• বন্‌ধ, ধর্মঘট নিয়ে আমজনতা আজকাল বিশেষ মুখ খোলেন না। খুললেও বামপন্থীরা তাকে তেমন গুরুত্ব দেন না। অনেক সময় তাঁরা বলার চেষ্টা করেন, মানুষ ভুল করে, কাজেই মানুষকে বোঝাতে হবে। মুশকিল হল, নেতারা মানুষের ভুল ধরতে পারেন, নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন না। মানুষ কী ভাবছে তা বুঝতে মানুষের কথা শোনা যে দলের কর্তব্য— এ কথা বড়জোর বক্তৃতায় (‘মানুষ শেষ কথা বলবেন, মানুষের স্বার্থে এ লড়াই’— গোছের ধরাবাঁধা বুলিতে) স্থান পায়, যথার্থ সংবেদনশীল মন নিয়ে জনগণের কথা ভাবার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় না। সিপিএম নেতা গৌতম দেব অবশ্য বলেছেন, যে সিপিএম পরাজিত হয়েছে সে সিপিএমকে আর ফিরিয়ে আনা হবে না। কোন সিপিএম ফিরবে তবে? পরিবর্তিত সিপিএমের চেহারাটা তো এখনও ঝাপসা। নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ বা অবস্থানকে গর্বভরে মেলে ধরার মতো পরিস্থিতি আজ আর নেই, বামেরা দক্ষিণপন্থীদের চেয়ে আলাদা, এ কথাটা বুক বাজিয়ে ঘোষণা করার মতো দৃঢ়তাও কি আছে? কংগ্রেসিরা বড়জোর সেকুলার বা দেশপ্রেমিক, কিন্তু কমিউনিস্টরা মানবিক— এ যুক্তি-আবেগে লালিত হয়ে যাঁরা এক দিন কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিলেন, এ সময় তাঁরা অনেকেই আত্মকণ্ডূয়ন কিংবা কালক্ষেপণে দিন কাটাচ্ছেন। সভা বা মিছিলে জনসমাগম বাড়লে সাময়িক উদ্দীপনা বাড়ে, কিন্তু তাতে মুশকিল আসান হয় না। শক্তপোক্ত নেতা চাই, মজবুত সংগঠন চাই, নয়তো দলকে কোনও সঙ্কল্প-সমরে কিংবা সমর-সঙ্কল্পে হাজির করা যায় না। 

তবে এ বারের ধর্মঘটে সিপিএম দলের জারি করা কড়া নির্দেশিকায় ফল ফলেছে। নয়তো কর্মীরা এত মিছিল-পিকেটিং করতেন না, দলে দলে গ্রেফতার বরণ করতেন না। সাময়িক হলেও উজ্জীবিত হয়ে ওঠা কর্মীদের কাজকে আমজনতা কী চোখে দেখছে তা-ও বোঝা দরকার। ধর্মঘটের দু’দিন কিছু কথা কানে এল। ‘‘এক দিন হলেই ঠিক ছিল, দু’দিন বন্‌ধ মানা যায় না’’, ‘‘ওই তো কলাপাতা ফেলে দেবে, ট্রেন বন্ধ হয়ে যাবে’’, ‘‘বন্‌ধ মানে কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাওয়া গেল’’— ইত্যাকার মন্তব্যে শহরবাসীর অনেকেই ধর্মঘট সম্পর্কে পুরনো বিতৃষ্ণাকেই উগরে দিলেন। ধর্মঘটবিরোধী যে মনটা দীর্ঘ দিনের বন্‌ধ-কালচারে গড়ে উঠেছে তা সহজে বদলাবার নয়, নেতারা সে কথা ভাবেন না। তাই আন্দোলনের ভাষা এবং ভঙ্গিও বদলায় না।

ধর্মঘটের দিন হামলার ঘটনাও ঘটেছে। শাসক দল হামলা চালিয়েছে— এ অভিযোগকে মান্যতা দিয়ে সিপিএম নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, ‘‘এ রাজ্যে বিজেপির সবচেয়ে বড়ো প্রতিনিধি তৃণমূলই।’’ তৃণমূল-বিজেপিকে এক বন্ধনীতে ফেলার যে রাজনীতিতে সিপিএম মশগুল থাকতে চায়, সেটা প্রকাশ পেল। তাতে কী? শাসক দলকে কি কোণঠাসা করা যাচ্ছে? দেশের রাজনীতি মসিহা-নির্ভর, রাজ্যেও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। কারণ কী?

এক, প্রতিবাদের রাজনীতিকে সম্বল করে মমতার উত্থান ঘটেছে। সে কারণে তিনি জননেত্রী। দুই, দলের কর্মীরা যা-ই করুন, তাকে সামাল দিতে জানেন নেত্রী, জনমনে এ বিশ্বাস উৎপাদনেও তিনি সফল। কাজেই মানুষ নেত্রীর ওপর আজও ভরসা রাখেন। তিন, মমতা জনসংযোগের রাজনীতিতে বিশেষ পটু। নিজস্ব ভাষা আর সোজাসাপ্টা ভঙ্গিমার দরুন তিনি এ রাজ্যে আজও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জনপ্রিয়তম নেত্রী। চার, রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষমতায় (gut feeling) তিনি রাজ্যে সমস্ত দলের নেতানেত্রীর চেয়ে এগিয়ে।

শিবাশিস দত্ত

কলকাতা-৮৪

শিশুতীর্থ

• ‘খ্রিস্টের নাট্যগ্রামে’ (রবিবাসরীয়, ২৩-১২) শীর্ষক নিবন্ধে উল্লিখিত ‘দ্য চাইল্ড’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের একমাত্র ইংরেজি কবিতা। জার্মানির ব্যাভেরিয়ার ওয়েবরআমেরগাউ-এ ‘প্যাশন প্লে’ দেখে কবি মিউনিখে এসে সে দিন (১৯৩০-এর ২৩ জুলাই) রাতেই ও ২৪ জুলাই ‘দ্য চাইল্ড’ গদ্যকবিতাটি লেখেন। জার্মানির ‘ইউ এফ এ অ্যান্ড কোং’-এর স্টুডিয়োতে মুভি ক্যামেরার সামনে ‘দ্য চাইল্ড’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন কবি। এই সবাক ছবিটি কলকাতাতেও প্রদর্শিত হয়েছিল।

‘দ্য চাইল্ড’-এর প্রায় অবিকল অনুসরণে যে বাংলা কবিতাটি কবি রচনা করেন ১৯৩১ সালে, সেটির নাম প্রথমে ‘শিশুতীর্থ’ ছিল না। ‘সনাতনম্ এনম্ আহুর উতাদ্যসাৎ পুনর্ণবঃ’ নামে কবিতাটি ১৯৩১-এ ‘বিচিত্রা’য় (ভাদ্র, ১৩৩৮) প্রকাশিত হয়। নামটি কবি নিয়েছিলেন অথর্ববেদ-এর দশম কাণ্ডের ৪র্থ অনুবাকের একটি শ্লোক থেকে, যার অর্থ ‘ইনিই সনাতন, ইনিই আজ পুনরায় নবজাত।’ ১৯৩২-এ কবিতাটি ‘শিশুতীর্থ’ নামে ‘পুনশ্চ’ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই কবিতাটির মূল ভাবটি কবি এক দিন শান্তিনিকেতনের মন্দিরে দেওয়া একটি ভাষণে ব্যাখ্যা করেন। ব্যাখ্যাটি ‘তীর্থযাত্রী’ নামে নিবন্ধে ‘বিচিত্রা’য় (আশ্বিন, ১৩৩৮) আগেই প্রকাশিত হয়। এখানে কবি বলেন, ‘‘সংসারে যখন শান্তি নেই, দৈন্য মরু বালুকায় অন্নের ক্ষেত লুপ্ত করেছে, অজ্ঞানের স্তূপাকার নিরর্থকতায় আলোকের পথ অবরুদ্ধ, তখন উপরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করি, হে নবজাত, হে নবজীবনের দূত, কোথায় তুমি?’’ ‘শিশুতীর্থ’ রচিত হয়েছিল ১৩৩৮-এর শ্রাবণে।

কবি ‘শিশুতীর্থ’ কবিতাটিকে ঘষেমেজে নৃত্যনাট্যের উপযোগী করে তুলেছিলেন। এর সঙ্গে সঙ্গীত ও আবৃত্তি যোগ করে একটি ‘গীতোৎসব’-এর পরিকল্পনা তিনি করলেন। ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ কলকাতার ম্যাডান থিয়েটার ও প্যালেস অব ভ্যারাইটিজ় নাট্যমঞ্চে ‘গীতোৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়। এর পর ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে নৃত্যনাট্যটি অনুষ্ঠিত হয়। নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ‘‘ইংরেজি লেখাটার একটা টাইপ করা রূপান্তর পাওয়া যায় যার নাম ‘দ্য নিউকামার’।... সেটা নিছক গদ্য।’’ একই সময়ের টাইপ করা কবিকৃত আর একটি রূপান্তরও কিন্তু পাওয়া যায়, যার উপরে কবির হস্তাক্ষরে লেখা আছে ‘দ্য বেব’ ও ‘দ্য চাইল্ড’ নাম দুটোই। এই টাইপ করা রূপান্তরের শিরোনাম ছিল ‘হি ইজ় ইটারনাল, হি ইজ় নিউলি বর্ন’, যা কার্যত ‘সনাতনম্ এনম্ আহুর উতাদ্যস্যাৎ পুনর্ণবঃ’-র অনুবাদ।

রবীন্দ্রনাথের জার্মানি ভ্রমণের সঙ্গী কবি অমিয় চক্রবর্তীর লেখা থেকে একটি মজার ঘটনা জানা যায়। ‘প্যাশন প্লে’র নাট্য লোকালয়ে বিরাট মেলাও বসত। সে দিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অগণিত জনতার কেউই প্রায় জানত না, রবীন্দ্রনাথ কে। বিকেলে কবি যখন বেরিয়ে আসছেন, তাঁকে দেখে কেউ কেউ ‘খ্রিস্টুস’, ‘খ্রিস্টুস’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। জার্মান ভাষায় ‘খ্রিস্টুস’ মানে হল জিশু খ্রিস্ট।
 

পীযূষ রায়
কলকাতা-৩৪

বড়ুয়া সাহেব

• ‘ট্রেনের কামরায় মশারি টাঙিয়ে যেতেন’ (পত্রিকা, ৫-১) নিবন্ধের সঙ্গে কিছু যোগ করি। ১৯৪৫-এর ‘মায়াকানন’ চলচ্চিত্রটি, প্রমথেশ বড়ুয়ার অসমাপ্ত ছবি। ছবিটির পরিচালক ও নায়ক ছিলেন বড়ুয়া সাহেব। ছবিটি শেষ হওয়ার আগেই তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরিশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হন।

প্রমথেশ বড়ুয়ার সহকারী বিভূতি চক্রবর্তীর পরিচালনায় ছবিটি শেষ হয়ে ১৯৫৩ সনে দেখানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, মাইকেল মধুসূদনও তাঁর ‘মায়াকানন’ শেষ করতে পারেননি। আরও উল্লেখ্য, কোচবিহারের মাথাভাঙার ছেলে অবনী চৌধুরীর সঙ্গে বড়ুয়া সাহেবের চেহারার মিল থাকায়, তিনি উক্ত ভূমিকায় অভিনয় করেন। পরিচালক সরাসরি তাঁর মুখ দেখাননি। 

প্রমথেশ বড়ুয়া যখন দেশবন্ধুর স্বরাজ্য পার্টির চিফ হুইপ, তখন অসমের গভর্নর লবিহেমন্ড তাঁকে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পণ্ডিত নেহরু তাঁকে অসম রাজ্যের রাজ্যপাল করতে চেয়েছিলেন, তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি অনারারি সিভিল গার্ড কমান্ড্যান্ট ছিলেন।

চিনতু সেন
কলকাতা-১৩

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।