনের চক্রান্ত বলে জাহির করার পাশাপাশি, প্যারিস চুক্তিকে আমেরিকার স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া ছাড়া অন্য কিছু নয় বলে আখ্যাত করায়, চিন্তায় পড়েছেন ভারত ও আমেরিকার মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। এঁদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের উপরে নজর রাখার জন্য ইসরো ও নাসা যৌথ ভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যে কৃত্রিম উপগ্রহটি তৈরি করেছে, তার কী হবে? পরিবেশ গবেষণায় উপগ্রহ তৈরিতে এর পরে ট্রাম্প কি সায় দেবেন?

অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, বিশ্বে উষ্ণায়নের জন্য মূলত দায়ী উন্নত রাষ্ট্রগুলি। কিন্তু তার সর্বাধিক কু-প্রভাব পড়েছে দরিদ্র ও অনুন্নত দেশের আমআদমির উপরেই। আর সেই কারণে প্যারিস চুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, গরিব দেশগুলিকে অর্থসাহায্য দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ প্রথম বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলি। এর মধ্যে আমেরিকার ৩০০ কোটি ডলারের অনুদান দেওয়ার কথা ২০২০ সালের মধ্যে। ইতিমধ্যে ওবামা জমানায় ১০০ কোটি ডলার দেওয়া হয়ে গিয়েছে। বাদবাকি ২০০ কোটি ডলার অনুদান দিতে অস্বীকার করেছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তদুপরি, আমেরিকার সঙ্গে ঘোরতর অন্যায় হচ্ছে, এই অজুহাতে প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। আর এর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি আক্রমণ করেছেন ভারত ও চিনকে। এই দু’টি দেশ নাকি প্যারিস চুক্তির দৌলতে কোটি কোটি ডলার কামিয়ে নিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন অনমনীয় খবরদারির ইতিহাস সাঙ্গ করবে, পেশিবলের পরকাষ্ঠা দেখাবে না, সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থবুদ্ধির খেলা পরিহার করবে, এমন ভাবনাচিন্তা বাতুলতা।
মানসকুমার রায়চৌধুরী, কলকাতা-২৬

ট্রেন ও গরম

‘গরমে জ্বলছে দেশ, ট্রেনের মধ্যেই মৃত ৪’ (১২-৬) প্রতিবেদনটি পড়লাম। বিগত ১৫ থেকে ১৮ বছরে রেলের আধুনিকীকরণের নামে এবং ব্রডগেজ লাইনের সম্প্রসারণের কারণে, প্রতিটি স্টেশন থেকে এবং রেললাইনের দু’ধার থেকে কয়েক কোটি গাছ ফেলে দিয়ে স্টেশনগুলোকে জ্বলন্ত কড়াইতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। 
গোটা ভারতে একেই তীব্র গরম, দক্ষিণ ভারতে চার-পাঁচটি রাজ্যে বিগত পাঁচ বছর ধরে উপর্যুপরি খরা, সেই কারণে জলের তীব্র অভাব, ‘সামার রেন’-এর লাগাতার অনুপস্থিতি, সবুজ গাছপালাহীন রেলস্টেশন, ৪০০-৫০০ মিটার দীর্ঘ কংক্রিটের জঙ্গল অর্থাৎ কংক্রিটের প্ল্যাটফর্ম, যে উত্তপ্ত কং‌ক্রিটের প্ল্যাটফর্মে কোনও শেড পর্যন্ত নেই আর পড়ে আছে পানীয় জলের কোটি কোটি প্লাস্টিকের বোতল— সব মিলিয়ে এর অনিবার্য পরিণতি বিশ্ব উষ্ণায়নের তীব্রতা। বাস্তবিক, ‘এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস’ বলে কোনও ধারণাই বোধ হয় এ দেশের শাসকদের নেই।

উত্তরবঙ্গের ব্যস্ততম স্টেশন নিউ জলপাইগুড়ি। বছর কুড়ি আগে অন্তত ৭,০০০ শাল, শিশু, সেগুন, গামারি, কাঁঠাল, চাঁপাগাছের সমারোহ ছিল। তার পর শুরু হল স্টেশনের ‘আপগ্রেডেশন’। এখন আর গাছের চিহ্নমাত্র নেই। আলিপুরদুয়ার জংশন স্টেশনেও অসংখ্য গাছ ধ্বংস করে গোটা স্টেশন এবং স্টেশনের সংলগ্ন এলাকা গরম পিচে মুড়ে দেওয়া হল। প্রায় প্রতিটি স্টেশনের সামনে দেড়শো-দু’শো ডিজ়েলচালিত গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে যাত্রীরা একটু ছায়া আর ঠান্ডা জলের জন্য হাহাকার করেন। গোটা চল্লিশ গাছ কেটে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এক প্রকাণ্ড পিচে ঢালা প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করা হল। পাঁচ বছর ধরে সেই প্ল্যাটফর্ম অব্যবহৃত এবং পিচের আস্তরণ ভেদ করে ঘাসও গজিয়ে গিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের আগে সেখানে ছিল এক প্রকাণ্ড বেলগাছ।

গুয়াহাটির দিকে যাওয়ার পথে, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের পর বেলাকোবা স্টেশনে ছিল প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড তালগাছ। বাবুই পাখির বাসাও সেখান থেকে ঝুলে থাকত। সে সবও ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে রেলের পক্ষ থেকে। কারণ উন্নয়ন দরকার! 
শান্তনু বসু, চাঁচল, মালদহ

শেষের সে দিন

যশোর রোডের বৃক্ষনিধন যজ্ঞ শুরু হল আরও এক বার, লোকচক্ষুর আড়ালে দিনের পর দিন শতাব্দীপ্রাচীন গাছগুলি মুখ থুবড়ে পড়ছে অসহায় আর্তনাদে। আমরা যারা আসন্ন জলসঙ্কট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ছয়লাপ করছি, তারা কি সত্যিই জানি, বিশ্ব উষ্ণায়ন, বৃক্ষনিধন, জলবায়ু পরিবর্তন আর জলসঙ্কট— সবই চক্রাকারে এক সূত্রে গাঁথা? আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর তাবড় দেশ, ব্রাজ়িল, কানাডা, এমনকি রাশিয়াও ৫০% বৃক্ষাচ্ছাদিত। এর পরও দেশের আনাচে-কানাচে তাদের বৃক্ষ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা কিংবা প্রাচীন বৃক্ষকে হেরিটেজ ঘোষণা করার উদ্যোগ ঈর্ষণীয়। সেখানে ভারতের ২৪.৩৯% বৃক্ষাচ্ছাদিত এবং যেখানে নিধনপর্ব চলছে সেই বিশেষ রাজ্যে তা মাত্র ১৮.৯৮%। হাবরা থেকে বনগাঁ প্রায় ৫৩ কিমি পথ এবং হাজার পরিবেশপ্রেমীর আন্দোলন, প্রতিবাদ সত্ত্বেও এই বিশেষ জায়গাটিতেই উন্নয়ন ফলাতে সরকার কেন এত মরিয়া, তা মাথায় আসছে না। 

খোদ ব্রিটেন ২০১১-২০১৫ সময়কালে ১০ লক্ষ গাছ রোপণের লক্ষ্যে 'The Big Tree Plant' প্রকল্প এবং বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিরোধে 'Woodland Carbon Code'-প্রকল্প চালু করেছে। সেই ব্রিটেনেরই পদানুসরণ করা এ রাজ্যের প্রকল্পটির নাম বোধ হয় 'The Big Tree Annihilation'!

১৯৪৭-এ কয়েক জন বিজ্ঞানী একটি 'doomsday clock' তৈরি করেন। যার কাঁটা ১২-র ঘর ছুঁলে, বোঝা যাবে পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন। প্রতি বছরই কাঁটার হেরফের হয় পৃথিবীর পক্ষে অশুভ অনেকগুলি সূচকের নিরিখে। ১৯৯১-এ ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে, কাঁটার স্থান ছিল ১২টা বাজতে ১৭ মিনিটে। বর্তমানে সেই ঘড়িতে ১২টা বাজতে ২ মিনিট। সবচেয়ে বড় দু’টি অশুভ সূচক, পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা এবং অবশ্যই, বিশ্ব উষ্ণায়ন। আমাদের অর্ধশিক্ষিত দেশের মানুষ এ রকম নানা পদক্ষেপে ক্রমাগত আমাদের doomsday-র (আক্ষরিক অর্থ: পৃথিবীর শেষ দিন) দিকে নিয়ে যাবে, আশ্চর্যের কী! সঙ্কটমাত্রা পেরিয়ে গেলে বিশ্ব-উষ্ণায়ন 'self-sustaining', কোনও ভাবেই আর প্রতিরোধ করা যাবে না তাকে। 

এই ব্যাপারগুলি নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রনায়কেরা এখন থেকেই সতর্ক না হলে, জলবায়ু কিংবা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁদের অবস্থানে আদৌ পার্থক্য থাকবে কি?

সায়ক সিংহ, কলকাতা-১১০