E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বদলে যাচ্ছে সব

আমার চোখের সামনে সেই কলকাতা একটু একটু করে বদলাচ্ছে। সে দিনের কলকাতাবাসীর ধর্মনিরপেক্ষতা আজ অনেকটাই অদৃশ্য।

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৩৯

সেমন্তী ঘোষের লেখা ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ (৮-২) শীর্ষক প্রবন্ধটি যথার্থই সময়োপযোগী এবং পড়ে খুব ভাল লাগল। এই প্রসঙ্গে আমার নিজের কিছু কথা। কলকাতাতেই আমার বড় হয়ে ওঠা। বাড়ির পাশেই ছিল মুসলিম-অধ্যুষিত বিস্তৃত অঞ্চল। আমাদের বন্ধুদের মধ্যেও কয়েক জন মুসলিম ছিল— এক সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, গল্প করতাম; হরেক রকম আলোচনা হত, কিন্তু হিন্দু-মুসলমান ধর্মকে ঊহ্য রেখেই। পুজোয় এক সঙ্গে বসে খিচুড়ি খেতাম, আবার ইদে ওদের সঙ্গে বিরিয়ানি খেতাম। সিমুইয়ের পায়েস খেতে খুব ভাল লাগত।

আমার চোখের সামনে সেই কলকাতা একটু একটু করে বদলাচ্ছে। সে দিনের কলকাতাবাসীর ধর্মনিরপেক্ষতা আজ অনেকটাই অদৃশ্য। আজ আমাদের মতো প্রবীণদের আড্ডাতেও দেশের রাজনীতির সঙ্গে মন্দির-মসজিদ নির্মাণের প্রসঙ্গ ওঠে। খুব অবাক লাগে, যখন আমারই সমসাময়িক কিছু বয়স্ক নাগরিকও আজ এই আড়ম্বরসর্বস্ব মন্দির-মসজিদ নির্মাণের সমর্থনে গলা ফাটান। আসলে চরিত্র বদলাচ্ছে কলকাতার। ক্রমাগত পাশের রাজ্যগুলি থেকে এবং পাশের দেশ থেকেও আসা জনতার চরিত্র, আবেগ ও অতীত অভিজ্ঞতা বদলে দিচ্ছে সে দিনের সেই কলকাতার চরিত্র। এই সব বহিরাগত আগন্তুকের অধিকাংশেরই বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও বিশ্বাস নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই, বাংলাকে সমৃদ্ধ করারও কোনও দায়বদ্ধতা নেই। তাঁদের অধিকাংশের কাছেই এই রাজ্য মাথা গোঁজার ঠাঁই, কর্মসংস্থানের জায়গা, অর্থ উপার্জনের পথ। এঁদের কাছে হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থান অথবা ধর্মের ঊর্ধ্বে রাজ্যের উন্নতিকে তুলে ধরার কোনও মতাদর্শ থাকবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। বাংলার তথাকথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আজ প্রায় বিলীন। বাঙালি আজ নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় নীরব থাকাই বেশি পছন্দ করে। আর তারই সুযোগ নেয় বাংলার যুযুধান দুই পক্ষ— শাসক ও বিরোধী দল। তারা সাম্প্রদায়িকতাকে ‘ধর্ম’ বলে চালিয়ে দেওয়ার রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়েছে।

এই উদ্যোগ ব্যর্থ করতে হলে বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথের ছবি বুকে ধরে পদযাত্রা করলেই বাঙালি অস্মিতার প্রমাণ দেওয়া হবে না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাঙালি মনীষীদের মূর্তি তৈরি করে বা জন্মজয়ন্তী পালন করলেই চলবে না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালিকে বাঙালিয়ানার গর্বে গর্বিত হতে হবে এবং শিরদাঁড়া সোজা রেখে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। তবেই বাঁচবে বাংলা, বাঁচবে বাঙালি।

পার্থপ্রতিম সাহা, কলকাতা- ১৩৬

ভূতের দাপট

বঙ্গরাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে সেমন্তী ঘোষের প্রবন্ধ ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব পালন করল। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

শেক্সপিয়রের নাটকে ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক চক্রান্ত ও গুপ্তখুন উন্মোচনের উদ্দেশ্যে ডেনমার্কের নিহত রাজার ভূতের আনাগোনায় শঙ্কিত মার্সেলাস বলেন, কিছু একটা পচে গিয়েছে। কমিউনিজ়ম-এর ভূত ও রাজার ভূতের একটি সাদৃশ্য আছে, দু’টি ভূতই কিছু একটা পচে যাওয়ার বার্তা দিয়ে অপশাসনের অবসানে ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। সাম্প্রদায়িকতার ভূত ঠিক এর বিপরীত। সে পচনের বার্তাবাহক নয়, তার আগমন পচনপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে।

জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটির অর্থ ‘সম্প্রদায়াত্মক বিশ্বাস’। একটি ধর্মসম্প্রদায়ের সঙ্গে অপর ধর্মসম্প্রদায়ের এবং একই ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের কারণ সাম্প্রদায়িকতা। শুধুমাত্র হিন্দু ও মুসলমান বিরোধকে সাম্প্রদায়িকতা বললে শব্দটির অর্থসঙ্কোচন হয়।

ধর্ম এবং রাজনীতি উভয়েই আধিপত্য বিস্তারে বিশ্বাসী এবং স্বভাবতই একে অপরের পরিপূরক। প্রশ্ন আসতে পারে, তবে কি ধর্মের আঙিনায় চিরবিচরণশীল মহামানবরা মিথ্যা? কোন মূঢ় এ কথা ভাববে যে বুদ্ধ, খ্রিস্ট, কনফুসিয়াস, হজরত মহম্মদ, কবীর, নানক, চৈতন্য, নিজ়ামুদ্দিন আউলিয়া, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ আধিপত্যবাদী ধর্মভাবনার প্রচারক ছিলেন? রবীন্দ্রগানে মানবাত্মার বিশ্বাত্মায় সম্প্রসারণের দর্শন অস্বীকার করবে কে? এঁরা ‘ধর্ম’ শব্দটিকে ‘ভেদবাদী রিলিজিয়ন’ অর্থে ব্যবহার করেননি, করেছিলেন ‘মর‌্যালিটি’ অর্থে। মনুসংহিতা, ব্যাসসংহিতায় লিঙ্গবৈষম্যের যে চিত্র ধরা আছে, তা প্রমাণ করে যে ‘সম্প্রদায়াত্মক বিশ্বাস’ শুধুমাত্র ধর্মসম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ নয়; লিঙ্গসাম্প্রদায়িকতাও পুরুষের ‘সম্প্রদায়াত্মক বিশ্বাস’। উচ্চবর্ণ হিন্দু ও নিম্নবর্ণের হিন্দুর মধ্যে মনুসংহিতা-স্বীকৃত ভেদও কি জাতিসাম্প্রদায়িকতা নয়?

অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০

অধর্মের শাসনে

সেমন্তী ঘোষ তাঁর ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ লেখায় যথার্থই বলেছেন, “...এখন যা চলছে, তা ধর্ম নয়, অধর্মের রাজনীতি।” এই অধর্মের প্রাবল্যেই আমরা ধর্মের ইতিবাচক দিক ভুলতে বসেছি! ধর্ম নৈতিকতার যে বাতাবরণ গড়ে তুলতে পারত, অধর্মের রাজনীতি নৈতিকতার সেই বোধকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। ধর্ম যে মরমী সত্তার বিকাশ ঘটাতে পারত, তাও এক রকম সম্ভাবনাহীন হয়ে উঠেছে। মঙ্গলকাব্যে লেখা, “ধর্মে মতি হউক সবার।” মতি অর্থে শুভবোধ। সারল্য (অকপটতা) ও ভক্তির (মান্য ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা) যোগফলে যে শুভবোধ জাগ্রত হয়, অধর্মে তার বিনাশ ঘটতে বাধ্য। ‘ধর্মে সইবে না’, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ ইত্যাদি প্রবচনের মাধ্যমে তো এক নৈতিকতাই হৃদয়াসনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। অধর্ম এসে সেই বোধের বিসর্জন ঘটিয়েছে।

হিন্দুধর্মের কথাই ভাবা যাক। কঠোর আচার বা অনুশাসনই তো এ ধর্মের সারকথা নয়। হৃদয়স্পর্শী যে আকুলতায় মানুষ পথে নামে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার শপথ গ্রহণ করে, ধর্ম বেঁচে থাকে সেই আকুলতার পথেই। অন্ধ ধর্মবিরোধী মনোভাব কিংবা কট্টর ধর্মবাদ, এক কথায় অধর্ম, এই ভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ।

পরিশেষে বঙ্কিমচন্দ্র এবং হিন্দুধর্ম প্রসঙ্গে দু’-একটি কথা বলা দরকার। বঙ্কিমচন্দ্র যে হিন্দুধর্মের গোঁড়ামির বিপরীতে ‘রিফর্মড হিন্দু’র অস্তিত্ব কল্পনা করেছিলেন, এ কথাটা আমরা খেয়ালে রাখি না। প্রথাগত হিন্দু নয়, আদর্শ হিন্দুর মধ্যে তিনি আদর্শ মানবকে খুঁজেছিলেন। চিত্তশুদ্ধির কথা বলেছিলেন সে কারণেই। বহুজ্ঞ বঙ্কিমের পরিচয় ভুলে হিন্দুত্ববাদীরা যখন ভোট-রাজনীতির স্বার্থে হিন্দু বঙ্কিমের জয়গান করে, তখন তাকে অধর্মের রাজনীতি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!

শিবাশিস দত্ত, কলকাতা-৮৪

শুধুই বিভাজন

সেমন্তী ঘোষের লেখা ‘ছায়াভূতের ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্বাচন কমিশন যে পদ্ধতি অনুসরণ করে ভোটার তালিকায় লুকিয়ে থাকা মৃত ভোটার, ভুয়ো ভোটার ও অনুপ্রবেশকারীদের খোঁজ চালিয়েছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছিল। আতঙ্কে বহু মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে।

সাধারণ মানুষ চান, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান-আইনশৃঙ্খলা ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনজীবিকার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলি অগ্রাধিকার পাক। অথচ রাজনৈতিক দলগুলি সে পথে না হেঁটে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করে বৈতরণি পার হওয়ার উদ্যোগী হয়েছে বলেই মনে হয়।

জাতীয় কংগ্রেস এ রাজ্যের কয়েকটি নির্বাচনে জোটসঙ্গী বামপন্থীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে, একক ভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বিধানসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের ফলে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি-বিরোধী ভোট যে ভাগ হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Harmony Religion

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy