বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক সি রামচন্দ্র এক বার প্রশ্ন করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে, “আপনি তো গায়ক, সুরকার, প্রযোজক— তিন রকম ভূমিকাই পালন করেছেন। এর মধ্যে আপনার নিজের সবচেয়ে ভাল লাগে কোনটি?” হেমন্তর উত্তর ছিল, “অবশ্যই গায়ক।” অর্থাৎ সুরকার হিসেবে নিজের মূল্যায়নে খানিকটা উদাসীন ছিলেন তিনি নিজেই। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর-রচনা সম্পর্কে বাঁধা গতের কিছু কথা শুনতে আমরা অভ্যস্ত— খুব সহজ সরল সুর করতেন, বেশি খাটতে হত না, ইত্যাদি। একটু মনে করে দেখা যেতে পারে, কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সুর তিনি করেছেন, কাকে দিয়ে কী গান গাইয়েছেন। 

‘আনন্দমঠ’ ছবিতে লতাজিকে দিয়ে গাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের। ‘ফিল্মিস্তান’-এর সঙ্গে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও শিল্পী রাজি হয়েছিলেন শুধুমাত্র সুরকারের অনুরোধে। ছবিটির কথা হয়তো আজকের দর্শক ভুলেই গিয়েছেন, কিন্তু ‘বন্দে মাতরম্’-এর ওই ‘মার্চিং সুর’ আজও দেশাত্মবোধের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ‘হারানো সুর’-এ গীতা দত্তকে দিয়ে ‘তুমি যে আমার’ গানটি গাওয়ানোর জন্য বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁকে। গানটি রেকর্ডিং হওয়ার পরও যখন পরিচালক আর নায়ক মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন, মনে হচ্ছে যেন বেশি ‘ফ্ল্যাট’ হয়ে গেল, সুরকার হেমন্ত কিন্তু বলে গেলেন, চিন্তা নেই, এ গান লাগবেই। ‘নাগিন’ ছবিতে হারমোনিয়াম আর ক্লাভিয়োলিন ব্যবহার করে সাপুড়ের বিনের আওয়াজ সারা ছবিতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ভারত মেতেছিল সেই সুরে। এর জন্যও পরিচালক ও প্রযোজকের সঙ্গে মতানৈক্য হয়েছিল তাঁর। বিনীত যুক্তিতে, অথচ গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের শেষ পর্যন্ত স্বমতে এনেছিলেন সুরকার। 

লতা মঙ্গেশকরকে বাংলা গানের জগতে নিয়ে আসার কৃতিত্ব তাঁরই। শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে। পরে ‘প্রেম এক বারই এসেছিল নীরবে’ গানটি যখন লতাকে দিয়ে গাইয়েছেন, শুনে মনে হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রভাবেই গানটি এত শ্রুতিমধুর। অথচ এই গানেরই সুরে ‘আজ রোনা পড়া তো সমঝে’ গানটি যখন কিশোরকুমারকে দিয়ে গাওয়ালেন, তখন কিন্তু মনে হয় না রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুসারী গান শুনছি। একই গান দু’জন বড় মাপের শিল্পীকে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গায়কিতে গাওয়ানো এবং দু’টি গানই সফল— এক জন সুরকারের পক্ষে এ কিন্তু কম সার্থকতার নিদর্শন নয়।

‘আনারকলি’ ছবিতে সি রামচন্দ্রের অসমাপ্ত কাজ নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন, শুধুমাত্র পেশাদারি বন্ধুত্ব ও সৌজন্যের খাতিরে, অথচ সুরকার হিসেবে নিজে কৃতিত্ব দাবি করতে চাননি। ‘মুক্তি’ ছবিতে পঙ্কজকুমার মল্লিক ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ গানটি, পঙ্কজবাবুর সুর অনুমোদন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। নিজের পরিচালনায় ‘অনিন্দিতা’ ছবিতে যখন গানটি আবার ব্যবহার করলেন হেমন্ত, দু’টি স্তবক বেশি নিলেন। সুরকার হিসেবে শুধু পঙ্কজ মল্লিকের নামই রেখেছিলেন। হেমন্তর আত্মীয়প্রতিম চিকিৎসক ডা. সুবীর মজুমদার জানতে চেয়েছিলেন, শেষ দু’টি স্তবকের সুরকার কে? প্রথমে বলতে চাননি, পরে বলেন, শেষ স্তবক দু’টির সুর তিনি দিয়েছেন, তবে পঙ্কজবাবুর অনুমতি নিয়ে। নিজের নাম যুগ্ম ভাবে সুরকার হিসেবেও রাখেননি, কারণ অগ্রজ ‘পঙ্কজদা’র প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা।

সুরকার হিসেবে সমকালের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মনে প্রভূত শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের জায়গায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তপন সিংহ ‘ক্ষণিকের অতিথি’র সঙ্গীত পরিচালনায় ডেকে নেন তাঁকে। ছবি দেখে হেমন্ত বলেন, “এ তো কাব্য। আবহে আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতই ব্যবহার করব।” কিশোরকুমার ‘লুকোচুরি’ ছবির সুরারোপের দায়িত্ব নিজে না নিয়ে তুলে দেন হেমন্তর হাতে। এই ছবিতে তাঁর নিজের সুরে গাওয়া ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’ অনায়াসে স্থান করে নেয় বিবিসি-র সমীক্ষায় পঞ্চাশ বছরের সেরা গানের তালিকায়। গুরু দত্ত ‘সাহিব বিবি আউর গোলাম’ ছবিতে সুরারোপের জন্য নির্ভর করেন তাঁরই উপর, বলেন, বাংলার সংস্কৃতি-আশ্রিত এই ক্লাসিকের আবহসঙ্গীতের উপর সুবিচার করার মতো আর কে আছে?

তাঁর প্রযোজনায় ও সুরে সমৃদ্ধ ‘নীল আকাশের নীচে’ দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু বলে ওঠেন, "You have done a great service to the nation"; আবার বিদেশি পরিচালক কনরাড রুক্স-এর ছবি ‘সিদ্ধার্থ’-এ সঙ্গীত পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি গেয়ে আসেন সেই ‘নীল আকাশের নীচে’র প্রাণমাতানো গান, ‘ও নদী রে’। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ে তাঁকে স্পর্শ করে প্রবাসী ভারতীয়রা বলে ওঠেন, “ইন্ডিয়াকে টাচ করছি।” আমাদের সুরের আকাশে শুকতারা হয়ে আজও জেগে আছেন তিনি।

পৃথা কুণ্ডু

কলকাতা-৩৫

রামেরই অপমান

2 আমার মনে হয়, যাঁরা রামচন্দ্রকে ঐতিহাসিক চরিত্র এবং অবতার-ভগবান রূপে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করেন, তাঁরা রামচন্দ্র নামটি স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে কাউকে কটাক্ষ করতে পারেন না। কারণ তাঁদের কাছে ‘রাম’ নামটি তো শ্রদ্ধেয়। কিন্তু নামটি এখন মাঠেঘাটে রাস্তায় এমন ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাতে রামচন্দ্রকে  অপমান করা হচ্ছে। যাঁরা রামকে কাল্পনিক বলে মনে করেন, তাঁরা রামকে অতটা সম্মান না-ই জানাতে পারেন, কিন্তু রাম-বিশ্বাসীরা এই ভাবে রামনাম ব্যবহার করলে, তা রামের পক্ষে খুব সম্মানের নয়। যে ভাবে রামের নামে ধ্বনি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে কি কোনও আন্তরিকতা আছে? শ্রদ্ধা আছে?

দিলীপ গায়েন 

রূপনগর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা 

ভুলে ভরা

2 টেলিভিশনে দৈনন্দিন সান্ধ্য রাজনৈতিক বিতর্কের আসর। তৃণমূল ও বিজেপির দু’জন করে প্রতিনিধি উপস্থিত। তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে সিপিএমের রাজনীতির তুলনা টানতে গিয়ে বিজেপির এক অধ্যাপক নেতা বললেন, ‘‘তা হলে কি বলতে হবে, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভাষায়, ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে’...’’। কথাটা যে এস ওয়াজেদ আলী-র, সেই সংশোধনটুকু কেউ করে দিলেন না, সঞ্চালকও না, তৃণমূলের দুই অধ্যাপক তর্কবাগীশও না। 

সুশোভন সরকার

কলকাতা-২৫

হয়বদন

2 ‘হয়বদন’ নাটকের সমালোচনায় (‘সম্ভাবনাময় নাটকের...’, পত্রিকা, ৮-৬) লেখা হল ‘‘ইংরেজি Hayvadana শব্দের অর্থ হল মানুষের শরীরে ঘোড়ার মাথা।’’ সংস্কৃত ‘হয়’ শব্দের অর্থ ‘ঘোড়া’। আর ‘বদন’ কথাটির অর্থ ‘মুখ’। ‘হয়বদন’ বলতে ঘোড়ামুখো বোঝায়, যেমন ‘হয়গ্রীব’ বলতে বোঝায়, ঘোড়ার মতো গ্রীবা। এগুলি ইংরেজি শব্দ নয়।

স্বপন ভট্টাচার্য

কলকাতা-৪০

অন্য কাগজ

2 বাণীবরণ সেনগুপ্তের চিঠির (‘স্বতন্ত্র ও অনন্যা’, ৫-৬) এক তথ্যভ্রান্তির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই চিঠি। উনি লিখেছেন “জবাব দিয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। ১৮৮৩-র ২ জুলাই লেখা হল...” ১৮৮৩ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার (প্রকাশ শুরু ১৯২২ সাল থেকে) কোনও অস্তিত্ব ছিল না। কাগজটির নাম হবে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’। এক সময়ের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক অমৃতবাজার ১৮৬৮ সালে বাংলা কাগজ হিসাবে যাত্রা শুরু করে। স্বদেশি মনোভাবাপন্ন দেশীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলির কণ্ঠরোধের জন্য ভার্নাকুলার প্রেস আইন চাপিয়ে দেওয়া হলে এর দৃঢ়চেতা সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ কাগজটিকে রাতারাতি ইংরেজি কাগজ হিসাবে প্রকাশ করতে থাকেন।

বুদ্ধদেব চট্টোপাধ্যায়

কুলটি

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।