‘অহিংসা ও ফাঁসি’ (২৫-১০) শীর্ষক চিঠি প্রসঙ্গে এই পত্র। ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মহাত্মা গাঁধী তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইনের সঙ্গে দেখা করেন। সাক্ষাৎকারের শেষ পর্বে বিপ্লবী ভগৎ সিংহের বিষয়টি উপস্থাপিত হয়। গাঁধীজি ভাইসরয়কে বলেন, ভগৎ সিংহের ফাঁসি কার্যকর না করে যদি মুলতুবি বা প্রত্যাহার করা যায়, তা হলে ইংরেজদের সঙ্গে ভারতবাসীর শান্তি প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর পর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভাইসরয়ের সঙ্গে গাঁধীজির পুনরায় কথা হয়। গাঁধীজি বলেন, ভগৎ সিংহের দণ্ডাদেশ কি ফাঁসি ব্যতীত অন্য কোনও শাস্তি হতে পারে না অথবা ফাঁসি কি মুলতুবি রাখা যায় না? প্রত্যুত্তরে আরউইন বলেন, তিনি এই মামলাটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখেছেন এবং এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে তিনি কোনও ভাবেই এই দণ্ডাদেশ পরিবর্তন করতে বা মুলতুবি রাখতে পারবেন না।

ভগৎ সিংহের ফাঁসি রদ করা নিয়ে গাঁধীজি একাধিক বার লর্ড আরউইনকে মানবিক অনুরোধ করেছেন। এ বার তিনি যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেন। ২৩ মার্চ কংগ্রেসের বার্ষিক সভায় যোগদান করার জন্য রাতে করাচির উদ্দেশে ট্রেন ধরার ঠিক আগে লর্ড আরউইনকে চিঠি লিখে তিনি বলেন, ‘‘ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা এক সংশোধনাতীত কাজ।’’ তাই তিনি (আরউইন) যদি মনে করেন এই রায়দানে সামান্যতম ভুলের সম্ভাবনা আছে, তা হলে তাঁর উচিত এই দণ্ডাদেশ কার্যকর না করে পুনরায় বিবেচনা করা। প্রসঙ্গত, গাঁধীজি যখন ট্রেনে ছিলেন, তখনই লাহৌরে ভগৎ সিংহ এবং তাঁর সহযোগীদের ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়।

উল্লিখিত সত্য জানার পরও কি গাঁধীজিকে অভিযুক্ত করা যায় যে ফাঁসি প্রদানকারী বিদেশি প্রশাসকের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল?

স্বপন সরকার

কলকাতা-১১০

বরং উল্টো

পঙ্কজ পাঠকের ‘অহিংসা ও ফাঁসি’ (২৫-১০) শীর্ষক চিঠিটি পড়ে ভয়ানক বিস্মিত হলাম। একে তো গাঁধীজি এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাঁকে ভুল বোঝা ভারতবর্ষে কোনও নতুন ব্যাপার নয়, তার সঙ্গে আবার যদি ভুল বঙ্গানুবাদ জনিত বিশ্বাসও এ ভাবে পল্লবিত হতে থাকে, তা হলে তো গোটা ইতিহাসটাই এক দিন বারোয়ারি বিপন্নতায় আক্রান্ত হবে। ভগৎ সিংহের ফাঁসির অব্যবহিত পর কলকাতায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। সেই বিক্ষোভ হিংসাত্মক রূপ নিতে পারে আশঙ্কা করে হোম সেক্রেটারি এমারসন গাঁধীজিকে চিঠি লেখেন, তারই উত্তরটি পঙ্কজবাবু উদ্ধৃত করেছেন, "I thank you for your letter just received. I knew about the meeting you refer to. I have already taken every possible precaution and hope that nothing untoward will happen. I suggest that there should be no display of police force and no interference at the meeting. Irritation is undoubtedly there. It would be better to allow it to find vent through meeting..." এবং এই চিঠিটি পড়ে তাঁর মনে হয়েছে, গাঁধীজি ব্রিটিশদের সমর্থন করছেন এবং চাইছেন মিটিংটা আটকাতে! 

অথচ চিঠিটির অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ করলে উল্টোটাই সত্যি মনে হচ্ছে, হিংসা বা অশান্তির মতো অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনার সম্ভাবনা তো উড়িয়ে দিচ্ছেনই, উল্টে শাসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন এই বলে যে, সভাস্থলে যেন কোনও পুলিশ না থাকে। তিনি এও বলেন, ‘‘এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে, মানুষের মনে প্রবল ক্ষোভ আছে। এই ভাবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দিতে হবে।’’ 

আশা করছি ইতিহাসের পাতা থেকে আরও দু’একটি ঘটনা উল্লেখ করলে, ভগৎ সিংহের ফাঁসির আগে ও পরে গাঁধীজির অবস্থান ঠিক কেমন ছিল ধারণা করতে পারবেন। ভগৎ সিংহ, রাজগুরু ও শুকদেবের ফাঁসি স্থগিত করার জন্য গাঁধীজির প্রয়াস সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। করাচি যাত্রা পিছিয়ে দিয়ে ১৮ মার্চ, তার পর ১৯, ২১, ও ২২ মার্চ তিনি ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করে বারংবার একই অনুরোধ করেন। ২২ মার্চ তারিখের বৈঠকে কিছুটা আশ্বাস পাওয়ার পরেও, গাঁধীজি এতটাই মরিয়া ছিলেন যে ২৩ তারিখ সকালেও এই মৃত্যুদণ্ড আটকাবার জন্য ভাইসরয়কে তিনি ব্যক্তিগত চিঠি পাঠান, তাতে জনমত, অভ্যন্তরীণ শান্তি ইত্যাদি নানা কারণ দেখানো ছাড়াও, ভাইসরয়কে তাঁর খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা মনে করাতেও পিছপা হননি।

কিন্তু সমস্ত চেষ্টা বিফলে গেল। পঞ্জাবের ইউরোপিয়ান আইএএস ও আইপিএস অফিসারদের লাগাতার হুমকির কাছে মাথা নত করলেন ভাইসরয় লর্ড আরউইন। ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় ফাঁসি হয়ে গেল ভারতমাতার তিন বীর সন্তানের। 

১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় গাঁধীজি, ভগৎ সিংহকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন, ‘‘তাঁদের মুক্তির জন্য আমাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। ভগৎ সিংহ অহিংসায় বিশ্বাস করতেন না কিন্তু রাষ্ট্রীয় হিংসার কাছেও আত্মসমর্পণ করেননি। অসহায়তার কারণেই তাঁকে বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক পথ অবলম্বন করতে হয়েছিল।’’

ব্রিটিশদের তীব্র নিন্দা করে লেখেন, ‘‘এই বীরদের মুক্তির জন্য জাতির সর্বসম্মত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইংরেজ সরকার এই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনাটুকুও বিনষ্ট করলেন।’’

পঙ্কজবাবুকে দোষ দিই না, আসলে স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ শক্তিসমূহ মহাত্মা গাঁধীর বিশালকায় ভাবমূর্তির সঙ্গে কেবলই ছায়াযুদ্ধ করে চলেছে। তারা সব সময়েই সচেষ্ট, গাঁধীজির নামে মিথ্যা প্রচারগুলো বার বার বলে যাতে জনমানসে গেঁথে দেওয়া যায়। আরএসএস, হিন্দু মহাসভা থেকে কমিউনিস্টদের একাংশ ও আজকের বিজেপি— সবারই এতে কমবেশি অবদান আছে। তাই আমাদেরই সচেতন থাকতে হবে। আমাদের ভুল বোঝার ফল যেন ইতিহাসের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।

মানস ঘোষ

হাওড়া

গভীরে যেতে হয়

ভগৎ সিংহ ও গাঁধী বিষয়ক চিঠিটিতে যে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, তা প্রকাশ করার আগে লেখকের স্মরণ করা উচিত ছিল, ব্রিটিশ আইনের প্রতি গাঁধীজির অগাধ বিশ্বাস ছিল এবং যে কোনও সভ্য দেশে রক্তাক্ত বিপ্লবের পথ কখনও কখনও জরুরি হয়ে উঠলেও রাষ্ট্র দ্বারা তার অনুমোদন কখনওই পাওয়া সম্ভব ছিল না। গাঁধী কখনওই ‘অ্যানারকিস্ট’ মতামতে বা ‘রেভলিউশন’-এর পথে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ভগৎ সিংহের ফাঁসির প্রতিবাদ আটকাতে ব্রিটিশ রাজকে তথ্য পাঠানো আপাত অর্থে নীতিগর্হিত মনে হলেও তা ওঁর ব্যক্তিগত মতের বিপরীতধর্মী ছিল না। গাঁধীর মতো মানুষকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির প্রতিবাদ আটকাতে সচেষ্ট’, এই অপবাদ দেওয়ার আগে ঘটনার গভীরে যাওয়া উচিত ছিল।

আকাশ নায়ক

সরপী গ্রাম, পশ্চিম বর্ধমান

শতবর্ষ ঠিকই

‘সিপিএম শতবর্ষে’ (২৪-১০) প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নই। ১৯৬৪ সালে ত্যাগরাজ হল-এ (৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর) ৭ম পার্টি কংগ্রেস হয়েছিল। সেখানে সিপিএম পার্টি গঠিত হয়নি। সেটা কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন। পার্টি সংবিধানে উল্লেখ আছে "The name of the party is Communist Party of India". ১৯৬৫-তে কেরলের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে ডাঙ্গেপন্থী কমিউনিস্টদের সঙ্গে বিতর্ক হয়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে সিপিএম নাম নথিবদ্ধ হয়। সুতরাং সিপিএম কমিউনিস্ট পার্টির যে শতবর্ষ ২০২০ সালে উদ্‌যাপন করতে চলেছে তা ঠিকই।

দীপক সেনগুপ্ত

কলকাতা-৪৮

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।