‘দেশ-দ্রোহ’ (৭-৩) সম্পাদকীয়-র জন্য ধন্যবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতার স্বীকৃতি ছাড়া কোনও আধুনিক রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না। ধর্মনিরপেক্ষতার চিন্তা কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মস্তিষ্কপ্রসূত নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে সমাজবিকাশের স্বাভাবিক নিয়মেই এর উদ্ভব। ধর্মনিরপেক্ষতাকে অস্বীকার করলে প্রকাশ্যেই বলতে হবে, গণতন্ত্র মানি না। কিন্তু গণতন্ত্রের নির্বাচনব্যবস্থা মানি, আর ধর্মনিরপেক্ষতা মানি না— গণতন্ত্রের এমন খণ্ডিত সংজ্ঞা হতে পারে না। ভারত স্বাধীন হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি নিয়েই।
ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সামনে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেন্দ্রে তাদের এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসন, কিংবা অন্য রাজ্যগুলিতে তাদের সরকার— কোথাওই মানুষের জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে এমন কোনও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি, যা দিয়ে দেশের নাগরিকদের আস্থা অর্জন করা যায়। তাই ধর্মের আশ্রয় নেওয়া, মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করা। মানুষের মনে যদি কোনও ভাবে এই ধারণা প্রবেশ করানো যায় যে, তাঁদের ধর্ম বিপন্ন, এবং তার জন্য কোনও শত্রুকে চিহ্নিত করে দেওয়া যায়, তবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান বা সামাজিক নিরাপত্তার দাবি সহজেই পিছনে ঠেলে দেওয়া যায়— যা নির্বাচনে জিততে সুবিধা করে দেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই রাজনীতি কি সব সময় সুবিধা দেয়? মানুষকে কি তার প্রাথমিক প্রয়োজনের কথা দীর্ঘদিন ভুলিয়ে রাখা যায়? যাঁরা ভোলাতে চান, তাঁরা হয়তো তাই মনে করেন। কিন্তু বাস্তব সব সময় সে কথা বলে না। এ রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিই তার উদাহরণ। নেতারা ভেবেছিলেন, তাঁদের ধর্মের বটিকা বোধ হয় রাজ্যের মানুষের কাজে লেগেছে। কেউ কেউ যে গ্রহণ করেননি, এমনও নয়। কিন্তু যখনই এসআইআর কার্যকর হল, মানুষ ভয়াবহ হয়রানির মুখে পড়তে শুরু করল— ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া, বিচারাধীন অবস্থায় অনিশ্চয়তায় ঝুলে থাকা, দেশ জুড়ে বাংলাভাষীদের অবিরাম হেনস্থা— সবই মানুষের মোহভঙ্গ ঘটিয়েছে। ধর্মের বটিকায় কাজ হয়নি; মানুষ আর সেই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে গৈরিক শিবিরের সামনে দু’টি পথ। হয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন, নয়তো আরও শক্তিশালী কোনও বটিকার সন্ধান।
সমুদ্র গুপ্ত, কলকাতা-৬
দুর্ভাগ্যজনক
‘দেশ-দ্রোহ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে কিছু কথা। লেখাটিতে আলোচিত বিরোধী দলনেতার মন্তব্যগুলি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের মনে রাখা উচিত যে সুপ্রাচীন কাল থেকেই ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ভারতীয় ঐতিহ্যের অংশ। তর্কপ্রিয় ভারতীয় শীর্ষক গ্রন্থে অমর্ত্য সেন যুক্তি ও তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন— বেদের যুগ থেকেই এ দেশে ঈশ্বরে বিশ্বাসের পাশাপাশি প্রশ্নশীল নাস্তিকতার ধারণাও সমান ভাবে বহমান। বৌদ্ধ ধর্ম তো অনেকটাই নাস্তিকতার অনুসারী। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে মোগল শাসকেরাও ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারা বজায় রেখে রাজত্ব পরিচালনা করেছেন। সে সময় ধর্মীয় বিদ্বেষজনিত হানাহানির ঘটনা ইতিহাসে সে ভাবে আছে কি?
ঔপনিবেশিক শাসনকালেই ইংরেজদের বিভাজননীতির কারণে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত ঘটে এ দেশে। সেই বিষাক্ত নীতির পরিণতিতেই দেশভাগের যন্ত্রণা, যার ভার আজও বহন করে চলেছি।
স্বাধীনতার পরে বিগত আট দশকে এ রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতার জিগির খুব একটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। অনেক অভাব-অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মোটামুটি বজায় থেকেছে। অতীতে রাজনৈতিক নেতাদেরও এ ধরনের বিষোদ্গার করতে সচরাচর দেখা যায়নি। রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-সহ নানা বিষয়ে সমালোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এই আমলে ভেঙে পড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসনিক অদক্ষতা— এ সবই গণতান্ত্রিক পরিসরে বিরোধীদের তোলার কথা। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজও সেটাই। সে সব ছেড়ে কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতি বিরোধী দলের কাছে কাম্য নয়।
একই সঙ্গে এ কথাও বলা প্রয়োজন— এর আগেও নেতারা এমন দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করে পার পেয়ে গিয়েছেন, এ বারও হয়তো যাবেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বিদ্বেষমূলক মন্তব্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে দল ও প্রশাসনেরও উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাই শেষ ভরসা রাখতে হয় এ দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের উপরেই— যাঁরা এমন সাম্প্রদায়িক প্ররোচনায় প্রভাবিত না-হয়ে রাজ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রেখেছেন। আগামী দিনেও সেই শুভবোধের উপরেই ভরসা রাখা ছাড়া উপায় কী?
কৌশিক চিনা, মুন্সিরহাট, হাওড়া
উদ্বেগজনক
‘দেশ-দ্রোহ’ সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে কিছু কথা। দেশের শাসকরা অনেক দিন ধরেই দেশের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটিকে সংশোধন করতে উদ্যত। তাই কথায় কথায় নেতাদের হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী হয়ে ওঠা কোনও বিস্ময়কর ঘটনা নয়। কিন্তু সে কথা যখন আক্ষরিক অর্থেই কোনও নেতার মুখে প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয়, তখন তা কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেই প্রতিভাত হয়।
হিন্দুত্ববাদের হাত ধরেই এই দলটির জয়পতাকা যে ক্রমশ সুপ্রোথিত হয়েছে, তা বলা বাহুল্য। তাই বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে নিজেদের দিকে টেনে আনা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য— এ কথা বলা অত্যুক্তি নয়।
হিন্দুরাষ্ট্রের যে খোয়াব ঘিরে এত আলোড়ন, তা আজ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির কল্পনাসঞ্জাত নয়। ভারতের গৈরিক রাজনৈতিক পরিসর অন্তত একশো বছর ধরে সেই ধারণাকে লালন করে এসেছে। সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই বাস্তবের রূপ পেয়েছে। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠাও সম্পূর্ণ হয়েছে।
দিকে দিকে বিশেষ স্টিকার সাঁটানো গাড়ির রণহুঙ্কার, ‘বন্দে মাতরম্’ বনাম ‘জনগণমন’-এর কৃত্রিম দ্বন্দ্ব, বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে অযথা চাপানউতোর— এ সবই এখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির হাতিয়ার। পরধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং বিদ্বেষ-বিভাজনকে জিইয়ে রাখাই এখন দেশের শাসক রাজনীতির অন্যতম কৌশল। সেখানে তাঁদের রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যেও কেন্দ্রের সেই বিভাজনের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে— এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি এখনও সংবিধান থেকে মুছে যায়নি, এবং রাষ্ট্র এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে হিন্দুত্ববাদী পরিচয় গ্রহণ করেনি। যদিও বিরোধী দলগুলি চরম হিন্দুত্বের প্রতিরোধ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নরম হিন্দুত্বকেই প্রচারের আলোয় এনে ফেলেছে— সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।
অন্য দিকে, সংখ্যালঘু তোষণের নির্লজ্জ আস্ফালন বহু ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু রাজনীতির ভিতকেই শক্তিশালী করেছে— এ কথাও অস্বীকার করা যায় না। ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শক্তিকেই এ দেশে নতুন করে সংগঠিত হতে হবে।
সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া
সীমারেখা
‘রাষ্ট্রপতির ক্ষোভ, পাল্টা মুখ্যমন্ত্রীর’ (৮-৩) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এই চিঠির অবতারণা। মনে হতে পারে, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের শিকার হতে হল মাননীয়া রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে। তবে মনে রাখা জরুরি— রাষ্ট্রপতির পদ জাতি, ধর্ম, বর্ণ— সব কিছুর ঊর্ধ্বে। সেখানে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত পরিচয়ের কোনও স্থান নেই। একটাই পরিচয়— তিনি আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি।
শিবু সোরেন, নীলডাঙা, বীরভূম
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)