E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: স্বপ্নই থেকে যাবে?

আর জি কর-কাণ্ডে সরকারি হাসপাতালের মধ্যেই ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসনের অবহেলা ও ব্যর্থতাকে সামনে এনে বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছিল। এ ছাড়া শহর ও গ্রামের শাসক দলের বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি স্তরের নেতার উদ্ধত আচরণ, মাতব্বরি ও তোলাবাজিও মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩৮

প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘মুখে প্রত্যয়, আর মনে?’ (২৬-২) শীর্ষক প্রবন্ধের সঙ্গে সহমত পোষণ করে কয়েকটি কথা বলি। গত পনেরো বছর ধরে শাসনক্ষমতায় থাকা তৃণমূল সরকারের প্রতি রাজ্যের বড় অংশের মানুষের অসন্তুষ্টির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রধানত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এই প্রশাসন ব্যর্থ। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই তুমুল দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। রেশন দুর্নীতির পাশাপাশি গরু, কয়লা ও বালি পাচার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। যদিও আদালতের নির্দেশে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এই সব দুর্নীতির তদন্ত চালালেও কোনও অজানা কারণে এখনও কোনওটিরই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

আর জি কর-কাণ্ডে সরকারি হাসপাতালের মধ্যেই ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসনের অবহেলা ও ব্যর্থতাকে সামনে এনে বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছিল। এ ছাড়া শহর ও গ্রামের শাসক দলের বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি স্তরের নেতার উদ্ধত আচরণ, মাতব্বরি ও তোলাবাজিও মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।

তবে এত কিছুর পরেও বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে শাসক দল খুব অসুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে— এমনটা বলা কিন্তু কঠিন। এর জন্য বিরোধী দলগুলির, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির ব্যর্থতাও কম দায়ী নয়। রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় মানুষের হয়রানির অভিযোগে বিজেপির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। বিশেষত সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম এসআইআর-এ বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভোট বিশ্লেষকদের মতে, এই মতুয়া জনগোষ্ঠীর সমর্থনেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বিগত নির্বাচনে বিজেপির আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছিল।

অন্য দিকে, বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে গত কয়েক মাসে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর উৎপীড়নের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা বিজেপির পক্ষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সর্বোপরি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় মুখের মোকাবিলায় তুলনীয় কোনও জনপ্রিয় নেতা বা নেত্রী রাজ্য বিজেপিতে এখনও দেখা যায় না। তাই নির্বাচনী প্রচারে তাঁদের বার বার প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আনতে হয়। কিন্তু সেখানেও ‘বহিরাগত’ বিতর্কের প্রশ্ন থেকে যায়। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী তো আর এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নন। অর্থাৎ বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এখনও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেননি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সংগঠন। সারা রাজ্যের প্রায় প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের অধিকাংশ বুথেই তৃণমূলের সংগঠন রয়েছে, কিন্তু বিজেপির সেই পরিকাঠামো এখনও সর্বত্র গড়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতিতে শক্ত সংগঠনের জোরে বিরোধী হাওয়াকে রুখে দেওয়ার বহু নজির অতীতে রয়েছে। তার উপরে ভোটের আগে মমতার বিভিন্ন ভাতা ও অনুদানমূলক প্রকল্পও রয়েছে। তাই বিজেপির চাণক্য অমিত শাহ যতই মুখে ‘বঙ্গবিজয়’ সুনিশ্চিত বলুন না কেন, বাস্তব কিন্তু সম্ভবত ভিন্ন। সে ক্ষেত্রে এ বারও বঙ্গবিজয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যেতে পারে— সমস্ত হাঁকডাকই শেষ পর্যন্ত সার হয়ে যেতে পারে।

কৌশিক চিনা, মুন্সিরহাট, হাওড়া

কঠিন লড়াই

প্রেমাংশু চৌধুরী তাঁর ‘মুখে প্রত্যয়, আর মনে?’ প্রবন্ধে যথার্থই উল্লেখ করেছেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে শুধু নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তার উপর ভর করে বিজেপির পক্ষে পশ্চিমবঙ্গ দখল করা সম্ভব নয়। এ কথা ঠিক যে, গত বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপি প্রধান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো দাড়ি রেখে বাঙালির মন জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাতে সফল হননি।

রাজ্য বিজেপির প্রধান সমস্যা হল, প্রধান বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিজেদের কোনও গ্রহণযোগ্য মুখ নেই। ফলে তারা ভীষণ ভাবে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের উপর নির্ভরশীল। বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্যকে আর্থিক ভাবে বঞ্চিত করার অভিযোগ, কিংবা বাংলার বাইরে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাঙালিদের উপর আক্রমণের যে অভিযোগগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল-সহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলি তুলছে, সেগুলির গ্রহণযোগ্য জবাব নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ বার বার রাজ্যে এসেও মানুষের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারছেন না।

ফলে বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বিজেপিকে বাংলা ও বাঙালি-বিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ গত পনেরো বছরে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও অপশাসনের অভিযোগকে সামনে রেখে জনসমর্থন আদায়ের একটি বড় সুযোগ বিজেপির সামনে রয়েছে। মুশকিল হল, বুথ স্তরে টক্কর দিয়ে সেই জনসমর্থনকে ভোটবাক্স পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি বিজেপির এখনও নেই।

তবে এই বারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের কাছে মর্যাদার লড়াইও হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ভারতের একুশটি রাজ্যে বিজেপি বা এনডিএ সরকার থাকা সত্ত্বেও খোদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এখনও তাঁদের কাছে অধরাই রয়ে গিয়েছে।

শেষাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভদ্রেশ্বর, হুগলি

লক্ষ্যভ্রষ্ট?

প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘মুখে প্রত্যয়, আর মনে?’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি। শিরোনামটি সত্যিই চমৎকার ও অর্থবহ। প্রশ্ন উঠছে— বিজেপি কি সত্যিই তৃণমূলকে পরাজিত করে এ রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে চায়, না কি দীর্ঘ লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল হিসাবেই থাকতে চায়?

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তো নরেন্দ্র মোদী একেবারে ‘চারশো পার’-এর স্লোগান তুলেছিলেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে একক দল হিসাবে সরকার গড়তে বিজেপি সফল হয়নি; শেষ পর্যন্ত সমর্থন নিয়ে তাদের সরকার গড়তে হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য দলটির আত্মবিশ্বাসকে অনেকটাই মজবুত করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা, নিয়োগ, রেশন, স্বাস্থ্য— নানা ক্ষেত্রেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি আর জি কর-কাণ্ড কিংবা সন্দেশখালির নির্যাতনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই ঘটনাগুলির সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি, যেমন সিবিআই, ইডি বা আয়কর দফতর, শেষ পর্যন্ত করতে পেরেছে? অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই রাজ্যের তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যের আসল কারিগর কে?

অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্ভবত অনেকের চেয়ে ভাল জানেন যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কী ভাবে মোকাবিলা করে নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়। তাই এক দিকে যেমন তিনি লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের ভাতা বাড়িয়ে দিয়েছেন, তেমনই ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেকার ভাতাও চালু করেছেন।

এ সবের শেষ পর্যন্ত কী প্রভাব পড়বে রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ভোট-রাজনীতিতে— তা সময়ই বলতে পারে।

দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

ভোটের জ্বর

প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘মুখে প্রত্যয়, আর মনে?’ প্রবন্ধটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং সুদূরপ্রসারী মননের পরিচয় বহন করে। ভোটের বৈতরণি পার হতে বঙ্গে এখন নেতা-নেত্রীরা যেন সদলবলে ময়দানে নেমে পড়েছেন। মনে পড়ে ‘কালকূট’ ছদ্মনামে ‘ভোট দর্পণ’ রম্যরচনায় সাহিত্যিক সমরেশ বসু-র মন্তব্য— “ভোটের তরঙ্গে ভাসছে সারা জেলা। তরঙ্গ না বলে বলা উচিত, ভোটের জ্বর চড়ছিল; আস্তে আস্তে সাধারণের শিরায় শিরায় ঝিমিয়ে থাকা রক্তে বাড়ছিল গতি।” বঙ্গেরও এখন যেন শিরায় শিরায় বাড়ছে সেই রক্তচাপ।

সূর্যকান্ত মণ্ডল, কলকাতা-৮৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy