সংসদে ৩৭০ ধারা নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন অমিত শাহ বলছিলেন, তাঁরা যখন একটা পুরসভা আসনেও জিততেন না, তখনও তাঁরা ৩৭০ ধারা বাতিলের পক্ষে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে অমিত শাহরা যে শিক্ষায় শিক্ষিত তাতে এটা খুব স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গত। অমিত শাহদের শিক্ষাগুরু এম এস গোলওয়ালকরের লেখা ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড’ বইতে অত্যন্ত সযত্নে এই আত্ম এবং অপর নির্মাণের প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হয়েছে। গড়া হয়েছে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর।

আজকাল অনেকেই বিতর্কটা তুলছেন যে সংবিধান গৃহীত হয়েছে ১৯৪৯ সালে আর কাশ্মীরের ভারতভুক্তি হয়েছে ১৯৪৭ সালে অর্থাৎ কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পর জওহরলাল নেহরু এবং কংগ্রেসের বদান্যতায় কাশ্মীরকে সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, এটা অযৌক্তিক।

যাঁরা এই প্রশ্নে কংগ্রেস এবং জওহরলাল নেহরুকে কাঠগড়ায় তুলছেন, তাঁরা আসলে ইতিহাসের একটা অধ্যায়কে পর্দার আড়ালে ঢেকে ফেলতে চাইছেন। সংবিধান গৃহীত হওয়ার অনেক আগে ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ জম্মু এবং কাশ্মীর এবং ভারত সরকারের মধ্যে এক চুক্তি হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন কাশ্মীরের পক্ষে মহারাজা হরি সিংহ এবং ভারতবর্ষের পক্ষে লর্ড লুইস মাউন্টব্যাটেন। এই চুক্তির নাম ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশন’ (জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর)। এতে পরিষ্কার বলা আছে কাশ্মীরের মাটি থেকে অনুপ্রবেশকারীদের হটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরেই কাশ্মীরের জনগণের গণভোটের রায়ে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ অবস্থান স্থির করা হবে। এই চুক্তির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই এসেছে সংবিধানের ৩৭০ ধারা। সেই জন্য এই ধারাটি শুরুই হচ্ছে ‘অস্থায়ী ব্যবস্থা’ কথাটি দিয়ে। এখানে জওহরলাল নেহরু কোথায়? পক্ষপাত, অযৌক্তিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া কোথায়?

কাশ্মীরের জনগণের মতামত ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি উপেক্ষিত। কারণ আত্ম এবং অপর নির্মাণের প্রক্রিয়ায় কাশ্মীরের মানুষ ‘অপর’। কাশ্মীরের ক্ষেত্রে রাজা ছিলেন হিন্দু আর প্রজারা মুসলিম। ঠিক এর উল্টো ছবিটা দেখব জুনাগড়ে। এখানে নবাব মহম্মদ মহবত খানজি তৃতীয়, মুসলমান শাসক আর প্রজারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। জুনাগড়ের নবাব ১৫/৯/১৯৪৭ তারিখে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশন’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানের সঙ্গে। ফলে জুনাগড়কে তিন দিক থেকে ঘিরে ভারত সরকার তার সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। জুনাগড়ের খাদ্য পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জুনাগড়ের নবাব করাচি পালিয়ে গিয়ে সেখানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। বল্লভভাই পটেল পাকিস্তানকে চুক্তি বাতিল করে জুনাগড়ে গণভোট করতে বলেন এবং এ জন্য সময় নির্ধারণ করেন। এর পর তাঁর নির্দেশে ভারতীয় সৈন্য জবরদস্তি জুনাগড় দখল করে নেয় এবং গণভোট সংগঠিত করে। গণভোটের রায় ভারতের পক্ষে যায়। আত্ম এবং অপর নির্মাণে জুনাগড় আত্ম, তাই গণভোটের ব্যবস্থা।

এত দিন ৩৭০ ধারা বজায় রেখে কাশ্মীরের মানুষের উপর চালানো হত আফস্পা, ইউএপিএ-র মতো দানবীয় সমস্ত আইন। বন্দি ও নিখোঁজ কাশ্মীরিদের বাবা-মায়েদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব পেরেন্টস অব ডিসঅ্যাপিয়ার্ড পারসন্স’ এবং ‘জম্মু ও কাশ্মীর কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটি’র রিপোর্টে কাশ্মীরের মানুষের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের টুকরো টুকরো ছবি উঠে এসেছে। বর্তমান শাসকদের ভাবনার সঙ্গে অদ্ভুত মিল আছে জার্মানির নাৎসি পার্টির নেতা হিটলারের চিন্তার। হিটলার তার ‘মেন কাম্‌ফ’-এ বলছেন, জার্মানিকে যদি বাঁচতে হয় তবে তাকে সীমানা ভেঙে অন্য রাজ্য জয় করার জন্য বেরোতে হবে। জার্মানির প্রয়োজন আরও ভূখণ্ড, কিন্তু এই ভূখণ্ডকে উপনিবেশ বানালে জার্মানির সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে জার্মানির মানুষদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে জার্মানির মানচিত্র পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

কাশ্মীরেও ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে ঠিক এটাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কাশ্মীরের ভূখণ্ডটা হিন্দু ভারতের প্রয়োজন। উপনিবেশ বানালে হবে না, এখানে হিন্দু ভারতের অধিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাই আওয়াজ উঠছে কাশ্মীরে জমি কেনো, কাশ্মীরের মেয়েকে বিয়ে করো ইত্যাদি। সব কিছুরই লক্ষ্যটা কিন্তু এক, কাশ্মীরে হিন্দু ভারত নির্মাণ করতে হবে।

সন্দেহ হয়, ৩৭০ তুলে দিয়ে হিন্দু ভারতের জমি দখলের প্রক্রিয়াটা শুরু হল। ধীরে ধীরে মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরকে হিন্দুপ্রধান কাশ্মীরে পরিণত করা হবে। কাশ্মীরের পর আজাদ কাশ্মীর, আকসাই চিন, বাংলাদেশ ইত্যাদি অঞ্চলগুলি হিন্দু ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার কথা ইতিমধ্যেই আলোচিত হচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে আফগানিস্তানও সম্ভবত এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে, কারণ গোলওয়ালকর তাঁর বইতে লিখেছেন, ‘‘আফগানিস্তান একসময় হিন্দু ভারতের গান্ধার রাজ্য ছিল। পরবর্তী কালে তা মুসলিম শাসনের অধীন হয়।’’

বিশ্বজিৎ হালদার

চুঁচুড়া, হুগলি

 

কাশ্মীরে সূর্যোদয়

৩৭০, ৩৫এ সংবিধানে সংযোজন করার ব্যাপারে সক্রিয়তা তৎকালীন কোন কোন রাজনীতিবিদের মধ্যে ছিল বা অতিসক্রিয় কে ছিলেন, সেটা নিয়ে বিবাদ অনন্তকাল চলবে। কিন্তু যে ব্যাপারটার উল্লেখ কেউ করছেন না, সেটা হল কাশ্মীরের বাসিন্দারা কি কাশ্মীরের ভারতে অন্তর্ভুক্তির পর এ যাবৎ খুব সুখে ছিলেন? ভারতের বিভিন্ন অংশে যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে কাশ্মীরে কি তা হয়েছে? কাজের সূত্রে কাশ্মীর যাওয়ার কয়েক বার সুযোগ হয়েছে। জম্মু, কাশ্মীর, কার্গিল বা লাদাখের কিছু অংশের রাস্তাঘাট ভাল, যা সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রয়োজনে তৈরি করা। এ ছাড়া কাশ্মীর কিন্তু যথেষ্ট অনুন্নত এবং কাশ্মীরবাসীরা গরিবই থেকে গিয়েছেন। যাঁরা চাকরি করেন বা ব্যবসাবাণিজ্য করেন, তাঁরা অপেক্ষাকৃত ভাল আছেন। তবে তাঁদের অনেকের মধ্যেই স্বাভাবিক কারণে ভারতবিরোধিতা প্রকট।

কাশ্মীরে শাসকের মুখ পাল্টেছে কিন্তু শাসন পাল্টায়নি। কাশ্মীরের রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার আগে অবধি কখনও মুফতি মহম্মদ সরকার, কখনও ফারুক সরকার, কখনও মেহবুবা মুফতি সরকার, কখনও ওমর আবদুল্লা সরকার। এ যেন এক গট-আপ ম্যাচ। হবেই বা না কেন? জম্মুতে কাশ্মীরের থেকে লোকসংখ্যা অনেক বেশি, যেটা আরও বেড়েছে কাশ্মীর থেকে পণ্ডিতরা বিতাড়িত হওয়ার পর। তবুও জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায় কাশ্মীরের বিধায়ক সংখ্যা ৪৬ আর জম্মুর ৩৭— অথচ জম্মু ও কাশ্মীর দুই অঞ্চলেই দশটা করে জেলা। রাজ্যসভায় জম্মু থেকে প্রতিনিধিত্ব মাত্র একটা। কাশ্মীর থেকে তিনটে। তাই জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভা গঠনের পর থেকেই সংখ্যার জোরে জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায় কাশ্মীরের প্রাধান্যই বলবৎ থেকেছে। বিধানসভায় তাঁরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয়ে মুখ খোলেন না। প্রশ্ন করেন না যে এত পাথর কোথা থেকে আসছে? এত বন্দুক, গুলিই বা কোথা থেকে আসছে। বা, ওই ছোট বাচ্চারা যারা কিছুই বোঝে না, হাতে পাথর তুলে নিলে তাদের পুরস্কারই বা কী?

কাশ্মীরকে এই পাকিস্তান মদতে পুষ্ট উগ্রপন্থীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ৩৭০ ধারা থেকে মুক্তি দিতেই হত। এর সঙ্গে প্রয়োজন উগ্রপন্থীদের ফান্ডিং-এর উৎসগুলো খুঁজে নির্মূল করা, যা জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভা জীবিত রেখে কখনওই সম্ভব হত না। সর্বোপরি, ৩৭০কে বাঁচিয়ে রাখলে কাশ্মীর বাকি দুনিয়ার চোখে ‘ডিসপিউটেড টেরিটরি’ হয়েই থেকে যেত, সে আমরা যতই মুখে ‘কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ’, বলে আওড়াই না কেন।

সৈকত মাধব গঙ্গোপাধ্যায়

কলকাতা-৪২

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

 

ভ্রম সংশোধন

‘মধ্যস্থ হবেন না ট্রাম্প’ শীর্ষক সংবাদে (২৭-৮, পৃ ১) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে ১৯৪৭ সালের বদলে ১৯৮৭ সাল লেখা হয়েছে। ‘দাড়িতে দাঁড়িয়ে কিউবা আজও’ শীর্ষক খবরে (২৭-৮, বিদেশ) ফিদেল কাস্ত্রোর বক্তব্যে ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে দিন....’ লেখা হয়েছে। তা হবে ‘যে দিন সু-প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারব, সে দিন দাড়ি কেটে ফেলব’। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলির জন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।